preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
টোনাল ট্রুথ: পর্ব ১৩
ধারাবাহিক

টোনাল ট্রুথ: পর্ব ১৩

ড্রেকের ‘আইসম্যান’ অ্যালবামকে কেন্দ্র করে অরিজিৎ লাহিড়ীর এই দীর্ঘ প্রবন্ধ কেবল সংগীত-সমালোচনা নয়, বরং উত্তর-পুঁজিবাদী ডিজিটাল সভ্যতার এক শীতল ময়নাতদন্ত। নিওন-আলো, স্ট্রিমিং সংস্কৃতি, স্নায়ুবিজ্ঞান, মার্ক ফিশার ও ইমোশনাল ক্যাপিটালিজমের তত্ত্ব মিলিয়ে লেখক দেখিয়েছেন—কীভাবে আধুনিক মানুষ ধীরে ধীরে অনুভূতিহীন সফটওয়্যারে পরিণত হচ্ছে। ড্রেক এখানে শুধু শিল্পী নন, সমকালীন একাকিত্বের বরফ-আবদ্ধ প্রতীক। প্রকাশিত হল ধারাবাহিক ‘টোনাল ট্রুথ’-এর ত্রয়োদশ পর্ব।

ড্রেকের আইসম্যান এবং নিওন-অরণ্যে সফ্টওয়্যার হয়ে ওঠার আর্তনাদ

রাত ঠিক ২টো বেজে ৪৫ মিনিট। ঘরের কোণের বাতিগুলো নিভে গেছে অনেক আগেই, কেবল জানালার কাচ গলে শহরের কৃত্রিম নিওন আলোর নীলচে বিভ্রান্তিকর আভা এসে পড়ছে মেঝের এককোণে। কানে গোঁজা অ্যাক্টিভ নয়েজ ক্যান্সেলেশন হেডফোনের মৃদু হিসহিস শব্দ চারপাশের নীরবতাকে আরও ঘনীভূত করে তোলে। হাতের স্মার্টফোনের স্ক্রিনে অবিরাম যান্ত্রিক স্ক্রোলিং আমাদের মস্তিস্ককে এক অবশ, ক্লান্তিকর ওভারস্টিম্যুলেশনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে ক্ষণিকের স্বস্তি খুঁজতে খুঁজতে আমরা আমাদের মানবিক অস্তিত্বকেই হারিয়ে ফেলছি। ঠিক এইরকম এক স্নায়বিক ও অস্তিত্ববাদী ক্লান্তির সন্ধিক্ষণে কানাডিয়ান ব়্যাপার ড্রেক-এর নবম একক স্টুডিও অ্যালবাম ‘আইসম্যান’ আমাদের মস্তিস্কের অডিটরি কর্টেক্সে আছড়ে পড়ে এক হিমশীতল পাথরের মতো। ২০২৬ সালের মে মাসের ১৫ তারিখে ওভিও সাউন্ড এবং রিপাবলিক রেকর্ডসের অধীনে মুক্তি পাওয়া এই অ্যালবামটি আসলে এক গভীর নিওন-বিষাদের স্মারক। ড্রেক সোনিক সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে একইসঙ্গে তিনটি অ্যালবাম প্রকাশ করেন—যার অন্যদুটি সংস্করণ আরঅ্যান্ডবি-অনুরণিত ‘হাবিবতি’ এবং ইউকে ড্রিল ও ড্যান্সহল-উপযোগী ‘মেড অব অনার’। সব মিলিয়ে তিয়াল্লিশটি গানের এই সুবিশাল ডিজিটাল মহাপ্লাবন শ্রোতাদের ধারণক্ষমতাকে সম্পূর্ণ অবশ করে দেয়। টরন্টোর সিএন টাওয়ারকে স্টুডিও এএম-এর প্রযুক্তির সাহায্যে অপার্থিব বরফ-নীল আলোয় সাজানো হয়েছিল, যার নিচে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার জেন-জি শ্রোতা মাঝরাতে আতশবাজির উল্লাস দেখছিল। তারও কয়েক সপ্তাহ আগে টরন্টোর প্রাণকেন্দ্রে বসানো হয়েছিল একটি ২৫ ফুট উঁচু আস্ত বরফের ভাস্কর্য, যার ভেতর থেকে কিশকা নামের এক অনলাইন স্ট্রিমার উদ্ধার করে মুক্তির দিনসংবলিত রহস্যময় পাচিও-কুন চরিত্রের পিন-আপ ও ওভিও সাউন্ড ম্যাগাজিন। এই হিমায়িত প্রচারণা আসলে এক গভীর প্রতিরক্ষামূলক নন্দনতত্ত্বের বহিঃপ্রকাশ। ক্যান্ড্রিক ল্যামারের সাথে ধ্বংসাত্মক ব্যক্তিগত সোনিক যুদ্ধের পর ড্রেকের ক্লিষ্ট শিল্পীসত্তা যে গভীর আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল, এই আইসম্যান বা হিমমানব রূপকটি সেই ক্ষতের ওপরেই প্রলেপ দেওয়ার এক মরিয়া চেষ্টা। মার্ভেল কমিকসের চরিত্র ববি ড্রেকের মতোই এই আইসম্যান যেন নিজের আবেগের মুখোমুখি দাঁড়াতে গিয়ে এক চরম সততা প্রকাশ করতে চায়, অথচ তার চারপাশের হিমায়িত দেয়াল তাকে বাইরের পৃথিবীর উষ্ণতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। কিন্তু এই সোনিক বরফ-সাম্রাজ্যের ভেতরে কান পাতলে যে সুরটি শোনা যায়, তা কোনো মহিমান্বিত বিজয়ের সুর নয়; বরং তা এক তীব্র বিষাদ, একাকিত্ব ও আত্মপীড়ন।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

