নজরুলের শ্যামাসংগীত শুধুমাত্র ভক্তিগীতি নয়, এক বিদ্রোহী আত্মার অন্ধকার স্বীকারোক্তি। কালী হয়ে ওঠেন শান্তির দেবী নন, বরং কামনা, ধ্বংস, ভয় ও মুক্তির প্রতীক। এই লেখায় শ্যামাসংগীতকে দেখা হয়েছে অস্তিত্ববাদ, তন্ত্র, আধুনিক নিঃসঙ্গতা এবং মধ্যবিত্ত নৈতিকতার বিরুদ্ধে এক গভীর নান্দনিক বিদ্রোহ হিসেবে। প্রকাশিত হল অরিজিৎ লাহিড়ীর ধারাবাহিক ‘টোনাল ট্রুথ’-এর দ্বাদশ পর্ব।
নজরুলের শ্যামাসংগীত: বিদ্রোহী আত্মার অন্ধকার ডায়েরি
রাতের কলকাতা যখন ক্লান্ত হয়ে ঘুমের অতলে তলিয়ে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে, তখন শহরের কোনো স্যাঁতসেঁতে গলি, কোনো ভাঙা রাজবাড়ির নোনাধরা কার্নিশ, কিংবা কোনো পুরোনো রেডিয়োর কাঁপা স্পিকারের ভিতর থেকে হঠাৎ ভেসে আসে—“কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন।” তখন বোঝা যায়, এই গান কেবল ভক্তির নয়। এই গান এক অস্থির আত্মার। এমন এক আত্মা, যে একইসঙ্গে বিদ্রোহী এবং বিধ্বস্ত, কামনাময় এবং ক্লান্ত, ধ্বংসাত্মক অথচ আশ্রয়প্রার্থী।
কাজী নজরুল ইসলামের শ্যামাসংগীতকে বহুদিন ধরে বাঙালি শুধুমাত্র ভক্তিগীতি হিসেবে চালিয়ে দিতে চেয়েছে। যেন এগুলো কেবল পুজোর মণ্ডপে বাজানো কিছু আবেগময় গান। কিন্তু একটু গভীরে গেলেই বোঝা যায়, নজরুলের কালী মোটেও সেই নিরাপদ গৃহস্থালি দেবী নন, যাঁকে শাঁখা-পলা পরা মধ্যবিত্ত বাঙালি ঘরের মা বানিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে। নজরুলের কালী অনেক বেশি বিপজ্জনক। তিনি অনিদ্রার দেবী। তিনি শরীরী আকাঙ্ক্ষার কালো ছায়া। তিনি এমন এক অন্ধকার, যার দিকে মানুষ তাকাতে ভয় পায়, অথচ গোপনে আকৃষ্টও হয়।
সম্ভবত এই কারণেই নজরুলের শ্যামাসংগীত আজও এত অস্বস্তিকরভাবে প্রাসঙ্গিক।
বাঙালি দীর্ঘদিন ধরে ধর্মকে কমফোর্ট জ়োন বানাতে ভালোবাসে। ঈশ্বর মানে শান্তি, মা মানে আশ্রয়, ভক্তি মানে চোখের জল আর ফুল-বেলপাতা। কিন্তু নজরুল এই পুরো ছবিটাকেই উলটে দেন। তিনি কালীকে শান্তির প্রতীক করেন না। বরং তিনি কালীকে ক্যাওসের দেবী করে তোলেন। তাঁর গানে কালী কখনও “পাগলী মেয়ে এলোকেশী”, কখনও “দিগ্বসনা”, কখনও রণরঙ্গিণী। এই দেবী সভ্যতার শৃঙ্খলা মানেন না। তিনি রাতের শ্মশানে নাচেন। তিনি ধ্বংসের ভিতর আনন্দ খুঁজে পান।
এই জায়গাটাতেই নজরুল ভয়ংকর আধুনিক।
কারণ আধুনিক মানুষ নিজেও ভীষণ বিভক্ত। বাইরে সে সভ্য, কর্পোরেট, সোশ্যাল মিডিয়ায় ওয়েল-অ্যাডজাস্টেড। ভিতরে সে উদ্বিগ্ন, নিঃসঙ্গ, ক্লান্ত, দগ্ধ। নজরুলের শ্যামাসংগীত সেই ভিতরের অন্ধকারকে ভাষা দেয়। তাঁর গান শুনলে মনে হয়, কেউ একজন মানুষের মনের নিষিদ্ধ ঘরে ঢুকে পড়েছে।
এই কারণেই নজরুলের শ্যামাসংগীতকে শুধুমাত্র ধর্মীয় সংগীত হিসেবে পড়লে ভুল হবে। এগুলো আসলে অস্তিত্ববাদী ডায়েরি। বিদ্রোহী আত্মার গোপন স্বীকারোক্তি।
