সংগীত এখন সর্বত্র, কিন্তু মনোযোগী শ্রবণ ক্রমেই বিরল। কেতাব-ই’র নতুন ধারাবাহিক ‘টোনাল ট্রুথ’ সেই হারানো শ্রবণবোধের অনুসন্ধান। নতুন অ্যালবাম বিশ্লেষণ, অ্যালগরিদমে হারিয়ে যাওয়া গান, সংগীতজগতের অন্তর্লোক ও সময়ের সাউন্ডস্কেপ—সব মিলিয়ে অরিজিৎ লাহিড়ীর এই কলাম সংগীতকে পড়তে চায় চার্টের বাইরে, সংস্কৃতির গভীর প্রেক্ষাপটে।
কথামুখ
সংগীত সর্বব্যাপী, সর্বগ্রাসী, সর্বক্ষণিক। স্ক্রিনের স্ক্রলে, স্ট্রিমিংয়ের স্ট্যাটিস্টিক্সে, সাবওয়ের সাইলেন্ট সিটে—সবখানেই সাউন্ড অ্যান্ড সাউন্ড। কিন্তু শ্রবণ? আমরা কি সত্যিই শুনি, না কি কেবল স্কিপ করি? ‘টোনাল ট্রুথ’ সেই স্থির, সন্দেহী, সচেতন প্রশ্নক্ষেত্র।
এই কলাম শুধুই জনপ্রিয়তার প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নয়, আবার জনপ্রিয়তাকে প্রত্যাখ্যানও করে না। কিছু পর্বে আই টিউন্স ও স্পটিফাই-নির্ভর তিনটি করে নতুন অ্যালবাম (গ্লোবাল, ন্যাশনাল, লোকাল) বিশ্লেষণ করা হবে—সুরের স্থাপত্য, শব্দের স্তরবিন্যাস, সংগীতায়োজনের সংগঠন, মিক্সিংয়ের মর্ম এবং সাংস্কৃতিক সঞ্চারের সূক্ষ্ম সংকেত নিয়ে। চার্ট এখানে চূড়ান্ত সত্য নয়—চার্ট কেবল চিত্র। কারণ সংখ্যার নেশা অনেক সময় শিল্পের নীরবতা মুছে দেয়। তিনটি করে অ্যালবামের ত্রিমাত্রিক পাঠ—কম্পোজিশনাল কনস্ট্রাকশন, লিরিক্যাল লেয়ারিং, সনিক সিগনেচার, সুরের স্কেল, রাগের রেশ, হারমোনিক হস্তক্ষেপ—সব বিশ্লেষণ করা হবে। সংগীতকে এখানে মুগ্ধতার মোড়কে নয়, সংগীত মেধার মাপকাঠিতেই মাপা হবে।
কোনো পর্বে থাকবে জনপ্রিয় শিল্পীর অপ্রচলিত অথচ গভীর গান অথবা সংগীত। ভাইরাল ভলিউমের ভিড়ে যে ট্র্যাকটা তলিয়ে গেছে, সেই টোনাল টেক্সচার তুলে আনা হবে। কেন গানটি প্লেলিস্টপ্রবণ নয়? কোথায় তার কাঠামোগত কৌতূহল? কোন রূপক রয়ে গেছে ব়্যাডারের বাইরে? অ্যালগরিদমের অন্ধত্বকে প্রশ্ন করে, আমরা খুঁজব অন্তর্লীন অন্তর্নিহিততা।
থাকবে সংগীত নিয়ে গল্প। শব্দের শরীর থেকে মানুষের মুখ। হয়তো এক সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারের সংযম ও সংগ্রাম, হয়তো এক পুরোনো ভিনাইলের বিষণ্ণ বিবরণ, হয়তো এক ব্যর্থ ব্যান্ডের ব্রেকডাউন। সংগীত কেবল মেলোডি নয়—মনের মানচিত্র, মুহূর্তের মুদ্রা, মায়ার মাপকাঠি।
থাকবে সংগীত-সময়ের সমীক্ষা। কোন ধারা জিতছে? সাব-বেস কি সুরকে সরিয়ে দিচ্ছে? লাইভ লেয়ার কি লুপের কাছে লুপ্ত? এআই-নির্মিত নির্ভুলতা কি মানবিক হেঁচকি জাস্ট মুছে দিচ্ছে? সংগীত কি প্রোডাকশনের প্রভুত্বে বন্দি, না কি এখনও ব্যক্তিত্বের প্রতিধ্বনি?
