preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
টোনাল ট্রুথ: পর্ব ৮
ধারাবাহিক

টোনাল ট্রুথ: পর্ব ৮

সংগীত এখন সর্বত্র, কিন্তু মনোযোগী শ্রবণ ক্রমেই বিরল। কেতাব-ই’র নতুন ধারাবাহিক ‘টোনাল ট্রুথ’ সেই হারানো শ্রবণবোধের অনুসন্ধান। নতুন অ্যালবাম বিশ্লেষণ, অ্যালগরিদমে হারিয়ে যাওয়া গান, সংগীতজগতের অন্তর্লোক ও সময়ের সাউন্ডস্কেপ—সব মিলিয়ে অরিজিৎ লাহিড়ীর এই কলাম সংগীতকে পড়তে চায় চার্টের বাইরে, সংস্কৃতির গভীর প্রেক্ষাপটে। আজ অষ্টম পর্ব।

সংগীত কেবল শ্রবণের বিষয় নয়, সংগীত সময়ের দলিল, এক গভীর ব্যক্তিগত এবং যৌথ অনুভূতির প্রত্নতাত্ত্বিক খনন। একটা সময়ের মুড, একটা মানুষের ভেতরের গোপন কথাবার্তা, আর একসাথে অনেক মানুষের শেয়ার করা আবেগ—সব মিশে থাকে এর মধ্যে। আশা ভোঁসলের সংগীত জীবনের মূল সুরটি হল বিবর্তন। তিনি কেবল একজন গায়িকা নন, বরং একজন সাংস্কৃতিক কার্টোগ্রাফার, যিনি সুর দিয়ে মানচিত্র আঁকেন এবং ভৌগোলিক সীমানা অদৃশ্য করে দেন । ১৯৪৩ সালে মাত্র দশ বছর বয়সে রেকর্ডিং স্টুডিয়োতে পা রাখা সেই ভীরু কিশোরী থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ডিজিটাল মহাকাশ পর্যন্ত তাঁর কণ্ঠের যে যাত্রা, তা আসলে ভারতীয় সংগীতের অ্যানালগ থেকে ডিজিটালের দিকে স্লাইড করারই এক ইতিহাস। তাঁর বেসিক অ্যালবামগুলি কেবল গানের সংকলন নয়, বরং সেগুলি ‘টোনাল ট্রুথ’ বা ধ্বনিগত সত্যের এক আর্কাইভাল আকাঙ্ক্ষা, যা ট্রেন্ড নির্ভরতা অতিক্রম করে শিল্পের স্থায়িত্বকে নথিভুক্ত করে।

১৯৮৩ সালে প্রকাশিত ‘মেরাজ-ই-গজল’ অ্যালবামটি ছিল ভারত ও পাকিস্তানের দুই সুর-সম্রাটের এক ঐতিহাসিক মেলবন্ধন। ওস্তাদ গোলাম আলির কম্পোজিশনে আশা ভোঁসলের এই অ্যালবামটি গজলের সংজ্ঞাকেই নতুন করে নির্মাণ করেছিল। ‘মেরাজ’ শব্দের অর্থ আরোহণ বা শীর্ষবিন্দু। গজলের গভীরতা এবং রাগাশ্রয়ী সুরের যে গাম্ভীর্য এই অ্যালবামে পাওয়া যায়, তা সমকালীন পপ বা ফিল্‌মি গজলের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এই অ্যালবামটি এমন এক সময়ে মুক্তি পায় যখন ভারতীয় সংগীত শিল্প এনালগ রেকর্ডিংয়ের স্বর্ণযুগে অবস্থান করছিল।

এই অ্যালবামের প্রতিটি ট্র্যাক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ওস্তাদ গোলাম আলি এখানে পাতিয়ালা ঘরানার গায়কিকে গজলের পরিমিত কাঠামোর মধ্যে সংস্থাপিত করেছেন। গোলাম আলির কম্পোজিশনগুলো মূলত রাগভিত্তিক এবং অনেক ক্ষেত্রে তিনি রাগের এক ধরনের বৈজ্ঞানিক মিশ্রণ ব্যবহার করেছেন, যা সরাসরি শ্রোতার নিউরাল সার্কিটে এক ধরনের স্থির অনুরণন তৈরি করে। বিশেষ করে ‘দিল ধড়কনে কা সবাব ইয়াদ আয়া’ গানটিতে নাসির কাজমির দর্শনের সঙ্গে আশার কণ্ঠের সেই ‘লো-রেজিস্টার’ বা নিচু পর্দার কাজ এক ধরনের মেডিটেটিভ স্টেট বা ধ্যানমগ্নতা তৈরি করে। গজল শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি একটি আহত হরিণীর যন্ত্রণাদগ্ধ কণ্ঠস্বরকে নির্দেশ করে—আর আশা ভোঁসলের কণ্ঠে সেই ‘সোজ’ বা বেদনা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ধরা পড়েছে।