অ্যালবাম কাভারের শিল্পনির্দেশে আমরা দেখি একটি সিকুইনড গ্লাভস পরা হাত, যা পরোক্ষভাবে মাইকেল জ্যাকসনের সোনালি অধ্যায়কে স্মরণ করিয়ে দেয়, অথচ তা ঢাকা পড়েছে এক নীলচে অন্ধকার কুয়াশায়। অন্যদিকে ‘হাবিবতি’ অ্যালবামের কভারে মাস্কিং টেপে মুখ ঢাকা এক নারীর কেবল দুটি চোখ জেগে থাকে এবং ‘মেড অব অনার’ অ্যালবামের কভারে ড্রেকের মায়ের ছবির পেছনে তাঁর বাবা ডেনিসের ছবিকে একীভূত করা হয়েছে। এই ভিজ্যুয়ালগুলো আসলে এক গভীর পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সংকটের জানান দেয়, যা ড্রেকের সোনিক দর্শনে বারবার আবর্তিত হয়।

‘আইসম্যান’ অ্যালবামের সামগ্রিক সাউন্ডস্কেপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর প্রোডাকশন ডিজাইন অত্যন্ত ধূর্ত এবং সুপরিকল্পিত। এখানে বেস ফ্রিকোয়েন্সির ব্যবহার অত্যন্ত নিবিড় এবং অবদমিত, যা মানুষের বুকের পাঁজরে এক মৃদু অথচ অবিরাম কাঁপুনি তৈরি করে। ড্রেকের দীর্ঘদিনের সহযোগী এবং সাউন্ড-ইঞ্জিনিয়ার নোয়া ‘৪০’ শেবিব ব়্যাপ মিউজিকে যে বিখ্যাত ‘আন্ডারওয়াটার টেকনিক’ বা পানির নিচের অবদমিত শব্দনন্দন তৈরি করেছিলেন, তা এই অ্যালবামে এক চরম চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। প্রচলিত মিক্সিং ধারণায় অনেকেই মনে করেন যে এই স্যাঁতসেঁতে, ম্লান অনুভূতিটি তৈরি করা হয় একটি সাধারণ লো-পাস ফ্রিকোয়েন্সি ফিল্টার ব্যবহারের মাধ্যমে। কিন্তু শেবিব নিজেই অতীতে খোলসা করেছিলেন যে তিনি আসলে সিগন্যালের মূল স্যাম্পল রেট ডিগ্রেডেশন বা গুণগত মান কমিয়ে ফেলেন। প্রো টুলস সফটওয়্যারের অ্যাভিড লো-ফাই প্লাগ-ইনের সাহায্যে তিনি স্যাম্পল রেটকে ৪৪.১ কিলোহার্টজ থেকে কমিয়ে সরাসরি ২২.০৫ কিলোহার্টজ বা অনেক সময় ৪৪০০ হার্টজে নামিয়ে আনেন। এর ফলে শব্দের উজ্জ্বল, উচ্চনাদ ফ্রিকোয়েন্সিগুলো সম্পূর্ণ লোপ পায়—সেগুলো স্যাম্পলিংয়ের প্রক্রিয়ায় আর অস্তিত্বশীলই থাকে না। এই প্রক্রিয়ার মূল সোনিক দর্শনটি হল, এটি ফ্রিকোয়েন্সি স্পেকট্রামের ওপরের দিকে এক বিরাট শূন্যতা বা হেডরুম তৈরি করে, যেখানে ড্রেকের নিজস্ব শুষ্ক, নাসিক্য এবং ফ্ল্যাট কণ্ঠস্বরটি কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই রাজত্ব করতে পারে। ড্রামের টেক্সচারগুলো এখানে অত্যন্ত সংকুচিত, ম্লান এবং লো-বিটরেটের, অথচ তার ভেতরের কিকগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী—যা এসএসএল ডেস্ক ইকিউ এবং ওয়েভস রেনেসাঁ বেসের মাধ্যমে এমনভাবে মিক্সিং করা হয়েছে যাতে তা সরাসরি মানুষের কানকে অবশ করে দিতে পারে। পুরো অ্যালবামের মিক্সিং নন্দনটি বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে আধুনিক যুগের ল্যাপটপ, মোবাইল স্ক্রিন ও ডিএসপি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর উপযোগী করে, যা ডায়নামিক রেঞ্জকে অত্যন্ত সংকুচিত করে এক কৃত্রিম লাউডনেস বা সোনিক কম্প্রেশন তৈরি করে। শেবিব মূলত এই অ্যালবামটির মিক্সিং করেছেন ল্যাপটপ এবং ছোটো মোবাইল স্পিকারের কথা মাথায় রেখে, যা ড্রেকের নিজস্ব ইচ্ছা ছিল, কারণ বর্তমান প্রজন্মের শ্রোতারা এভাবেই গান শোনে। এই মিক্সিং প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়েছে এসএসএল ডেস্ক ইকিউ, এসপিএল ট্রানজিয়েন্ট ডিজাইনার, ওয়েভস রেনেসাঁ বেস এবং অ্যাভিড লো-ফাই প্লাগ-ইনের মতো প্রযুক্তি। শেবিবের লো-ফাই স্যাম্পল রেট কমানোর এই প্রযুক্তিটি শব্দের মধ্যে কিছু অদ্ভুত কৃত্রিম প্রতিধ্বনি বা আর্টিফ্যাক্ট তৈরি করে, যা প্রতিটি বিটের খালি জায়গার ভেতরে অনুরণিত হতে থাকে এবং এক ধরনের অস্বস্তিকর অথচ আকর্ষক সোনিক আবহ তৈরি করে।