‘টোনাল ট্রুথ’ কোনো ফ্যান-ফোরাম নয়, কোনো হাইপ-হাউসও নয়। এটি গবেষণামূলক, কিন্তু গদ্যের গাঢ়তায় গীতিময়। এটি বিশ্লেষণী, কিন্তু অমায়িক নয়। এখানে সংগীতকে কনটেন্ট হিসেবে নয়, কালচারের কনটেক্সটে দেখা হবে।
আমরা এমন সময়ে বাস করি, যেখানে গান মুক্তির দিনে মিম, সপ্তাহান্তে ম্লান। ট্রেন্ড ত্বরিত, তৃপ্তি তাৎক্ষণিক, তবু স্থায়িত্ব সন্দিগ্ধ। এই দ্রুততার দৌড়ে ‘টোনাল ট্রুথ’ ধীর, ধ্যানী, দৃঢ়। কারণ দ্রুততা দৃশ্যমানতা দেয়, কিন্তু ধীরতা দেয় দর্শন।
এই কলাম এক আর্কাইভাল আকাঙ্ক্ষা—শব্দের সত্তা সংরক্ষণের স্বল্পায়ু চেষ্টা। সংগীতের টেক্সচার, তর্ক, তীব্রতা—সব নথিভুক্ত করার প্রয়াস।
কারণ ট্রেন্ড ফিকে হয়। হাইপ হারায়।
কিন্তু টোনাল ট্রুথ—থাকে।
হ্যাপি লিসনিং অ্যান্ড রিডিং!
এক
একদিকে গ্লোবাল পপ আইকনদের হাই-কনসেপ্ট অ্যালবামের আধিপত্য, অন্যদিকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীতায়োজনে ধ্রুপদি রাগাশ্রয়ী সুরের সঙ্গে সমকালীন হিপ-হপ বা ইলেকট্রো-বিটের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। এরই সমান্তরালে বাংলা রকের দীর্ঘ বিবর্তনীয় ধারায় একটি মাইলফলক হিসেবে উপস্থিত হয়েছে ‘ফসিল্স ৭’।
এই পর্বে আমরা আমরা তিনটি ভিন্ন ধারার অ্যালবামের তুলনামূলক আলোচনা এবং সংগীততাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ করব: টেলর সুইফটের ‘দ্য লাইফ অফ আ শো গার্ল’, শাশ্বত সচদেবের সুরারোপিত ‘ধুরন্ধর’ এবং বাংলা রকের পথিকৃৎ ব্যান্ড ফসিল্সের ‘ফসিল্স ৭’।
১. সংগীত রচনা
যে-কোনো সংগীতের প্রাণ হল তার সুরের কাঠামো এবং কম্পোজিশনাল আর্কিটেকচার। এই তিনটি অ্যালবামের সুরের নির্মাণশৈলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ জন্রার সীমানা অতিক্রম করার চেষ্টা করেছেন। টেলর সুইফটের দ্বাদশ স্টুডিয়ো অ্যালবাম ‘দ্য লাইফ অব আ শোগার্ল’ তার পূর্ববর্তী ‘দ্য টরচার্ড পোয়েটস ডিপার্টমেন্ট’-এর বিষণ্ণতা থেকে বেরিয়ে এক উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত এবং থিয়েট্রিক্যাল মেলোডিক স্ট্রাকচারের দিকে ঝুঁকেছে। এখানে সুরের কাঠামো মূলত উনিশশো পঞ্চাশের দশকের ডু-ওয়াপ এবং উনিশশো সত্তরের দশকের সফ্ট রক দ্বারা প্রভাবিত।
অ্যালবামের ‘ওপালাইট’ গানটিতে দেখা যায় ‘ফিফটিজ প্রগ্রেশন’-এর এক অনন্য ব্যবহার, যা মূলত ডু-ওয়াপ সংগীতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই গানটিতে সুরের বিন্যাস এতটাই সূক্ষ্ম যে, কোরাসে ব্যবহৃত ‘ওহ, ওহ, ওহ, ওহ’ অংশটি এক ধরনের নস্টালজিক আবহ তৈরি করে। আবার ‘এলিজাবেথ টেইলর’ গানটিতে মেলোডিক ড্রপ এবং স্ট্রং হারমোনির ব্যবহার তাকে আধুনিক পপ ব্যালাডের রূপ দিয়েছে। এখানে সুইফট তার নিজস্ব কান্ট্রি মিউজিক ঘরানার শিকড়কে বজায় রেখেই ডিস্কো এবং নিউ ওয়েভ উপাদানের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন।
