preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
টোনাল ট্রুথ: পর্ব ১৪
ধারাবাহিক

টোনাল ট্রুথ: পর্ব ১৪

রূপম ইসলামের গানকে কেন্দ্র করে লেখা এই প্রবন্ধ কেবল সংগীত-সমালোচনা নয়, সমকালীন মানুষের মানসিকতা, একাকিত্ব, বিদ্রোহ ও আত্মসম্মানের এক গভীর পাঠ। ‘বেডওয়েটার’ এবং ‘যদি তুমি’–র সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে রূপমের গান ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে ছাড়িয়ে এক বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যে পরিণত হয়। সংগীত, দর্শন ও মনস্তত্ত্বের এই সংলাপ পাঠককে নতুনভাবে শুনতে শেখায়। প্রকাশিত হল ধারাবাহিক ‘টোনাল ট্রুথ’-এর চতুর্দশ পর্ব।

রূপম ইসলাম এবং তাঁর দুটি গানের ব্যবচ্ছেদ

বাঙালির শ্রবণবোধের দীর্ঘায়িত সনিক পতনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আজ আমাদের সামনে এমন এক শিল্পী উপস্থিত, যিনি নিজেকে ডিজিটাল স্যানিটাইজেশনের এই ডিস্টোপিয়ান যুগে এক পরম অ্যানালগ প্রতিরোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি রূপম ইসলাম। তাই অনুপ ঘোষালের হওয়ায় হীরক রাজার দেশে চলচ্চিত্রের সেই কালজায়ী গান—‘নহি যন্ত্র নহি যন্ত্র, আমি প্রাণী আমি জানি’—রূপমের কণ্ঠে কেবল এক নস্ট্যালজিক শ্রদ্ধাঞ্জলি হয়ে থেকে যায় না, তাঁর যাপন এবং দর্শনের একটি সরাসরি ইশতেহার হয়ে যায়। নিজেকে তিনি তারকা বা সেলিব্রিটি ভাবেন না, ভাবেন আজীবন পরিশ্রমী সাংস্কৃতিক কর্মী। যাঁর ছোটবেলার গানের রসদ তৈরি হয়েছিল তাঁর গান লেখিকা মায়ের অনুপ্রেরণায় এবং সত্যজিৎ রায়ের সেই প্রগাঢ় আধুনিক সিনেমার সাউন্ডট্র্যাকগুলোর মধ্য দিয়ে, তাঁর গান যে কেবল মেলোডির বিনোদন হবে না, তা তো বলাই বাহুল্য।

আজ যে রূপম ইসলামকে ঘিরে কলকাতা তথা বাংলার লক্ষাধিক যুবসমাজ উন্মাদনায় ফেটে পড়ে, তাঁর এই জয়যাত্রার শুরুতে কিন্তু লুকিয়ে ছিল এক গভীর ঐতিহাসিক প্রত্যাখ্যানের ট্রমা। ১৯৯৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, কলামন্দিরের সেই অনভিপ্রেত সন্ধ্যার কথা আমাদের মনে করতেই হয়। মঞ্চে তরুণ রূপম ইসলাম নিজের লেখা গান পারফর্ম করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সেদিনের রকের ব্যাকরণ না-জানা উদ্ধত জনতা মঞ্চে উঠে আসে। রূপমকে জোর করে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়া হয় এবং হুমকি দেওয়া হয়—বাংলায় রক হয় না, গান না থামালে মার খেতে হবে।

এই ঐতিহাসিক ভাবে প্রত্যাখাত তরুণটি কিন্তু দমে যাননি। তিনি সেই আঘাতকে নিজের সনিক ফুয়েল বানিয়ে নিয়েছিলেন। আর তাই ঠিক ৩০ বছর পর, সেই একই কলামন্দিরের মঞ্চে যখন ‘খাস একক ২’ কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়, তখন তা কেবল একটি সাধারণ শো থাকে না, তা হয়ে ওঠে এক ঐতিহাসিক বৃত্তের সম্পূর্ণতা, এক পরম হোমকামিং।