এই প্রোডাকশন ডিজাইনের বাস্তব রূপায়ণ আমরা দেখতে পাই অ্যালবামের প্রতিটি ট্র্যাকে। ‘মেক দেম ক্রাই’ ট্র্যাকে মনিশের প্রোডাকশনে যে অলস সিন্থের অ্যাম্বিয়েন্স ব্যবহৃত হয়েছে, তা যেন এক স্যাঁতসেঁতে শীতের রাতের মতো ভিজে ওঠে, যেখানে ড্রেকের আবেগ অত্যন্ত ভঙ্গুর ও উন্মুক্ত। অন্যদিকে ‘লিটল বার্ডি’ ট্র্যাকে শেবিবের নিজস্ব জাদুকরী ছোঁয়ায় কণ্ঠের ওপর রিভার্ব এবং স্পেশিয়াল অ্যাম্বিয়েন্স এমনভাবে প্রসেস করা হয়েছে, যেন মনে হয় ড্রেক কোনো বিশাল শূন্য পাতাল ঘরে একা দাঁড়িয়ে নিজের ছায়ার সঙ্গে কথা বলছেন। ‘ব়্যান টু আটলান্টা’ ট্র্যাকে ফিউচার এবং মলি সান্তানার উপস্থিতি অ্যালবামটিতে এক ধরনের ট্র্যাপ এনার্জি নিয়ে আসে, যা আধুনিক নগরজীবনের হাহাকারকে তীব্রতর করে তোলে। ‘হোয়াট ডিড আই মিস?’ নামক লিড সিঙ্গেলে ড্রেক নিজের হারিয়ে যাওয়া সময় ও ফেলে আসা সম্পর্কের হিসাব মেলাতে চান, যেখানে বয়-ওয়ানডা এবং টে কিথের প্রোডাকশন ডিজাইন অত্যন্ত চকচকে অথচ ভেতরে এক গভীর শূন্যতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কন্ডাক্টর উইলিয়ামস-এর প্রযোজনায় অ্যালবামের শেষ গান ‘ফার্ম ফ্রেন্ডস’ এক অনন্য সোনিক বিষাদের জন্ম দেয়, যেখানে বিটের ধীরগতির পুনরাবৃত্তি এবং কন্ডাক্টরের নিজস্ব লুপ ডিজাইন শ্রোতাকে এক অলস মোহে আচ্ছন্ন করে ফেলে। কিন্তু এই সমস্ত গান যেন কোথাও গিয়ে একইরকম শোনায়; ট্র্যাকগুলো একে অপরের সাথে মিশে গিয়ে এক বিশাল ক্লান্তিকর সাউন্ড তৈরি করে, যা গভীর মনোযোগ দাবি করে না, বরং ঘরের কোণে ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড বা হোয়াইট নয়েজ হিসেবে বাজার জন্য বেশি উপযুক্ত।

ড্রেকের এই সোনিক বিবর্তনকে আরও গভীরভাবে বুঝতে হলে আমাদের তার বিগত অ্যালবামগুলোর সঙ্গে আইসম্যান-এর তুলনা করতে হবে। ২০১১ সালের ‘টেক কেয়ার’ অ্যালবামে যে মেলানকলি ছিল, তা ছিল অত্যন্ত জৈবিক, রক্ত-মাংসের এবং মানবিক। সেখানে প্রেমিকাদের কাছে অবাধ্য কান্নাকাটি করা বা নিজের একাকিত্বকে কোমল আরঅ্যান্ডবি সুরের আদরে প্রকাশ করার মাধ্যমে শ্রোতাদের সংবেদনশীল মনকে স্পর্শ করত। ‘হেডলাইন্স’-এর মতো ট্র্যাকে তখন এক ধরনের ক্ষুধার্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং নতুন কিছু অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল। ২০১৩ সালের ‘নাথিং ওয়াজ দ্য সেইম’ অ্যালবামে এসে সেই সুরটি আরও তীক্ষ্ণ এবং আত্মবিশ্বাসী হয়, যেখানে ড্রেকের ব়্যাপের ফ্লো ছিল অত্যন্ত ধারালো ও গতিশীল। কিন্তু ২০১৬ সালের ‘ভিউস’ থেকে এক নতুন ড্রেকের জন্ম হতে শুরু করে—যে ড্রেক ক্রমশ এক কোটিপতি প্যারানয়েড ব্যক্তিতে পরিণত হতে থাকেন, যিনি তাঁর টরন্টোর বিশাল ম্যানশনে বসে কেবল শত্রু আর বিশ্বাসঘাতকদের গণনা করেন। ‘স্করপিয়ন’ এবং ‘ফর অল দ্য ডগস’-এর মতো পরবর্তী বিশাল, স্ফীত অ্যালবামগুলোতে এই প্যারানয়া ক্রমশ এক ক্লান্তিকর ও পুনরাবৃত্তিমূলক ফর্মুলায় পরিণত হয়, যেখানে শৈল্পিক ঝুঁকির চেয়ে স্ট্রিমিং অ্যালগরিদমকে খুশি করার তাগিদই ছিল প্রধান। ‘আইসম্যান’ এই অবক্ষয়ের এক চরম ও হিমশীতল পরিণতি। এখানে ড্রেকের কণ্ঠস্বর আরও বেশি হতাশ, ক্লান্ত এবং তিক্ত। এই অ্যালবামে ড্রেক যে ব়্যাপ করেছেন, তার বিষয়বস্তু কোনো নতুন শৈল্পিক উত্তরণ ঘটায় না, বরং তা অতি-ব্যক্তিগত আক্রোশ ও ক্ষোভের এক বিষাক্ত প্রকাশ।