১৯৮০-র দশকের শুরুতে রেকর্ডিং প্রযুক্তি যখন ২-ইঞ্চি ম্যাগনেটিক টেপের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তখন এইচএমভি স্টুডিয়োর সেই বিশেষ অ্যাকুস্টিক চরিত্র এই অ্যালবামে স্পষ্ট। টেপে যখন শব্দ রেকর্ড হয়, তখন সেখানে এক ধরনের ন্যাচারাল কমপ্রেশন এবং স্যাচুরেশন ঘটে, যা হারমোনিক্সগুলোকে এমনভাবে ব্লেন্ড করে দেয় যে সাউন্ডটা কানে কর্কশ লাগে না। ‘মেরাজ-ই-গজল’-এর রেকর্ডিংয়ে কণ্ঠের সূক্ষ্ম মডুলেশনগুলো ধরা পড়েছে, যা আজকের ডিজিটাল স্মুথনিং বা অটো-টিউনের যুগে হারিয়ে যায়। আশার কণ্ঠের তীক্ষ্ণতা এবং গোলাম আলির কণ্ঠের গম্ভীরতা এখানে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে।

আশা ভোঁসলে এবং হরিহরণের যৌথ প্রয়াস ‘আবশার-ই-গজল’ ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে একটি আধুনিক ধ্রুপদি অধ্যায়। ১৯৮৫ সালে সিবিএস লেবেল থেকে প্রকাশিত এই অ্যালবামটির সংগীত পরিচালক ছিলেন তৎকালীন উদীয়মান শিল্পী হরিহরণ। ‘আবশার’ শব্দের অর্থ জলপ্রপাত, এবং এই অ্যালবামের সুরপ্রবাহে সেই নামটির সার্থকতা লক্ষ করা যায়।

এই অ্যালবামের রেকর্ডিং হয়েছিল মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ‘ওয়েস্টার্ন আউটডোর স্টুডিয়োতে, যার প্রকৌশলী ছিলেন গোল্ড মেডেলিস্ট দামান সুদ। দামান সুদের মিক্সিং দর্শনে মিড-রেঞ্জ ফ্রিকোয়েন্সিগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হত, যার ফলে আশার কণ্ঠ এবং তবলার আঘাতের মধ্যে এক ধরনের নিখুঁত ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। ওয়ের্স্টান আউটডোরে তখন আরসিএ বা তিন-ট্র্যাক মেশিন ব্যবহৃত হত, যা পরবর্তীতে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত হয়। হরিহরণের সুরারোপে এখানে ‘শব্দ প্রধান’ সংগীতের প্রাধান্য দেখা যায়, যেখানে কাব্যিক আবেগ সুরের কাঠামোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

‘আবশার-ই-গজল’-এ ইব্রাহিম আশক, নিদা ফাজলি এবং বশির বদরের মতো কবিদের গান ব্যবহৃত হয়েছে। ‘লোগ কহেতে হ্যায়’ গানটিতে আশার কণ্ঠের টেক্সচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি এখানে অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত এবং মডার্ন। হরিহরণ এখানে তবলার পাশাপাশি বাঁশি এবং স্ট্রিংসের এমন এক আবহ তৈরি করেছেন যা গজলকে কেবল বৈঠকি গান থেকে বের করে এক বৈশ্বিক সাউন্ডস্কেপে পৌঁছে দিয়েছে। হরিহরণের মতে, গজলে সুরের মাঝে যে নীরবতা বা সাইলেন্স থাকে, সেটিই গানের মুডকে সজীব রাখে—যা টোনাল ট্রুথের মূল দর্শনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

১৯৮৮ সালে প্রকাশিত ‘কশিশ’ অ্যালবামটি আশা ভোঁসলের একক গজলের এক অসাধারণ সংকলন। এখানে তিনি কাজ করেছেন নজর হোসেন, মাস্টার আবদুল্লাহ এবং মহসিন রেজার মতো সুরকারদের সঙ্গে। অ্যালবামটির ফোটোগ্রাফি করেছিলেন বিখ্যাত গৌতম রাজধ্যক্ষ, যা এর ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনায় এক আভিজাত্য যোগ করেছিল।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