২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পায় ফসিলস্‌ ব্যান্ডের নবম স্টুডিও অ্যালবাম ‘ফসিলস্‌ ৭’। কোনও বড় মিডিয়া ল্যাবে তৈরি প্রচার ছাড়াই, অ্যালবামটি সম্পূর্ণ স্বাধীন রিলিজ হিসেবে আইটিউনস ইন্ডিয়ার সমস্ত ধারার চার্টের শীর্ষে স্থান করে নেয়। বলিউডি বিগ-বাজেট সিনেমাগুলোর গানকে পেছনে ফেলে এই জয় ছিল আসলে ডেভিড ও গোলিয়াথের সেই চিরায়ত রূপকের সনিক রূপান্তর। রূপম ইসলামের এই সময়ের দর্শন অত্যন্ত স্পষ্ট: জীবনের এই চরম অনিশ্চয়তা ও ভঙ্গুরতার মাঝে দাঁড়িয়ে কৃত্রিম স্যানিটাইজেশনের মুখোশ পরে থাকা অর্থহীন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন নিখুঁত সুর সেকেন্ডের মধ্যে তৈরি করে দিতে পারে, তখন মানুষ হিসেবে আমাদের একমাত্র টিকে থাকার পথ হলো আমাদের ত্রুটিগুলোকে প্রকাশ করা, আমাদের ক্ষতগুলোকে স্বীকার করা। অ্যালবামের গানগুলো আসলে মানুষের একাকীত্ব ও অন্তর্জগতের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক চুলচেরা বিশ্লেষণ। গানগুলোর সজ্জাও কোনও ক্রোনোলজিক্যাল বা বাণিজ্যিক ধারা মেনে করা হয়নি, বরং করা হয়েছে শ্রোতার মানসিক ক্যাথারসিসের গতিপ্রকৃতি বুঝে। লকডাউনের নিঃসঙ্গতা ও দীর্ঘ অবসাদ থেকে শুরু করে আবার লাইভ কনসার্টের সম্মিলিত এনার্জিতে ফেরার এক টাইম-ক্যাপসুল ছিল এই অ্যালবাম। ফসিলস ৭-এর মুক্তিও কর্পোরেট বিপণনের সেই চেনা জাঁকজমককে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছিল। নিউ আলিপুরের এক বিশাল খোলা ছাদে বসেছিল প্রথম বাংলা লিসেনিং পার্টি, যা কলকাতার পথ-সংস্কৃতিকে এক নতুন নান্দনিকতা দিয়েছে। চারিদিকে কর্পোরেট সজ্জার বদলে ছিল নিকষ কালো রঙের প্রাধান্য।

ফসিলস্‌ যেখানে মাঠ কাঁপানো সম্মিলিত উন্মাদনা, সেখানে রূপম ইসলামের নিজস্ব একক কনসার্ট সিরিজ ‘একক’ হলো এক নীরব, গভীর ও ব্যক্তিগত প্রতিস্পর্ধা। ২০১৩ সালের ২৫ জানুয়ারি মাত্র ৫০ জন শ্রোতাকে নিয়ে যে সাংগীতিক যাতায়াতের শুরু হয়েছিল, আজ তা ১৩ বছর পেরিয়ে এক অনন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। এককের মঞ্চটির দিকে তাকালে সনিক ফিলোসফির এক তীব্র বৈপরীত্য ধরা পড়ে। সেখানে রূপম ইসলামের পেছনে কোনও বিশাল ড্রাম কিট নেই, নেই কোনও হাই-ভলিউম মেটাল ব্যাকিং ট্র্যাক। তিনি সম্পূর্ণ একা, মানে আক্ষরিক অর্থে একক। তাঁর হাতে শুধু একটি গিটার, কখনো কিবোর্ড, কখনো ইউকুলেলে বা হারমোনিকা। এই কনসার্টটির প্রধান গুরুত্ব লুকিয়ে আছে এর গান নির্বাচনের মধ্যে। রূপম এখানে মূলত সেই অপ্রচলিত গানগুলো পরিবেশন করেন যা নিয়মিত ফসিলসের কোলাহলে বা স্ট্রিমিং সাইটের চার্টের তাগিদে গাওয়ার সুযোগ হয় না। এই ‘একক’ হলো আধুনিক স্ট্রিমিং অ্যাপের হিট-ড্রিভেন প্লেলিস্ট সংস্কৃতির এক সরাসরি প্রতিরোধ। স্পটিফাই বা অ্যাপল মিউজিকের অ্যালগরিদম আমাদের কানকে যেভাবে কন্ডিশনড করে দেয়, যেখানে একই ধরনের গান বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন রিসেপ্টর ট্রিগার করা হয়, সেখানে রূপম ইসলাম তাঁর এককের মাধ্যমে শ্রোতাদের সনিক ইমিউনিটি বাড়িয়ে তোলেন, যা শ্রোতাকে বাধ্য করে তাঁর পুরো মনোযোগ দিয়ে একটি গানের গভীরতম দর্শন ও শব্দগুলোকে আস্বাদন করতে, এবং নিঃসন্দেহে আজকের যান্ত্রিক যুগে এ এক বিরল অভিজ্ঞতা। করোনাকালীন লকডাউনেও যখন পৃথিবী অবরুদ্ধ ছিল, তখনও রূপম তাঁর নিজের বসার ঘরটিকে স্টুডিও বানিয়ে ডিজিটাল পর্দার ওপার থেকে এই ‘অনলাইন একক’ টিকিয়ে রেখেছিলেন সনিক কোয়ালিটির সাথে কোনও আপস না করেই। এই বিশেষ পর্বে আমরাও রূপমের প্রকাশিত কিন্তু কম আলোচিত একটি এবং একটি সম্প্রতি জনপ্রিয় নতুনতর গানের ব্যবচ্ছেদ করব এই ধারাবাহিক টোনাল ট্রুথের প্রথা মেনে কোনও আপস না করেই।