অন্যদিকে, শাশ্বত সচদেবের ‘ধুরন্ধর’ সাউন্ডট্র্যাকটি ভারতীয় শাস্ত্রীয় রাগের সঙ্গে আধুনিক সাউন্ড ডিজাইনের এক অবিশ্বাস্য মেলবন্ধন। বিশেষ করে ‘ইশক জলাকার – কারভাঁ’ গানটিতে শাশ্বত রাগ ‘দরবারি কানাড়া’ এবং ‘ভীমপলশ্রী’-র সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। দরবারি কানাড়ার গম্ভীরতা এবং ভীমপলশ্রীর বিষণ্ণ আকুতি গানটিকে এক ধরনের দার্শনিক উচ্চতা দিয়েছে।
শাশ্বতের কম্পোজিশনের বৈশিষ্ট্য হল তিনি সুরের মাঝে স্তব্ধতাকে ব্যবহার করতে জানেন। ‘গেহরা হুয়া’ গানটিতে অরিজিৎ সিং-এর কণ্ঠের জন্য তিনি যে মেলোডিক ল্যান্ডস্কেপ তৈরি করেছেন, তা একইসঙ্গে ভঙ্গুর এবং শক্তিশালী। টাইটেল ট্র্যাকটিতে জ্যাসমিন স্যান্ডলাসের ইমোশনাল আর্কিটেকচার এবং হনুমানকাইন্ডের হিপ-হপ ফ্লো-কে এমনভাবে সংস্থাপিত করা হয়েছে যা বলিউডি সংগীতের প্রচলিত প্রথাকে ভেঙে দেয়।
শাশ্বত সচদেব এই সাউন্ডট্র্যাকের জন্য প্রায় সাত বছর ধরে কাজ করেছেন, যা প্রতিটি ট্র্যাকের গঠনগত নিখুঁততায় স্পষ্ট।
‘ফসিল্স ৭’ অ্যালবামের ক্ষেত্রে রূপম ইসলাম তার চিরচেনা হার্ড রক এবং ব্লুজ ঘরানাকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছেন। দীর্ঘ পাঁচ বছরের প্রস্তুতি এবং প্যান্ডেমিক-পরবর্তী সৃজনশীলতা এই অ্যালবামের সুরের বিন্যাসে স্পষ্ট। ‘ক্ষুধার্ত মাংসাশী’ গানটির দৈর্ঘ্য প্রায় দশ মিনিট উনষাট সেকেন্ড, যা বাংলা রকের ইতিহাসে একটি সাহসী পদক্ষেপ।
এই দীর্ঘায়িত ট্র্যাকে সুরের স্তরবিন্যাস বা মেলোডিক লেয়ারিং অত্যন্ত জটিল। রূপম এখানে সাইকোঅ্যানালিটিক্যাল সুরের কাঠামো ব্যবহার করেছেন, যা লিনিয়ার নয়, বরং চক্রাকার। ‘অপরিবর্তিত’ বা ‘যদি তুমি’ গানগুলিতে সুরের চলন অত্যন্ত অর্গানিক এবং লাইভ পারফরম্যান্সের মেজাজে তৈরি।
ফসিল্সের কম্পোজিশনে ওয়েস্টার্ন হার্ড রক ইডিয়ম থাকলেও তাতে কলকাতার নাগরিক জীবনের এক অন্তর্নিহিত সুরধারা মিশে থাকে। ব্যান্ডের সিগনেচার টিউন এবং রূপমের কণ্ঠের ওঠা-নামা গানগুলোকে এক ধরনের ড্রামাটিক টেনশন প্রদান করে।
সুরের এই ত্রিবিধ ধারার তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, সুইফট যেখানে নস্টালজিয়াকে আধুনিক পপ গ্রামারের ছাঁচে ঢালছেন, শাশ্বত সচদেব সেখানে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে একটি সলিড ইলেকট্রো-পপ ভিত্তি প্রদান করছেন। আবার ফসিল্স তাদের দীর্ঘদিনের অর্জিত হার্ড রক ইডিয়মকে আরও বেশি এক্সপেরিমেন্টাল এবং দীর্ঘায়িত কম্পোজিশনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই তিন সুরকারের মধ্যেই একটি সাধারণ মিল হল