আশা ভোঁসলের কণ্ঠের তীক্ষ্ণতা এবং নমনীয়তা এই অ্যালবামে এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। সংগীত বিজ্ঞানের ভাষায়, তাঁর কণ্ঠে একটি ‘ন্যাচারাল অন-বোর্ড ইক্যুয়ালাইজার’ আছে যা গানের হাই-এন্ড ট্রিবল পার্টটাকে প্রাণ দেয়। ‘কশিশ’-এর গানগুলোতে তিনি যেভাবে নিচু পর্দা থেকে উঁচু পর্দায় আরোহণ করেন, তা তাঁর দীর্ঘদিনের শাস্ত্রীয় তালিমের প্রমাণ দেয়। বিশেষ করে নজর হোসেনের কম্পোজিশনগুলোতে সুরের বিন্যাস লিনিয়ার নয়, বরং চক্রাকার। ‘কিউ ছোড়া তুমনে সাথ’ বা ‘কভি কহা না কিসিসে’ গানগুলোতে আশার কণ্ঠের ভাইব্রেটো বা স্বরের কাঁপন সরাসরি শ্রোতার হার্ট-রেটকে সিঙ্ক্রোনাইজ করে ফেলে। এই অ্যালবামের রেকর্ডিং সুপারভাইজার ছিলেন দামান সুদ, যিনি আশার কণ্ঠের সূক্ষ্ম মডুলেশনগুলো ধরার জন্য বিশেষ অকুস্টিক স্থাপত্য ব্যবহার করেছিলেন।

আশা ভোঁসলের ক্যারিয়ারের অন্যতম বৌদ্ধিক এবং আধ্যাত্মিক কাজ হল ‘লেগাসি’। ১৯৯৬ সালে ওস্তাদ আলি আকবর খাঁ এবং ওস্তাদ আল্লারাখা খাঁর সঙ্গে করা এই অ্যালবামটি ১৬শো থেকে ১৮শো শতাব্দীর ভারতীয় ধ্রুপদি বন্দিশের এক আর্কাইভাল সংরক্ষণ। এটি কেবল একটি অ্যালবাম নয়, এটি একটি শৈল্পিক ইশতেহার। এই অ্যালবামের মাধ্যমে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত এবং জনপ্রিয় সংগীতের মধ্যবর্তী প্রাচীরটি ভেঙে গিয়েছিল।

এই অ্যালবামের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হল এর প্রোডাকশন। ক্যালিফোর্নিয়ার স্কাইওয়াকার সাউন্ড—সেখানে এই অ্যালবামটি রেকর্ড করা হয় । মিক্সিং ও মাস্টারিং করেছেন বিশ্ববিখ্যাত বব লুডউইগ এবং ব্রায়ান লি। সনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দিক থেকে এটি এক ইঞ্জিনিয়ারড পারফেকশন। মাইক্রোফোনিং এখানে ‘ক্লোজ-মাইকড’ ছিল না; বরং পর্যাপ্ত ‘অ্যাম্বিয়েন্ট স্পেস’ রাখা হয়েছিল যাতে ওস্তাদ আলি আকবর খাঁর সরোদ এবং আশার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি অর্গানিকভাবে ধরা পড়ে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে তানসেনের সৃষ্টিকে এক ক্ষয়হীন ফরম্যাটে সংরক্ষণ করা ছিল এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

‘লেগাসি’ অ্যালবামটিতে আশা ভোঁসলে মাইহার ঘরানার দুর্লভ বন্দিশগুলো গেয়েছেন, যা আলি আকবর খাঁ তাঁর বাবা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর কাছ থেকে শিখেছিলেন। ‘গুরু বন্দনা ইন দেশ মালহার’ গানটিতে সরোদের প্রিল্যুড এবং আশার কণ্ঠের মেলোডিক স্টেটমেন্ট এমনভাবে মিশে গেছে যে মনে হয় তারা কোনো অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। ১৯৯৭ সালে এই অ্যালবামটি গ্র্যামি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল, যা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বৈশ্বিক স্বীকৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বিজ্ঞানের ভাষায়, এই সুররচনাগুলো এক ধরনের ‘এন্ট্রেইনমেন্ট’ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, যেখানে বাহ্যিক ছন্দ আমাদের অন্তর্লীন হৃৎস্পন্দন ও মস্তিষ্কের তরঙ্গকে প্রভাবিত করে।