বেডওয়েটার
রূপম ইসলামের ‘বেডওয়েটার’ ট্র্যাকটির দিকে তাকালে প্রথম শ্রুতিতে মনে হতে পারে এটি কেবলই একটি বিশৃঙ্খল শব্দখেলা—অনুপ্রাস, ছন্দ আর পাগলাটে রাইমের আড়ালে যেখানে ইচ্ছে করে সমস্ত লজিক বা যুক্তিকে চুরমার করা হয়েছে। কিন্তু কানের ভেতরে শব্দগুলোকে একটু থিতু হতে দিলে বোঝা যায়, এই গানটি একই সাথে ভীষণভাবে ব্যক্তিগত বা এবং অত্যন্ত চতুরতার সাথে রাজনৈতিক এক মিক্সড টেপ। একদিকে এখানে রয়েছে সদ্যোজাত সন্তানকে নিয়ে এক বাবার নরম কৌতুক, অন্যদিকে নিজের যাপন, নিজের অতীত বিদ্রোহ আর পারিবারিক মনস্তত্ত্বের এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক কোলাজ। এই ট্র্যাকে শয্যা ভেজানো বা ‘বেডওয়েটিং’ কেবল একটি শিশুর নিরীহ ভুল নয়, এটি আসলে সামাজিক লজ্জার বা বিরুদ্ধে এক আপসহীন ইশতেহার। শৈশবের যে গোপন গ্লানি বড় হয়ে ট্রমার আকার নেয়, রূপম অবলীলায় তাকেই শিল্পের কাঁচামাল বানিয়ে ফেলেন। সমাজ যাকে আড়াল করতে বলে, রূপম তাকেই এক প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি বানিয়ে ছুড়ে দেন শ্রোতার দিকে—”তাতে কী?” প্রশ্নের মোড়কে। গানের ‘বাবা’ চরিত্রটি এখানে দারুণ কৌতূহল উদ্দীপক। ‘আলো জ্বাল এ হেন আপৎ কালে…’—এই থিয়েট্রিকাল উচ্চারণের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ওল্ড-স্কুল কর্তৃত্ব । ‘বাবা’ এখানে কেবল জন্মদাতা নন, তিনি নিজেই এক একটি প্রতিষ্ঠান—যা নিয়ম, শাসন আর নৈতিক খবরদারির প্রতীক। আর যখন গানটি বলে ‘বাবা থেকে পালাব’, তখন তা আসলে সেই দমবন্ধ করা সিস্টেম থেকে নিঃশব্দে লগআউট করার এক অবাধ্য ঘোষণা। ‘তুমি বললে করবই কেন?’—এই চিরকালীন স্পর্ধার এক রিফ্লেক্স এখানে কাজ করে। তবে এই বিদ্রোহ কেবল একমুখী নয়; কারণ যিনি বিদ্রোহ করছেন, সেই শিল্পী নিজেও তো আজ এক সন্তানের পিতা। ফলে একই মানুষ একই সাথে কর্তৃত্ব আবার প্রতিরোধী চেতনার যুগপৎ ধারক। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই গানটিকে বহুমাত্রিক করে তোলে। গানের অন্য এক জায়গায় যখন আমরা শুনি ‘ভেক ধরে নিঃস্বের মুখে মারি বিশ্ব’, তখন আধুনিক যুগের সোশ্যাল মিডিয়া পারসোনা এবং ‘ফেক ইট টিল ইউ মেক ইট’ সংস্কৃতির ছবিটাই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অফলাইনে আমরা যে চরম শূন্যতা আর লজ্জাকে লুকিয়ে রাখি, অনলাইনে সেটাই হয়ে ওঠে এক গ্ল্যামারাস শো-অফ। আমরা প্রত্যেকেই যেন ভেতরে ভেতরে একেকজন ‘বেডওয়েটার’—অফলাইনে লজ্জায় কুঁকড়ে থাকা আর অনলাইনে পরম আত্মবিশ্বাসী এক একটা ডামি। তবে গানটির সবচেয়ে বিপজ্জনক ও তীক্ষ্ণ রূপান্তরটি ঘটে পেনসিল আর পিস্তলের এক অক্ষরের ব্যবধানে। ‘পেনসিলটা চালিয়েছি…’ থেকে যখন অবলীলায় সুরটি সরে যায় ‘পিস্তলটা চালিয়েছি…’-তে, তখন সৃজনশীলতা আর সহিংসতা একে অপরের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। এই রূপকটি এক গভীর যৌথ সতর্কবার্তা। সমাজ যদি মানুষের ভাবপ্রকাশের পথগুলোকে অবরুদ্ধ করে দেয়, মানুষের সৃজনশীলতাকে যদি শেম বা লজ্জা দিয়ে চেপে ধরা হয়, তবে সেই সৃষ্টির পেনসিলই একদিন সহিংসতার পিস্তলে রূপান্তরিত হতে পারে। গানের ভাষাটি এখানে সুপরিকল্পিতভাবে অবিন্যস্ত। এখানে গ্ল্যামারাস পাস্ট, গণতন্ত্রের গালভরা বুলি আর রাজনীতির ঠ্যাসান সব একসঙ্গে একটা কোলাজ তৈরি করে। আমাদের মস্তিষ্ক যেভাবে ট্রমা, মিম, রাজনীতি আর ব্যক্তিগত ক্ষোভকে এক জগাখিচুড়ি টাইমলাইনে স্ক্রল করে চলে, ‘বেডওয়েটার’-এর সনিক টেক্সচারটিও ঠিক সেই বিশৃঙ্খলাকে ধারণ করে। কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ, কিছুটা দূরদর্শী আর সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত—আর ঠিক এখানেই লুকিয়ে আছে রূপমের এই অনন্য সনিক উয়েপনটির আসল শক্তি। সমাজ যখন সমস্ত নিয়ম আর তর্জনি দিয়ে শিল্পীকে মাপতে চায়, শিল্পী তখন হাসিমুখে বলতে পারেন—‘তাতে কী?”। পিতৃত্বের দায়, মেকি আত্মপরিচয়, সামাজিক গ্লানি আর রাজনৈতিক হতাশার এক অনন্য মিক্সড রিয়েলিটি এই গান।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