তাদের ‘স্ট্রাকচারাল অ্যাম্বিশন’। সুইফট একটি ১২ ট্র্যাকের টাইট অ্যালবামের মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট ন্যারেটিভ তৈরি করেছেন, যেখানে শাশ্বত সচদেব একটি স্পাই-থ্রিলার সিনেমার আবহে বৈচিত্র্যময় সনিক ওয়ার্ল্ড তৈরি করেছেন। ফসিল্স ৭-এ রূপম ইসলাম এবং ব্যান্ড সুরের মাধ্যমে এক ধরনের মেটাফিজিক্যাল যাত্রা সম্পন্ন করেছেন ।
২. গীতিকবিতা
সংগীতের কাব্যিক দিকটি ভাষার ব্যবহার এবং রূপক প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে। টেলর সুইফটের ‘দ্য লাইফ অব আ শোগার্ল’ অ্যালবামে গীতিকবিতার মূল উপজীব্য হল সেলিব্রেটি জীবন, খ্যাতির বিড়ম্বনা এবং ট্র্যাভিস কেলসের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের রসায়ন। এখানে লুইসা মে অ্যালকটের ‘এলডেস্ট ডটার’ বা শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এর ওফেলিয়া চরিত্রকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘দ্য ফেট অব ওফেলিয়া’ গানটিতে সুইফট নিজেকে ওফেলিয়ার ট্র্যাজেডি থেকে রক্ষা পাওয়া এক আধুনিক নারী হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তার ভাষা অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত এবং এখানে ইন্টারনেটের স্ল্যাং শব্দ বা ‘ক্রিঞ্জ’ উপাদানকেও তিনি স্যাটায়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এলিজাবেথ টেলরের ভায়োলেট চোখ বা ‘হোয়াইট ডায়মন্ডস’ পারফিউমের উল্লেখ তার গীতিশৈলীতে এক ধরনের ভিজ্যুয়াল ডিটেইলিং যোগ করে। এই অ্যালবামের লিরিক্স অনেকটা কনফেশনাল এবং আত্মসচেতন, যা একজন শো-গার্লের পর্দার আড়ালের জীবনকে তুলে ধরে।
শাশ্বত সচদেবের অ্যালবামে ইরশাদ কামিলের লেখনী এক নতুন উচ্চতা স্পর্শ করেছে। বিশেষ করে ‘ইশক জলাকার’ গানে সাহির লুধিয়ানভির দর্শনের যে প্রতিফলন দেখা যায়, তা আধুনিক চলচ্চিত্রে বিরল। ‘গেহরা হুয়া’ গানে ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত গভীর এবং অন্তর্মুখী, যা অরিজিৎ সিং-এর গায়কির সঙ্গে মিলে এক মায়াবী আবেশ তৈরি করে। আবার ‘রান ডাউন দ্য সিটি – মনিকা’ গানটিতে আর ডি বর্মনের ক্লাসিক সুরের আবহে যে আধুনিক লিরিক্যাল টুইস্ট দেওয়া হয়েছে, তা নাগরিক একাকিত্ব এবং গতির দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তোলে। ‘ইজ-ইজ’ বা ‘নাল নাচনা’ গানগুলিতে হিপ-হপ উপাদান থাকলেও সেখানে লিরিক্যাল ফ্লো এবং শব্দের অভ্যন্তরীণ ছন্দ বজায় রাখা হয়েছে। ইরশাদ কামিল এখানে সমকালীন জীবনের জটিলতাকে খুব সাধারণ শব্দের মাধ্যমে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