“বিদ্রোহী” কবিতার নজরুল আর শ্যামাসংগীতের নজরুলকে অনেকেই আলাদা মানুষ ভাবতে ভালোবাসেন। যেন একজন রাজনৈতিক বিদ্রোহী, আরেকজন হঠাৎ ভক্ত হয়ে যাওয়া ক্লান্ত কবি। বাস্তবে ঠিক উলটোটা সত্যি। নজরুলের শ্যামাসংগীত তাঁর বিদ্রোহী সত্তারই আরেক রূপ। “বিদ্রোহী”-তে তিনি বাইরের পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। শ্যামাসংগীতে এসে তিনি মানুষের ভিতরের অন্ধকারের সামনে দাঁড়ালেন।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ের সেই দগ্ধ বাস্তবতা, কারাবরণ, দারিদ্র্য, সামাজিক অপমান, ব্যক্তিগত শোক—সব কিছু মিলিয়ে নজরুল বুঝতে শুরু করেছিলেন, মানুষের সবচেয়ে বড়ো যুদ্ধ বাইরে নয়, ভিতরে। সভ্যতা মানুষকে যতটা না শৃঙ্খলিত করে, তার চেয়েও বেশি ভেঙে দেয় তার নিজস্ব ভয়, কামনা আর মৃত্যুচেতনা।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
তাই নজরুলের কালী কোনো মোলায়েম মাতৃত্বের প্রতীক নন। তিনি সেই শক্তি, যিনি ধ্বংসের ভিতর দিয়ে সত্য উন্মোচন করেন।
রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর অনেক সময় ভোরবেলার আলো। সেখানে শান্তি আছে, মরমী প্রশান্তি আছে, উপনিষদীয় সুষমা আছে। নজরুলের কালী রাত তিনটের শ্মশানঘাট। সেখানে ধোঁয়া আছে, রক্ত আছে, উন্মাদনা আছে, শরীর আছে, আতঙ্ক আছে। রবীন্দ্রনাথ মানুষকে ট্রান্সসেন্ড করতে শেখান। নজরুল মানুষকে নিজের আদিম সত্তার সামনে দাঁড় করান।
এই জায়গাটাই তাঁকে এত সমসাময়িক করে তোলে।
কারণ আধুনিক শহুরে মানুষও ক্রমশ নিজের ভিতরের ক্যাওসের কাছে ফিরে যাচ্ছে। ডিপ্রেশন, একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতা—এই শব্দগুলো এখন থেরাপির চেম্বার থেকে বেরিয়ে রিলস আর মিমের ভাষায় ঢুকে গেছে। অথচ বহু আগেই নজরুল এই ভাঙনের সুর শুনেছিলেন।
“শ্যামা নামের লাগল আগুন”—এই লাইনটা শুধুই ভক্তির নয়। এখানে আগুন আছে। দহন আছে। আত্মবিনাশের এক গোপন আকর্ষণ আছে।
বাংলার শাক্ত ঐতিহ্যের ভিতর অবশ্য ভক্তি আর কামনা কখনও পুরোপুরি আলাদা ছিল না। রামপ্রসাদ সেনের গানেও আমরা দেখি, ভক্ত অনেক সময় মায়ের কাছে নালিশ করছে, অভিমান করছে, প্রায় প্রেমিকের মতো কথা বলছে। কিন্তু নজরুল সেই আবেগকে আরও অন্ধকার জায়গায় নিয়ে যান। তাঁর কালী কেবল মা নন; তিনি নারীও। তিনি আকর্ষণীয়। তিনি ভয়াবহ। তিনি এমন এক ডার্ক ফেমিনিন উপস্থিতি, যা মানুষকে একইসঙ্গে টানে এবং আতঙ্কিত করে।
মধ্যবিত্ত বাঙালি বহুদিন ধরে নারীকে নিরাপদ বিভাগে ভাগ করতে ভালোবাসে—মা, স্ত্রী, দেবী। কিন্তু নজরুলের কালী এইসব বিভাগ ভেঙে দেন। তিনি একইসঙ্গে মাতৃময় এবং কামনাময়। এই কারণেই তাঁর গান এত অস্বস্তিকর।
ফ্রয়েড বেঁচে থাকলে হয়তো বলতেন, নজরুলের এই ভক্তির ভিতরে অবদমিত আকাঙ্ক্ষা ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু শুধুমাত্র মনোবিশ্লেষণ দিয়ে বিষয়টা বোঝা যাবে না। কারণ বাংলার তান্ত্রিক ঐতিহ্যে শরীরকে কখনও সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়নি। তন্ত্র জানত, মানুষের মুক্তি শরীরকে ঘৃণা করে নয়, বরং তাকে অতিক্রম করেই সম্ভব।