যদি তুমি
‘ফসিলস ৭’ অ্যালবামের অন্যতম অলঙ্কার ‘যদি তুমি’ ট্র্যাকটির দিকে তাকালে আমাদের প্রচলিত ধারণার এক বিরাট ভাঙন ঘটে । প্রথম শ্রুতিতে একে একটি সাধারণ ব্রেকআপ সং মনে হলেও, একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় এটি আসলে আবেগীয় সীমানা নির্ধারণের এক চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক ইশতেহার। গানের শুরুর লাইনেই শিল্পী খেলাটি পরিষ্কার করে দেন—‘যদি তুমি আবার দেখতে চাও বহু কষ্টে ভোলা স্বপ্নটাও’। অর্থাৎ, নস্ট্যালজিয়ার বা অবসেসিভ অতীতের সেই চোরা দরজা খোলার আগে তোমাকে দুবার ভাবতে হবে। সিদ্ধান্ত তোমার হতে পারে, কিন্তু সেই অতীতে ফেরা সবসময় সঙ্গত বা সুরময় হয় না। অতীতকে রোম্যান্টিক মনে হওয়াটা এক ধরনের মায়া, যার ভেতরে আসলে লুকিয়ে আছে এক তীব্র নীল বিষ। রূপম লিখছেন—‘শিশিরেও বিষ মিশে থাকে’। এটি আসলে ট্রমার এক গভীর রূপক। যন্ত্রণার শহর, অপমানের গ্লানি আর ভাঙনের ক্ষত সয়ে সয়ে শিল্পী নিজের ‘চেহারা’ বদলে ফেলেছেন—এই চেহারা স্রেফ বাহ্যিক অবয়ব নয়, এটি আসলে এক আবেগীয় বর্ম । অতীতের সেই অরক্ষিত মানুষটি আজ আর বেঁচে নেই।