ফসিল্সের ক্ষেত্রে রূপম ইসলাম বরাবরই তার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্য পরিচিত। ‘ফসিল্স ৭’-এ তিনি আরও বেশি আক্রমণাত্মক এবং একইসঙ্গে দার্শনিক। ‘ক্ষুধার্ত মাংসাশী’ গানটিতে ভাষার ব্যবহার প্রায় নগ্ন সত্যের মতো, যা মানবীয় আদিম প্রবৃত্তি এবং সমাজ-বাস্তবতার মিশেলে তৈরি। ‘অভিনয়’ বা ‘শুনেছি’ গানগুলোতে রূপকের ঘনত্ব এতটাই বেশি যে তা শ্রোতাকে বারবার শুনতে বাধ্য করে। রূপমের গীতিশৈলীতে জীবনানন্দীয় চেতনার সঙ্গে আধুনিক নাগরিক রূঢ়তার এক অদ্ভুত সহাবস্থান লক্ষ করা যায়। তিনি তার গীতিকবিতায় কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা বলেন না, বরং তা হয়ে ওঠে এক সামাজিক দলিল। ‘অপরিবর্তিত’ গানটিতে তিনি সময়ের বিবর্তনে মানুষের চারিত্রিক অনড় অবস্থাকে চমৎকার মেটাফরের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।
৩. সংগীতায়োজন
সংগীতায়োজন হল সেই স্থাপত্য যেখানে সুর তার কাঠামো পায়। ‘দ্য লাইফ অব আ শোগার্ল’ অ্যালবামে ম্যাক্স মার্টিন এবং শেলব্যাকের প্রোডাকশন এক ধরনের সনিক ক্লিনলিনেস নিয়ে এসেছে। জ্যাক অ্যান্টোনফের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব কাটিয়ে সুইফট এখানে আবার সেই পলিশড পপ সাউন্ডে ফিরেছেন। ‘ওপালাইট’ গানটিতে ওমনিচর্ড এবং সিন্থেসাইজারের ব্যবহারের মাধ্যমে একটি ভিন্টেজ সাউন্ডস্কেপ তৈরি করা হয়েছে। কোরাসে বেস গিটারের জোরালো উপস্থিতি গানটিকে এক ধরনের গ্রাউন্ডেড ফিল দেয়। আবার ‘ফাদার ফিগার’ গানটিতে অর্কেস্ট্রাল পপ এবং প্রোগ্রামড স্ট্রিংসের ব্যবহার অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। এখানে নীরবতা বা সাইলেন্সকে অত্যন্ত সুকৌশলে ড্রপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা আধুনিক স্ট্রিমিং এরা-র উপযোগী। অ্যালবামের ট্রানজিশনগুলি অত্যন্ত মসৃণ, যা ট্র্যাকগুলোর মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
শাশ্বত সচদেব ‘ধুরন্ধর’ অ্যালবামে অ্যারেঞ্জমেন্টের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন। তিনি সারেগামা-র ভাণ্ডার থেকে পুরোনো গান স্যাম্পলিং করেছেন এবং সেগুলোকে ইলেকট্রো ও হিপ-হপ বিটের সঙ্গে রি-অ্যারেঞ্জ করেছেন। ‘ইজ-ইজ’ গানটিতে শাশ্বতের দীর্ঘদিনের বন্ধু ইয়ংমিন কিম কোরিয়া থেকে এসে গিটার বাজিয়েছেন, যা গানে এক আন্তর্জাতিক স্পাইন যোগ করেছে। ‘ইশক জলাকার’ গানে সিন্থেটিক এবং অর্গানিক লেয়ারের যে ট্রানজিশন, তা প্রশংসার দাবি রাখে। এখানে ব্রাস সেকশন এবং হর্নের ব্যবহার বলিউডি ড্রামাটার্জিকে এক নতুন সংজ্ঞা দিয়েছে। শাশ্বত সচদেব এখানে সাউন্ডের টেক্সচার বিল্ডিং-এর দিকে বিশেষ নজর দিয়েছেন, যেখানে ভারতীয় তবলার শব্দের সঙ্গে আধুনিক সিন্থ-প্যাড মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
