সংগীত এখন সর্বত্র, কিন্তু মনোযোগী শ্রবণ ক্রমেই বিরল। কেতাব-ই’র নতুন ধারাবাহিক ‘টোনাল ট্রুথ’ সেই হারানো শ্রবণবোধের অনুসন্ধান। নতুন অ্যালবাম বিশ্লেষণ, অ্যালগরিদমে হারিয়ে যাওয়া গান, সংগীতজগতের অন্তর্লোক ও সময়ের সাউন্ডস্কেপ—সব মিলিয়ে অরিজিৎ লাহিড়ীর এই কলাম সংগীতকে পড়তে চায় চার্টের বাইরে, সংস্কৃতির গভীর প্রেক্ষাপটে। আজ একাদশ পর্ব।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে সংগীত সর্বত্র, অথচ শ্রবণ ক্রমশ বিরল। রিলের পনেরো সেকেন্ড, শর্ট ভিডিয়োর হুক-লাইন, অ্যালগরিদমিক প্লেলিস্টের ডোপামিন-ড্রিপ—সব মিলিয়ে আজকের সংগীতভোগ অনেকটাই ফাস্ট-ফুড কালচারের অডিয়ো সংস্করণ। গান এখন আর ধ্যান নয়, ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ। অথচ শব্দের ইতিহাস অনেক পুরোনো, অনেক গভীর। উপনিষদ যাকে বলেছিল ‘নাদব্রহ্ম’—অর্থাৎ এই মহাবিশ্বের মূলেই রয়েছে কম্পন—সেই ধারণা আজ আধুনিক সাউন্ড-ফিজিক্স, নিউরোসায়েন্স এবং কোয়ান্টাম থিওরির সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে যাচ্ছে। আর এই সংযোগরেখার ওপর দাঁড়িয়ে যে ব্যান্ডটি বিংশ শতাব্দীর সংগীত-ইতিহাসে প্রায় এক বিকল্প মহাবিশ্ব তৈরি করেছিল, তার নাম—শক্তি।
শক্তির গল্প আসলে কেবল একটি ব্যান্ডের গল্প নয়। এটি সভ্যতার দুই বিপরীত সাউন্ড-সিস্টেমের সংঘর্ষ ও সহাবস্থানের ইতিহাস। একদিকে পাশ্চাত্যের জ্যাজ—যার ভিত বিদ্রোহ, ইম্প্রোভাইজেশন এবং হারমনিক ভাঙচুর; অন্যদিকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত—যার ভিত ধ্যান, পুনরাবৃত্তি, রাগ-সময়ের চক্রাকার দর্শন। এই দুই মেরু যখন একে অপরকে স্পর্শ করল, তখন যে সনিক রসায়ন তৈরি হল, তাকে ‘ফিউশন’ বলাটা অত্যন্ত ছোটো শব্দ। শক্তি আসলে ছিল এক ধরনের সংগীততাত্ত্বিক পার্টিকল কোলাইডার।
জন ম্যাকলাফলিনের যাত্রাটা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ষাট ও সত্তরের দশকের জ্যাজ-রক দৃশ্যে তিনি ছিলেন প্রায় বিদ্যুৎগতির গিটার-ঈশ্বর। ‘মহাবিষ্ণু অর্কেস্ট্রা’ তাঁর সেই ইলেকট্রিক উন্মাদনার শিখর। কিন্তু সেই উন্মাদনার মধ্যেও তিনি বুঝতে পারছিলেন—পাশ্চাত্য হারমনির কাঠামো তাঁর অনুসন্ধানকে সম্পূর্ণ করছে না। কোথাও যেন একটি অনুপস্থিত কম্পন রয়ে যাচ্ছে। শ্রী চিন্ময়ের সংস্পর্শে এসে তাঁর সেই অনুসন্ধান আধ্যাত্মিক মোড় নেয়। চিন্ময় তাঁকে ‘মহাবিষ্ণু’ নাম দেন। এক অর্থে, ম্যাকলাফলিন তখন সংগীত বাজাচ্ছিলেন না; তিনি সংগীতের ভেতর দিয়ে এক ধরনের অস্তিত্বগত শর্ট সার্কিট খুঁজছিলেন।