যখন গানটি বলে, ‘যদি তুমি বিপথে ফেরাতে চাও’, তখন তা আসলে সেই পুরনো টক্সিক প্যাটার্ন বা ইমোশনাল লুপে টেনে নিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে এক চরম হুঁশিয়ারি। যদি তুমি আবার সেই চোরাবালিতে পা দিতে চাও, তবে সেই যন্ত্রণার দায়ভার সম্পূর্ণ তোমার। এর পরেই আসে এক অমোঘ উচ্চারণ—“অবিবেচক এ স্পষ্টতায়/ ধুয়ে যায় অপ্রেমিকের ভ্রম” । এখানে ভ্রমটা ভেঙে যায়। যে মানুষটা এতদিন নিজেকে বোঝাচ্ছিল — সে আর প্রেমে নেই, আর কিছুই অনুভব করে না, সবকিছু থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলেছে — সে হঠাৎ বুঝতে পারে, ক্ষতগুলো এখনও শুকোয়নি। ভিতরে ভিতরে সে এখনও আহত, এখনও সেই পুরোনো কষ্টের মধ্যেই আটকে আছে। ‘দাঁড়াই কাঠগড়ায়’—এই লাইনটির ভেতরে লুকিয়ে আছে এক সূক্ষ্ম ভিকটিম ব্লেমিং সংস্কৃতির ইশারা। যেখানে অপরাধ কার ছিল তা স্পষ্ট না হলেও, একজনকে বারবার ট্রায়াল বা কাঠগড়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে, প্রায়শ্চিত্তের আগুনে পুড়তে হয়েছে। আর তার শেষ পরিণতি কেবলই ‘পণ্ডশ্রম’—অর্থাৎ এক পরম আবেগীয় শূন্যতা। গানের মাঝের স্তবকগুলো যেন মনস্তত্ত্বের আরও জটিল স্তর উন্মোচন করে। ‘বিদ্রূপে হাসতে চাও/অপমানের দাম দাও’—এখানে শিল্পী সোজাসুজি দাবি করছেন, তুমি যদি আমাকে নিয়ে তামাশা করতে চাও, তবে তার আগে আমার যন্ত্রণার হিসেবটা বুঝে নাও। ‘কত গান গেয়েছে কান্নাও’—শিল্পীর কাছে তাঁর সমস্ত সৃষ্টিই আসলে তাঁর যন্ত্রণার এক পরম রূপান্তর। কিন্তু তবু এক অনুচ্চারিত হাহাকার রয়ে যায়—তুমি কি কখনো সত্যিই আমার সেই চোখের জল মুছিয়েছিলে? পরের লাইনেই ঘটে এক দার্শনিক রূপান্তর—‘কান্নারও সমাপ্তি থাকে’। এখানে এসে শিল্পী আর ভিকটিম মোডে আটকে থাকতে রাজি নন। তিনি তাঁর শোককে হাসির দেমাকের সাথে মিশিয়ে ফেলেছেন, নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলেছেন। কিন্তু সেই হাসির নীচে যে নিভৃত শোক লুকিয়ে আছে, তার সন্ধান কি কেউ কখনো করেছে? এইখানেই গানটির চতুর বিষাদ আমাদের স্তব্ধ করে দেয়। কিন্তু এই ট্র্যাকের সবচেয়ে পরিণত ও প্রাপ্তবয়স্ক জায়গাটি হলো—‘যদি তুমি সত্যি ভুলতে চাও… আমি দায়িত্ব নিচ্ছি না’। শিল্পী এখানে অন্য কারোর চয়েস বা সিদ্ধান্তের দায় নিজের কাঁধে নিতে অস্বীকার করছেন। এটি কোনও ব্লেম-শিফটিং বা দোষ চাপানো নয়, এটি আসলে নিজের ইমোশনালস্বাধিকারের এক চরম ঘোষণা। ‘যদি তুমি ভালবাসতেই চাও, ভুলে যাবার পরীক্ষা দাও’—লিরিক্সের এই প্যারাডক্স বা বৈপরীত্যটি এক পরম সত্যকে সামনে আনে। সত্যিকারের ভালোবাসার প্রমাণ কেবল ফিরে আসায় নয়; বরং নিজের ইগো, অতীত ক্ষোভ আর অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়ার ক্ষমতার মধ্যে নিহিত। তুমি কি দূরে থেকেও অবলীলায় ভালোবাসতে পারো? এটাই ভালোবাসার আসল লিটমাস টেস্ট। শেষ স্তবকে এসে গানটি এক গভীর অস্তিত্ববাদী রূপ নেয়। ‘কী হবে ঠিকানা জেনে, অতীতে আর তো ফিরছি না’—শিল্পী জানেন যে অতীত নামক সেই ঠিকানায় কোনও ‘রিটার্ন টু সেন্ডার’ সম্ভব নয়। ঠিকানা জানা থাকলেই টাইম ট্রাভেল বা অতীতে ফিরে যাওয়া যায় না। আর তাই রোমান্টিক আয়রনির সুরে রূপম মনে করিয়ে দেন—‘শ্রেষ্ঠ ভালবাসার গল্পে শুধুই বিরহ একাকী’। সমস্ত মহান প্রেমের আখ্যানে মিলনের চেয়ে বিরহের হাহাকারই চিরকাল অমর হয়ে থাকে। সবশেষে, ‘সূচনারও সমাপ্তি থাকে… সে পথে আরও চলা বাকি’—লাইনটি কোনও সমাপ্তি বা ক্লোজার নয়; এটি আসলে এক নতুন যাত্রা। এক শেষের সীমানা থেকেই শুরু হচ্ছে নতুন এক আখ্যান। যদি এক লাইনে এই পুরো সৃষ্টিকে ডিকোড করতে হয়, তবে বলতে হবে—এই গানটি কোনও মিটমাট বা রিকনসিলিয়েশন নিয়ে নয়, এটি আসলে আত্মসম্মান নিয়ে লেখা এক ম্যাজেস্টিক ম্যানিফেস্টো। অতীতে ফিরতে চাইলে ফেরা যায়, কিন্তু পুরনো সেই ভেঙে যাওয়া মানুষটি হয়ে নয়। ভালোবাসতে চাইলে বাসা যায়, কিন্তু কোনও অধিকারবোধ নিয়ে নয়। আর যদি তুমি সত্যিই ভুলে যেতে চাও—তবে মনে রেখো, সে আর তোমার জীবনের প্রোটাগনিস্ট নয়, সে নিজের গল্পে অনেক দূরে এগিয়ে গেছে।