ফসিল্স তাদের সপ্তম অ্যালবামে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হেঁটেছে। তারা কোনো প্রোগ্রামিং বা লুপ ব্যবহার না করে প্রতিটি বাদ্যযন্ত্র লাইভ রেকর্ড করেছে। এই অর্গানিক সাউন্ড তৈরির নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ পাঁচ বছরের কঠোর পরিশ্রম। অ্যালেন তেমজিন অ্যাও-এর লিড গিটারের কাজ এবং তন্ময় দাসের ড্রামিং এই অ্যালবামের মেরুদণ্ড। পম-এর বেস লাইন এবং গিটার লেয়ারিং এতটাই ঘন যে তা থ্রি-ডি সাউন্ডস্কেপ তৈরি করে। ফসিল্স এখানে প্রথাগত রকের সঙ্গে সাইকেডেলিয়া এবং ব্লুজের এক চমৎকার অ্যারেঞ্জমেন্ট উপহার দিয়েছে, যা তাদের শুরুর দিকের অ্যালবামের কথা মনে করিয়ে দেয়। লাইভ বনাম প্রোগ্রামড ব্যালেন্সের ক্ষেত্রে ‘ফসিল্স ৭’ একটি অনন্য উদাহরণ হতে পারে, কারণ এখানে কৃত্রিম শব্দের লেশমাত্র নেই।
সংগীতায়োজনের এই তুলনামূলক আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, আধুনিক পপ প্রোডাকশন যেখানে প্রোগ্রামিংয়ের নিখুঁত রূপ খুঁজছে, শাশ্বত সচদেব সেখানে হাইব্রিড মডেলের মাধ্যমে নতুনত্ব আনছেন। অন্যদিকে ফসিল্স রকের বিশুদ্ধতাকে বজায় রাখতে লাইভ ইনস্ট্রুমেন্টেশনের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছে। এই তিনটি অ্যালবামের অ্যারেঞ্জমেন্ট কৌশল বিশ্লেষণ করলে সংগীতের টেক্সচার এবং লেয়ার ট্রানজিশনের যে আধুনিক রূপটি ফুটে ওঠে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
৪. সাউন্ড ডিজাইন ও প্রোডাকশন
আধুনিক সংগীতের আলোচনায় সাউন্ড ডিজাইন এবং মিক্সিং-এর গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে অ্যাপল মিউজিক এবং স্পটিফাই-এর মতো প্ল্যাটফর্মে সাউন্ডের লাউডনেস পলিটিক্স একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয়। টেলর সুইফটের অ্যালবামে অ্যাপল মিউজিকের স্পেশাল অডিয়োর সার্থক প্রয়োগ দেখা যায়। ‘দ্য ফেট অব ওফেলিয়া’ বা ‘এলিজাবেথ টেলর’-এর মতো গানগুলোতে ভোকালের স্বচ্ছতা এবং রিভার্ব ইকোসিস্টেম অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। প্রোডাকশনে একটি স্টেরিয়ো ইমেজিং লক্ষ করা যায়, যেখানে ড্রামস এবং বেস এক ধরনের ড্রাই পাঞ্চ দেয়, যা আধুনিক লিসনারদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। সুইফটের প্রোডাকশন টিম এখানে লাউডনেস ওয়ার এড়িয়ে বরং ডায়নামিক রেঞ্জের দিকে নজর দিয়েছে, যা বিশেষ করে হাই-ফিডেলিটি সিস্টেমে শোনার সময় অনুভূত হয়।