এই আক্রোশ ও ক্ষোভের চরম প্রকাশ ঘটেছে অ্যালবামের বিভিন্ন ক্রীড়া তারকাদের প্রতি কটাক্ষ ও ব্যক্তিগত শত্রুতায়। যেমন ‘মেক দেম রিমেম্বার’ ট্র্যাকে বা অতীতে ফাঁস হওয়া ‘ওয়ান এএম ইন অলবানি’ ট্র্যাকে ড্রেক এনবিএ তারকা লেব্রন জেমসকে লক্ষ্য করে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন, কারণ লেব্রন ক্যান্ড্রিক ল্যামারের পপ-আউট কনসার্টে ক্যান্ড্রিকের পাশে দাঁড়িয়ে ড্রেকের বিরুদ্ধে নাচছিলেন। এখানে ড্রেক ব়্যাপ করেন যে লেব্রনের পুরো ক্যারিয়ারটাই দল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে এবং তিনি লেব্রনের ২৩ নম্বর জার্সিকে কটাক্ষ করে বলেন যে তাদের ডিএনএ কখনও এক নয়। ‘মেক দেম পে’ ট্র্যাকে এনএফএল কোয়ার্টারব্যাক জ্যালেন হার্টস এবং গিলবার্ট অ্যারেনাসের রেফারেন্স ব্যবহার করে এবং ‘জেনিস এসটিএফইউ’ ট্র্যাকে উইল্ট চেম্বারলেন এবং কাইরি আরভিংয়ের নাম টেনে এনে ড্রেক নিজেকে আবার ক্রীড়া সংস্কৃতির অংশ প্রমাণ করতে চান। ‘ন্যাশনাল ট্রেজারস’ ট্র্যাকে কোবি ব্রায়ান্টের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং নিজের বাবা ডেনিস গ্রাহামের ক্যানসারের সাথে লড়াইয়ের মতো অতি-ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এই অ্যালবামে জায়গা পেলেও ড্রেকের এই সুরের ভেতরের নিঃসঙ্গতা কাটে না। ড্রেক এখানে মূলত এক কোটিপতি ফরচুন ৫০০ কোম্পানির নির্বাহীর মতো শোনায়, যিনি সুরের ব্যাকগ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে নিজের ক্ষমতার বড়াই করছেন, অথচ তাঁর ভেতরে কোনো শৈল্পিক আনন্দ বা গভীরতা অবশিষ্ট নেই। ‘টেক কেয়ার’-এর বিষাদ যেখানে মানুষকে কাছে টানত, ‘আইসম্যান’-এর বিষাদ সেখানে শ্রোতাকে এক বিরক্তিকর ক্লান্তি দেয়, কারণ কোটিপতি ড্রেক এখন সাধারণ মানুষের আবেগ থেকে অনেক দূরে এক সোনার খাঁচায় বন্দি। সমালোচকরা অবশ্য অনেকেই মনে করছেন যে ‘আইসম্যান’ যেখানে কেবলই অভিযোগ এবং আক্রোশের এক দীর্ঘ একঘেয়ে সংলাপ, সেখানে সহচর অ্যালবাম ‘মেড অব অনার’ হয়তো ড্রেকের বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের এক শক্তিশালী প্রকাশ। এই সহযোগী অ্যালবামের ‘হুইচ ওয়ান’ ট্র্যাকে ইউকে ড্রিল তারকা সেন্ট্রাল সি, ‘অ্যামেজিং শেপ’ ট্র্যাকে জ্যামাইকান শিল্পী পপকান এবং ‘হো ফেজ’ ট্র্যাকে দক্ষিণ আফ্রিকান জিকম ও ইডিএম-এর ফিউশন ড্রেকের বৈচিত্র্যময় শৈল্পিক পরিধিকে তুলে ধরে। ক্যান্ড্রিক ল্যামারের আমেরিকার স্বার্থকেন্দ্রিক নিম্বি ঘরানার জাতীয়তাবাদী সঙ্গীত ‘নট লাইক আস’-এর বিপরীতে ড্রেকের এই বিশ্বজনীন সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন এক প্রকার চতুর প্রতিশোধের মতো কাজ করে। মেটাক্রিটিকে অ্যালবামটির ৫৬ গড় স্কোর এবং ক্ল্যাশ ম্যাগাজিনে জো সিম্পসনের দেওয়া ৬ রেটিং আসলে প্রমাণ করে যে এই বিপুল পরিমাণ গানের ভার শ্রোতা ও সমালোচকদের বিভ্রান্ত করেছে।