এই অনুসন্ধান থেকেই ‘তুরীয়ানন্দ সংগীত’-এর জন্ম। নামটার মধ্যেই আছে উপনিষদীয় চেতনার গন্ধ। জাগরণ, স্বপ্ন, সুষুপ্তি পেরিয়ে যে ‘তুরীয়’ অবস্থা—যেখানে ব্যক্তি ও মহাবিশ্বের বিভাজন মুছে যায়—এই সংগীত সেই অবস্থারই সাউন্ডট্র্যাক হওয়ার চেষ্টা করেছিল। জন ম্যাকলাফলিন, এল শঙ্কর, রামনাদ রাঘবন এবং ইভ ম্যাকলাফলিনের সেই প্রাথমিক গোষ্ঠী মূলত সংগীত পরিবেশন করছিল না; তারা সাউন্ডকে মেডিটেটিভ স্পেসে রূপান্তরিত করছিল। পরে জাকির হুসেন যোগ দিলে নাম হয় ‘শক্তি’। কারণ পশ্চিমা শ্রোতাদের কাছে ‘তুরীয়ানন্দ সংগীত’ ছিল প্রায় জিভ-ভাঙা ধাঁধা। একটু কৌতুকের জায়গা আছে এখানে—আধ্যাত্মিকতাকেও শেষপর্যন্ত মার্কেটিংয়ের বানান মেনে চলতে হয়।
কিন্তু নাম বদলালেও মূল দর্শন বদলায়নি। শক্তির সংগীতের কেন্দ্রে ছিল ‘কম্পন’। উপনিষদে ‘আহত’ ও ‘অনাহত’ নাদের যে ধারণা পাওয়া যায়—অর্থাৎ একদিকে আঘাতে তৈরি শব্দ, অন্যদিকে মহাজাগতিক নীরবতার অন্তর্লীন কম্পন—শক্তি সেই দুই স্তরের মধ্যে একটি সেতু তৈরি করেছিল। জাকির হুসেনের তবলা যখন দ্রুত লয়কারিতে ছুটে যায়, অথবা এল শঙ্করের বেহালা যখন রাগের ভেতর মাইক্রোটোনাল গ্লাইড তৈরি করে, তখন সেখানে কেবল নোটের বিন্যাস ঘটে না; সেখানে বাতাসের চাপ, কম্পন, রেজোন্যান্স, নিউরাল প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে একটি জটিল ফিজিক্যাল প্রসেস তৈরি হয়।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
মানুষের মস্তিষ্ক মূলত প্যাটার্ন-রিকগনিশন মেশিন। সংগীতের হারমনিক অনুপাত, পলিরিদমিক চক্র, পুনরাবৃত্তিমূলক ড্রোন—এসব মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ককে নির্দিষ্টভাবে উত্তেজিত করে। নিউরোসায়েন্স বলছে, কিছু বিশেষ ছন্দ এবং ফ্রিকোয়েন্সি ব্রেনওয়েভকে ‘এনট্রেইন’ করতে পারে। অর্থাৎ, বাইরের রিদমের সাথে মস্তিষ্ক নিজের কম্পনকে সমলয়ে আনতে শুরু করে। শক্তির দীর্ঘ ইম্প্রোভাইজেশন শুনলে যে ‘সময় হারিয়ে ফেলার’ অনুভূতি হয়, সেটি নিছক কবিত্ব নয়; এটি এক বাস্তব নিউরোলজিক্যাল অবস্থা। আলফা, থিটা এবং গামা ওয়েভের মধ্যেকার সিঙ্ক্রোনাইজেশন শ্রোতাকে প্রায় ট্রান্স-সদৃশ অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে। উপনিষদ এই অবস্থাকেই ‘তুরীয়’ বলেছিল। আধুনিক সাইকোলজি একে বলছে ‘সেলফ-ট্রান্সসেন্ডেন্স’।
জন ম্যাকলাফলিনের ১৩-তারের শক্তি গিটারটি এই দর্শনের প্রযুক্তিগত রূপ। এটি কোনো সাধারণ গিটার নয়; এটি বীণা, সেতার এবং জ্যাজ গিটারের মেটা-মডার্ন হাইব্রিড। স্ক্যালপড ফ্রেটবোর্ডের কারণে তিনি এমন মাইক্রোটোনাল মিড় তৈরি করতে পারতেন, যা পাশ্চাত্য গিটারে প্রায় অসম্ভব। তার সাথে ছিল সাতটি সিমপ্যাথেটিক স্ট্রিংস—যেগুলো সরাসরি বাজানো হত না, কিন্তু অন্য তারের কম্পনে নিজেরাই অনুরণিত হত। পদার্থবিজ্ঞানে একে বলে ‘রেজোন্যান্স’; ভারতীয় সংগীততত্ত্বে—তরঙ্গের সহবাস।
এল শঙ্করের ডাবল-নেক বেহালা, ভিক্কু বিনায়করামের ঘটম, জাকিরের তবলা—সব মিলিয়ে শক্তির লাইভ পারফরম্যান্স ছিল প্রায় এক অ্যাকুস্টিক স্থাপত্য। বাইরে থেকে শুনলে মনে হত বিশৃঙ্খলা চলছে। কিন্তু গভীরে গেলে বোঝা যেত, সেই ক্যাওসের ভেতরেই আছে ফ্র্যাক্টাল জ্যামিতি। একাধিক তালচক্র একইসাথে চললেও শেষ পর্যন্ত তারা ‘সম’-এ ফিরে আসে। যেন মহাবিশ্বের সমস্ত অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত আবার এক কেন্দ্রে গিয়ে মিশছে।