শাশ্বত সচদেব তার প্রোডাকশনে স্পেশাল ডেপথ তৈরিতে সিদ্ধহস্ত। জাস্টিন জোসের মতো মিক্সার তার অ্যালবামে কাজ করেছেন, যা প্রতিটি লেয়ারকে আলাদাভাবে শোনার সুযোগ করে দেয়। হিপ-হপ ট্র্যাকগুলোতে সাব-বেস আর্কিটেকচার অত্যন্ত শক্তিশালী, যা গ্লোবাল চার্টে গানগুলোকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। সচদেবের সনিক ফিলোসফি হল অডিয়ো ভিজুয়াল সিনার্জি তৈরি করা, যেখানে শব্দ নিজেই একটি দৃশ্যকল্প নির্মাণ করে। তার প্রোডাকশনে স্ট্রিমিং এরা-র মাস্টারিং নন্দনতত্ত্বের পূর্ণ প্রতিফলন রয়েছে, যেখানে লো-এন্ড ফ্রিকোয়েন্সিগুলিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফসিল্সের অ্যালবামে প্রোডাকশন নন্দনতত্ত্ব অনেক বেশি মেদহীন এবং রূঢ়। প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী পম-এর রেকর্ডিং এবং মাস্টারিং-এ এক ধরনের মিড-রেঞ্জ ফ্রিকোয়েন্সির আধিপত্য দেখা যায়, যা রকের সেই হেভিনেস বজায় রাখে। এখানে ডিজিটাল সফ্টনেস বা অটো-টিউনের বাহুল্য নেই, যা সংগীতকে অনেক বেশি মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসে। ‘ফসিল্স ৭’-এর সাউন্ড ডিজাইন মূলত একটি লাইভ কনসার্টের আবহ তৈরি করার চেষ্টা করেছে, যেখানে প্রতিটি গিটারের স্ট্রাম বা ড্রামসের হিট অর্গানিক অনুভূতি দেয়। এখানে স্টেরিয়ো ইমেজিং এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে মনে হয় ব্যান্ডটি শ্রোতার সামনে সরাসরি পারফর্ম করছে।
সাউন্ড ডিজাইনের এই তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, আধুনিক প্রোডাকশন এখন আর কেবল শব্দের পরিচ্ছন্নতার ওপর নির্ভর করে না, বরং তা একটি দার্শনিক অবস্থানও বটে। সুইফট যেখানে পপ লাউডনেসকে একটি শৈল্পিক মাত্রায় উন্নীত করেছেন, সচদেব সেখানে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে গ্লোবাল সাউন্ড ডিজাইন প্রয়োগ করেছেন। আবার ফসিল্স ডিজিটাল যুগের মসৃণতাকে চ্যালেঞ্জ করে একটি রাফ এবং অর্গানিক সনিক সিগনেচার নির্মাণ করেছে। এই তিনটি অ্যালবামের মিক্সিং এবং মাস্টারিং কৌশল বিশ্লেষণ করলে সংগীতের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
৫. সামগ্রিক পাঠ
এই তিনটি অ্যালবামই তাদের নিজ নিজ জনরায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে সক্ষম। টেলর সুইফটের ‘দ্য লাইফ অব আ শোগার্ল’ হয়তো তার কেরিয়ারের সবচেয়ে সাহসী কাজ নয়, কিন্তু এটি তার সৃজনশীল স্থিরতা এবং পপ কালচারের ওপর তার নিরঙ্কুশ আধিপত্যের প্রমাণ। এটি একটি সিস্টার রেকর্ড হিসেবে গণ্য হতে পারে, যা খ্যাতির অন্তরালের আনন্দ এবং যন্ত্রণার এক ঝলক দেখায়। সমালোচকদের মতে এই অ্যালবামটি সুইফটের পূর্ববর্তী কাজের চেয়ে অনেক বেশি আত্মসচেতন এবং থিয়েট্রিক্যাল। এর সাংস্কৃতিক অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়, কারণ এটি একইসঙ্গে নস্টালজিয়া এবং বর্তমান সময়ের পপ সেনসিবিলিটিকে ধারণ করে।