স্নায়ুবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় কেন ড্রেকের এই রাত-জাগা সংগীত যুবসমাজের একাকিত্ব ও ডিজিটাল ক্লান্তির সঙ্গে এত গভীরভাবে অনুরণিত হয়। গবেষকরা দেখেছেন যে যখন আমরা কোনো মেলানকলিক বা বিষণ্ণ সুর শুনি, তখন আমাদের মস্তিস্কের অডিটরি ও ইমোশনাল কর্টেক্সগুলো অদ্ভুতভাবে সাড়া দেয়। দুঃখের গান শোনার সময় মস্তিস্কের প্রাক-সম্মুখভাগের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এবং অ্যামিগডালা অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। আমাদের মস্তিস্কের স্মৃতি ধারণকারী অংশ হিপোক্যাম্পাস এই সুরের সাথে আমাদের ব্যক্তিগত অতীত ও ফেলে আসা ব্যর্থ সম্পর্কগুলোকে সংযুক্ত করে এক তীব্র নস্টালজিয়ার জন্ম দেয়। এই সময় মস্তিস্কের ভেতরে এক হরমোনাল প্রতিক্রিয়া শুরু হয়; মুক্তি পায় প্রোল্যাকটিন এবং অক্সিটোসিনের মতো হরমোন, যা সাধারণত সামাজিক বন্ধন ও সান্ত্বনা দেওয়ার সময় নিঃসৃত হয়। এই হরমোনগুলো বাস্তব জীবনের কোনো শোকের সময় মস্তিস্ককে শান্ত করার জন্য কাজ করে, যা সংগীতে দুঃখের সুর শোনার সময় এক ধরনের কাল্পনিক বা নান্দনিক সান্ত্বনার জন্ম দেয়।

একইসাথে সক্রিয় হয়ে ওঠে মস্তিস্কের ডোপামিনার্জিক রিওয়ার্ড সিস্টেম, যা ডোপামিন নিঃসৃত করে সুরের রেজোলিউশন বা অপ্রত্যাশিত সুর পরিবর্তনের মুহূর্তে। এই বিলম্বিত পুরস্কারের অনুভূতিটি অত্যন্ত আসক্তিকর। ড্রেকের দীর্ঘায়িত, পুনরাবৃত্তিমূলক অ্যাটমোস্ফিয়ারিক বিটগুলো আমাদের মস্তিস্কের ভবিষ্যদ্‌বাণী ও প্রত্যাশা করার ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

মোটর কর্টেক্স এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এই ধীরগতির ড্রাম প্যাটার্নের সাথে নিজেদের নিউরাল অসিলেশনকে সিনক্রোনাইজ করে নেয়। মস্তিস্কের এন্ডরফিন বা প্রাকৃতিক ব্যথানাশক নিঃসরণ এই দুঃখের সুরকে এক ধরনের নিরাপদ মানসিক অনুশীলনে রূপান্তরিত করে, যা আমাদের অতি-উদ্দীপিত মস্তিস্ককে সাময়িক প্রশান্তি দেয়। রাত দুইটার অন্ধকার ঘরে বসে যখন আমরা হেডফোনে এই ম্লান সুরগুলো শুনি, তখন আমাদের মস্তিস্ক এই নান্দনিক দুঃখকে নিজের দুঃখের উপশম হিসেবে গ্রহণ করে, যদিও ডিজিটাল ইন্টারনেটের অবিরাম তথ্য-বন্যা আমাদের স্নায়ুকে আসলে আরও বেশি অবসাদগ্রস্ত করে তোলে। এই বিষণ্ণ সুরগুলোর গভীরতা মানুষের স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্র বা অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেমকেও প্রভাবিত করে, যা আমাদের হৃৎস্পন্দন এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করে। মস্তিস্কের এই জটিল প্রতিক্রিয়াকে আমরা তুলনা করতে পারি অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার বা ওসিডির মনস্তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্কের সাথে, যেখানে অরবিটোফ্রন্টাল কর্টেক্স বা ওএফসি-এর ত্রুটিপূর্ণ নিউরাল সার্কিটগুলো এক অন্তহীন পুনরাবৃত্তিমূলক লুপে আটকে পড়ে। ড্রেকের পুনরাবৃত্তিমূলক বিটগুলো মানুষের মস্তিস্কের ওএফসি-কে এক ধরনের ওভারড্রাইভে রাখে, যা শ্রোতাকে এক মানসিক লুপে বন্দি করে ফেলে। এই লুপটি মানুষের মস্তিস্কের জটিল জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া যেমন ভবিষ্যদ্‌বাণী ও প্রত্যাশার খেলাকে ব্যাহত করে এক ধরনের আসক্তিকর আরামের জন্ম দেয়।