১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭—মাত্র কয়েক বছরে ‘শক্তি উইথ জন ম্যাকলাফলিন’, ‘অ্যা হ্যান্ডফুল অব বিউটি’ এবং ‘ন্যাচারাল এলিমেন্টস’ প্রকাশিত হয়। এই অ্যালবামগুলো আজও শুনলে মনে হয়, সংগীত কখনো-কখনো সময়কে বাঁকিয়ে দিতে পারে। কিন্তু প্রতিটি মহাজাগতিক প্রকল্পের মধ্যেই আত্মবিনাশের বীজ থাকে। দীর্ঘ সফর, সাংস্কৃতিক দূরত্ব, অর্থনৈতিক চাপ, ব্যক্তিগত ক্লান্তি—সব মিলিয়ে ১৯৭৮ সালে শক্তি ভেঙে যায়। একটু নির্মম সত্য হল—সবচেয়ে আধ্যাত্মিক সংগীতও শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরের ক্লান্তির কাছে হেরে যায়।
তবু কিছু সুরের মৃত্যু হয় না। তারা শুধু ফরম্যাট বদলায়।
১৯৯৭ সালে ‘রিমেম্বার শক্তি’ নামে ফিরে আসে নতুন অবতার। হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, পরে ইউ. শ্রীনিবাস, শংকর মহাদেবন—নতুন শিল্পীরা যুক্ত হন। ‘দ্য বিলিভার’, ‘স্যাটারডে নাইট ইন বম্বে’—এসব অ্যালবাম শুনলে বোঝা যায়, শক্তি তখন আর ব্যান্ড নয়; এটি এক চলমান সাউন্ড-আর্কাইভ। যেখানে রাগ, জ্যাজ, লোকসংগীত, শহুরে শব্দ, আধ্যাত্মিক ধ্যান—সব একসাথে হাইপারলিঙ্কড হয়ে যাচ্ছে।
২০২৩ সালে ‘দিস মোমেন্ট’—প্রায় ছেচল্লিশ বছরের ইতিহাসের পর শক্তির প্রথম স্টুডিও অ্যালবাম। এবং ২০২৪ সালে সেটি গ্র্যামি জেতে। ইতিহাসের এখানে এক চমৎকার আইরনি আছে। যে সংগীত একসময় মূলধারার বাজার পুরোপুরি বুঝতে পারেনি, সেই সংগীতকেই পরে ‘গ্লোবাল মিউজিক’ পুরস্কার দিয়ে স্বীকৃতি দিতে হল। ইতিহাস মাঝে মাঝে সত্যিই লেটলতিফ।
এরপর ‘মাইন্ড এক্সপ্লোশন’। জাকির হুসেনের মৃত্যুর পর এই অ্যালবাম প্রায় বিদায়ী দলিল হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু শক্তির সংগীতে ‘শেষ’ বলে কিছু নেই। এখানে প্রতিটি সমাপ্তি আরেকটি রিহার্সালের শুরু। প্রতিটি কর্ড আসলে একটি অসমাপ্ত প্রতিধ্বনি।
আজকের এআই-নির্ভর, অটো-টিউনড, ক্লিনিক্যালি পারফেক্ট সংগীত-যুগে শক্তি ভয়ংকরভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ তারা প্রমাণ করেছিল—সংগীতের সৌন্দর্য নিখুঁততায় নয়, অসম্পূর্ণতার রেজোন্যান্সে। মানবিক ভুল, নিশ্বাস, টান, ঘর্ষণ—এসবই সংগীতকে জীবন্ত রাখে। সাউন্ডের মধ্যে একটু ধুলো না থাকলে, সেটি কেবল সফটওয়্যার ডেমো হয়ে যায়।
শেষপর্যন্ত শক্তি আমাদের একটি নির্মম অথচ মুক্তিদায়ী সত্য শেখায়—বিশুদ্ধতা বলে কিছু নেই। সব কিছুই ফিউশন। ভাষা, সংস্কৃতি, স্মৃতি, প্রেম, এমনকি চেতনা পর্যন্ত।
অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দ ঠিক করে দিতে পারে, কিন্তু তুরীয় চেতনা তৈরি করতে পারে না।
সেখানে এখনও মানুষের আঙুল, মাটির ঘটম, চামড়ার তবলা আর কম্পিত বাতাসেরই জয়।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।