শাশ্বত সচদেবের ‘ধুরন্ধর’ বলিউডি সাউন্ডট্র্যাকের বিবর্তনে একটি টার্নিং পয়েন্ট। শাস্ত্রীয় সংগীতকে হিপ-হপ বা পপের সঙ্গে এমনভাবে মেশানো, যাতে তা নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, এটি একটি বিশাল কৃতিত্ব। এটি প্রমাণ করে যে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীত এখন আর কেবল মেলোডিনির্ভর নয়, বরং তা বিশ্বমানের সনিক ড্রামাটার্জির দাবি রাখে। এই অ্যালবামের লঞ্জিভিটি পটেনশিয়াল অত্যন্ত বেশি, কারণ এর প্রতিটি ট্র্যাকে সংগীতের একটি নতুন ভাষা খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। শাশ্বত সচদেব এখানে অ্যালগরিদমিক কমফোর্ট জোনের বাইরে গিয়ে শৈল্পিক ঝুঁকি নিয়েছেন, যা সফল হয়েছে।
‘ফসিল্স ৭’ কেবল একটি অ্যালবাম নয়, এটি বাংলা রকের অস্তিত্বের লড়াইয়ের এক বিজয়স্তম্ভ। দীর্ঘ পঁচিশ বছরের পথচলায় ফসিল্স নিজেকে বারবার ভেঙেছে এবং গড়েছে। এই অ্যালবামের সাফল্য প্রমাণ করে যে ভাষার বাধা এখন আর সংগীতের প্রসারে অন্তরায় নয়। ফসিল্স দেখিয়ে দিয়েছে যে অর্গানিক সাউন্ড এবং সৎ সংগীতীয় উচ্চারণ আজও ডিজিটাল যুগে সমানভাবে কার্যকর। এটি বাংলা অল্টারনেটিভ রকের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে, যা নতুন প্রজন্মের ব্যান্ডদের অনুপ্রাণিত করবে।
পরিশেষে বলা যায়, এই তিনটি অ্যালবামই সংগীতের তিনটি ভিন্ন মেরুকে প্রতিনিধিত্ব করে। টেলর সুইফট যেখানে গ্লোবাল পপ গ্রামারকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছেন, শাশ্বত সচদেব সেখানে ভারতীয় শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সমকালীন শব্দের সংমিশ্রণ ঘটাচ্ছেন। আবার ফসিল্স রকের বিশুদ্ধতা বজায় রেখে নাগরিক জীবনের মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান তুলে ধরছে। এই তুলনামূলক পাঠ আমাদের সমকালীন সংগীতের বহুমুখী গতিপ্রকৃতি এবং নন্দনতাত্ত্বিক বিবর্তন বুঝতে সাহায্য করে। সংগীতে এই ধরনের স্ট্রাকচারাল অ্যাম্বিশন এবং লিরিক্যাল ডেপথই শেষ পর্যন্ত কালজয়ী হয়ে টিকে থাকে।
সংগীতের এই বিবর্তনীয় যাত্রায় এই তিনটি অ্যালবামই মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত থাকবে, কারণ তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সত্যনিষ্ঠ এবং সৃজনশীলভাবে আপসহীন। টেলর সুইফটের থিয়েট্রিক্যাল পপ, শাশ্বত সচদেবের ইলেকট্রো-ক্লাসিক্যাল ফিউশন এবং ফসিল্সের রূঢ় বাস্তববাদী রক—সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ সালের সংগীতবিশ্ব এক অভূতপূর্ব বৈচিত্র্যের সাক্ষী হয়ে রইল। এই আলোচনাটি প্রমাণ করে যে সংগীত কেবল বিনোদন নয়, বরং তা একটি জটিল শিল্পমাধ্যম, যা ক্রমাগত নিজেকে রূপান্তরিত করে চলেছে।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।