এই বৈজ্ঞানিক সত্যের বাইরে দাঁড়িয়ে আমাদের আরও বড়ো একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পাঠ নিতে হবে। অব্রে ড্রেক গ্রাহাম কি সত্যিই একজন সার্বভৌম শিল্পী, না কি তিনি কেবলই এক অপ্টিমাইজড অ্যালগরিদমিক ব্র্যান্ড?

লেট-ক্যাপিটালিস্ট সমাজে মানুষের আবেগ এবং দুর্বলতাগুলো আর কোনো ব্যক্তিগত বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সেগুলো এখন অত্যন্ত চতুরতার সাথে বাজারজাত করা কমোডিফাইড অ্যাসথেটিকে রূপান্তরিত হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী ইভা ইলৌজ তাঁর বিখ্যাত তত্ত্বে একে ইমোশনাল ক্যাপিটালিজম বলে চিহ্নিত করেছেন, যা মানুষের গভীর দুঃখ ও মানসিক ট্রমাকেও এক ধরনের লাভজনক পণ্য হিসেবে বিক্রি করতে শেখায়। ড্রেক হলেন এই ট্রমা সিক বা দুঃখবিলাসের প্রধান পুরোহিত। টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের যুগে যেখানে আসল মানসিক যন্ত্রণাকে ফিল্টার করে এক চটকদার ভাইব বা মেজাজে রূপ দেওয়া হয়, সেখানে ড্রেক তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতগুলোকে এক পরম অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করেছেন। ক্যান্ড্রিক ল্যামারের কাছে মরণপণ লড়াইয়ে পরাজিত হওয়ার পর আইসম্যান অ্যালবামটি কোনো প্রকৃত মানসিক পুনর্গঠন বা শুদ্ধিকরণের পথ নয়, বরং এটি নিজের ভাঙা অহংকে টিকিয়ে রাখার এক মরিয়া কর্পোরেট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

অনুমেয় যে, ড্রেকের ইউনিভার্সাল মিউজিক গ্রুপের সাথে চুক্তির ডেলিভারিবলগুলো পূরণ করার তাগিদে এবং স্ট্রিমিং চার্টে নিজের একাধিপত্য বজায় রাখার জন্য এই বিপুল সংখ্যক ট্র্যাকের অ্যালবাম বাজারে ছাড়া হয়েছে।

মার্ক ফিশার তাঁর ক্যাপিটালিস্ট রিয়েলিজম বইতে যেমন দেখিয়েছিলেন যে সমকালীন তরুণরা আর সরাসরি দুঃখ বা বিষণ্ণতায় ভোগে না, বরং তারা ভোগে এক ধরনের ডিপ্রেসিভ আনন্দহীনতায়—যেখানে তারা জগতের সাথে কোনো অর্থপূর্ণ ও আশাবাদী সংযোগের অভাবে কেবল ভোগবাদী পণ্যের অন্তহীন স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয় ক্ষণিকের জন্য বাস্তবতা ভুলে থাকার জন্য। ড্রেকের এই তিন অ্যালবামের মহাপ্লাবন মূলত সেই অবশ আনন্দহীনতার এক সাউন্ডট্র্যাক।