১৯৯৬ সালেই আশা ভোঁসলে আরও একটি বিস্ময়কর কাজ করেন—লেসলি লুইস বা লেজ লুইসের সঙ্গে ‘রাহুল অ্যান্ড আই - পার্সোনাল মেমোরিজ’ । আর ডি বর্মণের কালজয়ী গানগুলোকে রি-ইমাজিন করার এই দুঃসাহস সে-সময় অনেক সমালোচনার জন্ম দিলেও, এটি ছিল আসলে ভারতীয় সংগীতের এক সনিক মেটামরফসিস। এটি নব্বইয়ের দশকের সেই কালচারাল গ্লিচের প্রতিফলন, যখন পৃথিবী এনালগ থেকে ডিজিটালের দিকে স্লাইড করছিল।

লেসলি লুইস এখানে আর ডি বর্মণের সেই আইকনিক মেলোডিগুলোকে ভেঙে নতুন সাউন্ড ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ড্রাম মেশিন, সিন্থ-পপ লেয়ার এবং ইকো-রিভার্বের ব্যবহারে গানগুলো ড্রয়িংরুম থেকে সোজা ক্লাবের ডান্স ফ্লোরে চলে এল। ‘পিয়া তু আব তো আজা (হিপ হপ)’ বা ‘দম মারো দম’-এর নতুন সংস্করণগুলোতে কণ্ঠের স্তরবিন্যাস ছিল অত্যন্ত জটিল। একটি প্রধান কণ্ঠের ওপর একাধিক হারমনি ট্র্যাক বসিয়ে এক ধরনের ধ্বনি-প্রাচীর তৈরি করা হয়েছিল। আধুনিক সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাষায়, একে বলা হয় ‘পলি-রিদমিক টেক্সচার’, যেখানে একটি কনস্ট্যান্ট লুপের তলায় সূক্ষ্ম শেকার বা স্ন্যাপ যোগ করা হয়।

২০০০ সালে আদনান সামির সঙ্গে আশা ভোঁসলের ‘কভি তো নজর মিলাও’ অ্যালবামটি ভারতীয় ইন্ডিপপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল কাজগুলোর একটি। এই অ্যালবামটি প্রমাণ করেছিল যে সুরের ভাষা ভৌগোলিক সীমানা মানে না। এটি প্রায় ৪০ লক্ষ কপির বেশি বিক্রি হয়েছিল।

অ্যালবামটির অধিকাংশ গান রেকর্ড করা হয়েছিল লাহোরের ‘ফোক স্টুডিয়োতে’ এবং মিক্সিং হয়েছিল করাচির ‘সাউন্ড মাস্টার স্টুডিয়োতে’ । আদনান সামি নিজে পিয়ানো এবং সিন্থেসাইজার ব্যবহার করে এক ধরনের ‘ইথারিয়াল’ আবহ তৈরি করেছিলেন। এই অ্যালবামের মিউজিক ভিডিয়োগুলো শুট করেছিলেন বিনোদ প্রধান, যা অডিয়ো এবং ভিজ্যুয়ালের মধ্যে এক ধরনের সিনার্জি তৈরি করেছিল। ‘কভি তো নজর মিলাও’ গানটিতে আশার কণ্ঠ অত্যন্ত কোমল এবং নিবিড়। তাঁর সিগনেচার হাস্কি ভয়েসকে এখানে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যা শ্রোতার মোটর কর্টেক্সকে সক্রিয় করার পাশাপাশি এক ধরনের ইউফোরিয়া তৈরি করে। দ্রুত ষোড়শমাত্রিক নোটের প্রবাহ বা মেলিজমার ব্যবহার শ্রোতার মস্তিষ্কে ডোপামিন ক্ষরণ বাড়ায়। আদনান সামির মিউজিক প্রোডাকশনে লুপ বা পুনরাবৃত্তির যে ব্যবহার ছিল, তা আধুনিক পপ মিউজিকের এক বৈজ্ঞানিক কৌশল—যা শ্রোতার নিউরাল সার্কিটকে সেই প্যাটার্নের প্রতি অভ্যস্ত করে তোলে।

২০০১ সালে প্রকাশিত ‘আপ কি আশা’ অ্যালবামটি ছিল আশা ভোঁসলের জন্য একটি বিশেষ পরীক্ষা, কারণ এখানে তিনি নিজেই ছিলেন সুরকার বা কম্পোজার । মজরুহ সুলতানপুরীর শেষ জীবনের লিরিক্সে আশার এই কাজগুলো তাঁর সৃজনশীল স্বাধীনতার এক অনন্য দলিল। অ্যালবামটি উদ্‌বোধন করেছিলেন ক্রিকেট কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার।