রূপম ইসলামের কথা আর সুরের ট্রানজিট আমাদের এক মহাজাগতিক সত্যের সামনে এনে দাঁড় করায়। আজকের এই ডিজিটাইজড যুগে, যেখানে মানুষের আবেগও ল্যাবের নিখুঁত সমীকরণে তৈরি করা এক একটা সিম্যুলেটেড এক্সপেরিয়েন্স, যেখানে মার্ক ফিশার বর্ণিত পুঁজিবাদী একাকীত্ব আমাদের গ্রাস করছে, সেখানে রূপম ইসলামের গান অত্যন্ত জরুরি ও রাজনৈতিক। তাঁর পঞ্চাশতম জন্মদিনে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে সেই কালজয়ী উপদেশটি আমাদের মনে রাখতেই হবে: যতটা সম্ভব ভালো হও, খারাপ হও, কিংবা কুৎসিত হও—কিন্তু একটা আস্ত মানুষ হও, কোনও ম্যানিকুইন হয়ে থেকো না।

আমরা এখনও প্রাণী, আমরা এখনও জানি । আর সেই পরম সনিক সত্য বা টোনাল ট্রুথ অনুসন্ধান করার জন্যই আমাদের এই সংগীতের ক্যানভাসে বারবার ফিরে আসতে হবে।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

অরিজিৎ লাহিড়ী জন্মেছেন নদীয়ার কল্যাণীতে (১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১), যেখানে ট্রেন আসে, যায়, এবং মাঝেমাঝে দাঁড়িয়ে থাকে—এক অদ্ভুত চিন্তার মতো। বড়ো হয়েছেন এশিয়ার প্রথম গণগ্রন্থাগারের শহর হুগলির উত্তরপাড়ায়। বাংলা এবং ইংরেজিতে তাঁর লেখা গদ্য, কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হয়েছে নানা ডিজিটাল ও মুদ্রিত পত্রিকায়। তাঁর লেখায় দর্শন থাকে, তত্ত্ব থাকে, আবার থাকে চায়ের কাপের পাশে রাখা বিস্কুটের মতো ভাঙা সংলাপও। কিছু লেখা প্রশ্ন তোলে, কিছু লেখা কেবল চুপ করে বসে থাকে—উত্তর দেওয়ার ভান না করেই।

অন্যান্য লেখা