ফিশারের হন্টোলজি বা অতীতের হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যতের ভূত যেভাবে সমকালীন সংস্কৃতিকে তাড়িত করে, ড্রেকের গানগুলোও ঠিক সেভাবেই পুরোনো সুর ও নস্টালজিয়ার পুনঃব্যবহার করে এক নতুন সাউন্ডট্র্যাক তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। আমরা এক অনন্ত স্থবিরতার মধ্যে বাস করছি যেখানে কোনো নতুন ভবিষ্যৎ নেই, আছে কেবল পুরোনো শৈলীর নিষ্ক্রিয় পুনরাবৃত্তি। ফিশারের অসমাপ্ত প্রজেক্ট অ্যাসিড কমিউনিজম যেখানে আমাদের চেতনার পুনরুজ্জীবনের কথা বলেছিল, ড্রেকের অ্যালবাম আমাদের সেই চেতনাকে আরও বেশি ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ড্রেক এখানে এমন এক চরিত্রে পরিণত হয়েছেন, যিনি ট্র্যাজিক হিরো হতে চেয়ে শেষপর্যন্ত এক অ্যালগরিদমের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছেন, যার নিজের কোনো আসল কণ্ঠস্বর নেই, আছে কেবল নিখুঁত সুর ও ব্র্যান্ড মূল্যের এক নিরেট কঙ্কাল।

রাত যখন চারটের দিকে এগোয়, নিওন আলোর শহরটা যখন শেষবারের মতো জ্বলে উঠে নিভে যায়, তখন আইসম্যান অ্যালবামটি আমাদের কানে এক চূড়ান্ত সত্য উচ্চারণ করে দিয়ে যায়। এটি আসলে আমাদের মানুষের শরীর ও মনের ক্রমশ সফটওয়্যার হয়ে ওঠার এক বিষণ্ণ আর্তনাদ। ড্রেকের শত্রু খোঁজার অন্তহীন প্যারানয়া, তাঁর অবিরাম ডেটা ও স্ট্রিমিংয়ের সংখ্যা গোনার পাগলামি আসলে আমাদেরই প্রতিদিনের ডিজিটাল প্যানোপটিকনের খাঁচায় বন্দি থাকার নিদারুণ প্রতিচ্ছবি। ড্রেক তাঁর নিজের হিমায়িত সাম্রাজ্য তৈরি করেছেন বাইরের জগতের তীব্র আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে, কিন্তু সেই বরফের প্রাসাদে তিনি নিজেই এখন একাকিত্বের মরণফাঁদে বন্দি। এই উত্তর-পুঁজিবাদী নরকে, যেখানে আমাদের ব্যক্তিগত ট্রমাও কেবল এক ক্লিক বা স্ট্রিমের মাধ্যমে বিক্রি হওয়া পণ্য, সেখানে ড্রেক হলেন আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে নিখুঁত ও ট্র্যাজিক প্রতিনিধি—যিনি অত্যন্ত বিলাসবহুল, অত্যন্ত সুরময় অথচ হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় সম্পূর্ণ একা দাঁড়িয়ে কেবল নিজের যান্ত্রিক ছায়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। আর আমরা, যারা রাত জেগে হেডফোনে এই হিমায়িত আর্তনাদ শুনছি, আমরাও ক্রমশ সেই অ্যালগরিদমের এক-একটি বোবা কোডে রূপান্তরিত হচ্ছি।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

অরিজিৎ লাহিড়ী জন্মেছেন নদীয়ার কল্যাণীতে (১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১), যেখানে ট্রেন আসে, যায়, এবং মাঝেমাঝে দাঁড়িয়ে থাকে—এক অদ্ভুত চিন্তার মতো। বড়ো হয়েছেন এশিয়ার প্রথম গণগ্রন্থাগারের শহর হুগলির উত্তরপাড়ায়। বাংলা এবং ইংরেজিতে তাঁর লেখা গদ্য, কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হয়েছে নানা ডিজিটাল ও মুদ্রিত পত্রিকায়। তাঁর লেখায় দর্শন থাকে, তত্ত্ব থাকে, আবার থাকে চায়ের কাপের পাশে রাখা বিস্কুটের মতো ভাঙা সংলাপও। কিছু লেখা প্রশ্ন তোলে, কিছু লেখা কেবল চুপ করে বসে থাকে—উত্তর দেওয়ার ভান না করেই।

অন্যান্য লেখা