অ্যালবামটিতে মোট আটটি গান ছিল, যা সাজিয়েছিলেন টাবুন সূত্রধর। সুরের স্থাপত্যে এখানে রাগ ইমনের মৃদু মায়া যেমন আছে, তেমনি ‘আইসা ভি ক্যা’ গানটিতে হিপ-হপ এলিমেন্টও যোগ করা হয়েছে। আশার কম্পোজিশনের বৈশিষ্ট্য হল তিনি সুরের মাঝে স্তব্ধতাকে ব্যবহার করতে জানেন। ‘দিল মেরে গায়ে জা’ গানটিতে মেলোডিক ল্যান্ডস্কেপটি একইসঙ্গে ভঙ্গুর এবং শক্তিশালী। রেকর্ডিং প্রযুক্তির দিক থেকে এখানে ডিজিটাল প্রোডাকশন এবং লাইভ ইনস্ট্রুমেন্টেশনের এক হাইব্রিড মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। তবলার শব্দের সঙ্গে আধুনিক সিন্থ-প্যাড মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, যা একবিংশ শতাব্দীর সংগীত-সভ্যতার এক বৈশিষ্ট্য।

২০০৫ সালে প্রকাশিত ‘ইউ’ভ স্টোলেন মাই হার্ট’ (You’ve Stolen My Heart) অ্যালবামটি আশা ভোঁসলের ক্যারিয়ারের অন্যতম সাহসী এবং পরীক্ষামূলক কাজ। সান ফ্রান্সিসকোর বিখ্যাত ‘ক্রোনোস কোয়ার্টেট’ (Kronos Quartet)-এর সঙ্গে করা এই অ্যালবামটি আর ডি বর্মণের সংগীতকে এক বৈশ্বিক মেটা-মডার্ন রূপ দান করেছে। এটি ২০০৬ সালে শ্রেষ্ঠ কনটেম্পোরারি ওয়ার্ল্ড মিউজিক অ্যালবাম বিভাগে গ্র্যামি মনোনয়ন পায়।

এই অ্যালবামের প্রোডাকশন ছিল অত্যন্ত জটিল। এটি ছিল একটি মাল্টি ট্র্যাকড কনফেকশন যেখানে অগণিত ওভারডাবিং এবং অদ্ভুত বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল । আর ডি বর্মণের সেই স্বভাবজাত উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে ধরার জন্য ডেভিড হ্যারিংটন মাউথওয়াশ বোতল থেকে শুরু করে কাচের গ্লাস—সবই ব্যবহার করেছিলেন। সংগীতায়োজনের দিক থেকে এখানে স্ট্রিং কোয়ার্টেটের পাশাপাশি ভারতীয় তবলা (ওস্তাদ জাকির হোসেন) এবং চাইনিজ পিপা (উ ম্যান) ব্যবহার করা হয়েছে।

ডিজিটাল যুগে যখন অ্যালগরিদমিক সংগীত তৈরির প্রবণতা বাড়ছে, এই অ্যালবামটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ‘মানব-স্পর্শের’ অপরিহার্যতা। প্রতিটি ড্রাম হিট বা স্ট্রিংয়ের ঘর্ষণ এখানে অত্যন্ত অর্গানিক অনুভূতি দেয়। ডেভিড হ্যারিংটন আশাকে এলভিস লাইক ফিগার হিসেবে বর্ণনা করেছেন, কারণ তাঁর কণ্ঠের টেকনিক্যাল ভোকাবুলারি এবং শৈলী বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ। ‘মেরা কুছ সামান’ গানটিতে স্ট্রিং সেকশনের যে ব্যবহার, তা গানটিকে মূল চলচ্চিত্রের ভার্সনের চেয়েও অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক এবং আধ্যাত্মিক করে তুলেছে।

২০১৪ সালে আর ডি বর্মণের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আশা প্রকাশ করেন ‘পঞ্চম তুমি কোথায়’ নামক একটি বাংলা অ্যালবাম। ২৫ বছর পর এটি ছিল তাঁর প্রথম বাংলা পূজা অ্যালবাম। এটি কেবল একটি সংগীত সংকলন নয়, বরং এটি ছিল এক ধরনের ‘আবেগীয় প্রত্নতত্ত্ব’।

এই অ্যালবামের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল নীতিন শঙ্করের সংগীতায়োজন। আজকের যুগে যখন সমস্ত সংগীত কি-বোর্ডে প্রোগ্রাম করা হয়, সেখানে এই পুরো অ্যালবামটি লাইভ ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করে রেকর্ড করা হয়েছে। এটি গানগুলোতে এক ধরনের ‘ভাইব্রেন্ট ফিল’ যোগ করেছে যা আশার ডাইনামিক ভয়েসের সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যায়। ‘শোনো এই তো সময়’ বা ‘মনে পড়ে রুবি রায়’-এর মতো গানগুলোতে বাদ্যযন্ত্রের লেয়ারিং লক্ষ করলে দেখা যায়, এখানে অকটোপ্যাড এবং কঙ্গোর এমন কিছু শব্দ তৈরি করা হয়েছে যা আর ডি বর্মণের সিগনেচার রিদম সেকশনের কথা মনে করিয়ে দেয়। আশার মতে, এই অ্যালবামটি করার সময় তাঁর মনে হয়েছে যেন স্বয়ং আর ডি বর্মণ তাঁকে গানগুলো গাইতে শেখাচ্ছেন।

আশা ভোঁসলের এই নয়টি নন-ফিল্‌ম অ্যালবাম বিশ্লেষণ করলে আমরা ভারতীয় সংগীতের বিবর্তনের এক পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র পাই। এখানে সুর কেবল বিনোদন নয়, বরং তা একটি জটিল শিল্পমাধ্যম, যা ক্রমাগত নিজেকে রূপান্তরিত করে চলেছে।

আশা ভোঁসলে তাঁর দীর্ঘ আট দশকের পথচলায় নিজেকে বারবার ভেঙেছেন এবং গড়েছেন। তিনি কেবল একজন গায়িকা নন, তিনি একজন সাংস্কৃতিক অনুঘটক। তাঁর এই বেসিক অ্যালবামগুলো প্রমাণ করে যে শুদ্ধ শিল্পগুণ থাকলে তা নিজে থেকেই শ্রোতার কাছে পৌঁছে যায়, তার জন্য বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের বিপণন বা অ্যালগরিদমের দাসত্ব প্রয়োজন নেই। টোনাল ট্রুথ এটাই যে—মানুষ মরণশীল, কিন্তু তাঁর প্রিয় সুরের কম্পাঙ্ক মহাকাশে কোনো এক অজানা সিগন্যাল হয়ে অনন্তকাল রয়ে যায়। আশা ভোঁসলের এই কাজগুলো সংগীত-ইতিহাসের এক চিরস্থায়ী আলোকবর্তিকা, যা যুগের পর যুগ ধরে নতুনের সন্ধানে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে যাবে। যখন দুই সংস্কৃতি সমান্তরাল না থেকে সম্বাদে প্রবেশ করে, তখন শিল্প সময়কে অতিক্রম করে।

আশা ভোঁসলের নন- ফিল্‌ম অ্যালবামগুলো আসলে তাঁর ‘স্বর’কে নিজের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার এক নিঃশব্দ কিন্তু নির্ভীক ঘোষণা। এই ধীর, ধ্যানী এবং দৃঢ় সুরগুলোই আমাদের শেখায় যে দ্রুততার দৌড়ে শেষপর্যন্ত দর্শনই জয়ী হয়। সংগীত কেবল মেলোডি নয়—মনের মানচিত্র, মুহূর্তের মুদ্রা, মায়ার মাপকাঠি। হ্যাপি লিসনিং!


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

অরিজিৎ লাহিড়ী জন্মেছেন নদীয়ার কল্যাণীতে (১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১), যেখানে ট্রেন আসে, যায়, এবং মাঝেমাঝে দাঁড়িয়ে থাকে—এক অদ্ভুত চিন্তার মতো। বড়ো হয়েছেন এশিয়ার প্রথম গণগ্রন্থাগারের শহর হুগলির উত্তরপাড়ায়। বাংলা এবং ইংরেজিতে তাঁর লেখা গদ্য, কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হয়েছে নানা ডিজিটাল ও মুদ্রিত পত্রিকায়। তাঁর লেখায় দর্শন থাকে, তত্ত্ব থাকে, আবার থাকে চায়ের কাপের পাশে রাখা বিস্কুটের মতো ভাঙা সংলাপও। কিছু লেখা প্রশ্ন তোলে, কিছু লেখা কেবল চুপ করে বসে থাকে—উত্তর দেওয়ার ভান না করেই।

অন্যান্য লেখা