নজরুল এই ঐতিহ্যকেই আধুনিক ভাষা দিয়েছেন।
তাঁর গানে দেবীর “এলোকেশী” রূপ, “দিগ্বসনা” রূপ, “রণরঙ্গিণী” রূপ—সবই আসলে সভ্যতার পালিশ করা নৈতিকতার বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ। তিনি বুঝেছিলেন, মানুষ যতই সভ্য হোক, ভিতরে সে এখনও আদিম। এখনও সে ধ্বংস দেখতে চায়। এখনও সে অন্ধকারের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
তাই নজরুলের শ্যামাসংগীতে বারবার শ্মশান ফিরে আসে। কারণ শ্মশান হচ্ছে সভ্যতার শেষ সত্য। সেখানে কোনো পদবি নেই, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, কোনো সামাজিক মুখোশ নেই। আছে শুধু দেহের ভঙ্গুরতা।
এবং আশ্চর্যভাবে, নজরুল সেই শ্মশানকেই ভয় পান না। বরং তিনি সেখানে একধরনের মুক্তি খুঁজে পান।
এই জায়গায় এসে তাঁর শ্যামাসংগীত নিছক ধর্মীয় গান থাকে না। এগুলো হয়ে ওঠে “এস্থেটিক্স অফ ডেস্ট্রাকশন”। ধ্বংসের নন্দনতত্ত্ব।
“রূপ দেখে দেয় বুক পেতে শিব যার হাতে মরণ বাঁচন”—এই লাইনের ভিতরে শুধু ভক্তি নেই। এখানে মৃত্যুর প্রতিও এক অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করছে। যেন মানুষ জানে, ধ্বংস ছাড়া পুনর্জন্ম সম্ভব নয়।
সম্ভবত এই কারণেই নজরুলের কালী এত রাজনৈতিকও।
ব্রিটিশ শাসনের সময় কালী অনেক বিপ্লবীর কাছেই ছিলেন প্রতিরোধের প্রতীক। কিন্তু নজরুল তাঁকে আরও ব্যক্তিগত করে তোলেন। তাঁর কালী শুধু সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নন; তিনি মানুষের ভিতরের সমস্ত দাসত্বের বিরুদ্ধে। ভয়, লজ্জা, সামাজিক ভণ্ডামি, অবদমিত বাসনা—সব কিছুর বিরুদ্ধে।
এখানেই নজরুল মধ্যবিত্ত নৈতিকতার সবচেয়ে বড়ো শত্রু হয়ে ওঠেন।
কারণ মধ্যবিত্ত সবসময় শৃঙ্খলা চায়। সে সব কিছুকে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখতে চায়। ধর্মকেও। কিন্তু নজরুল ধর্মকে বিশৃঙ্খলায় ফিরিয়ে দেন। তিনি কালীকে আবার অন্ধকারে নিয়ে যান।
আজকের ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে এই গানগুলো নতুন অর্থ নেয়। এখন ধর্মও অনেক সময় অ্যালগরিদমের পণ্য। ইউটিউব থাম্বনেল, শর্ট ভিডিয়ো, মণ্ডপের সাউন্ড সিস্টেম—সব কিছু মিলে ভক্তিকেও একধরনের কনটেন্ট বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু নজরুলের শ্যামাসংগীত এখনও পুরোপুরি “সেফ” হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ এই গানগুলোর ভিতরে এমন এক কাঁচা মানসিক অন্ধকার আছে, যা সহজে বাজারে প্যাকেটবন্দি করা যায় না।
আজও গভীর রাতে একা বসে “বলো রে জবা বলো” শুনলে মনে হয়, গানটা কোথাও গিয়ে ব্যক্তিগত হয়ে উঠছে। যেন কেউ একজন নিজের ভিতরের ভাঙনের কথা বলছে।
এই জায়গাতেই নজরুল চিরকাল আধুনিক।
কারণ তিনি জানতেন, মানুষ কেবল সুখ চায় না। মানুষ নিজের ধ্বংসের দিকেও তাকাতে চায়। মানুষ ভয় পেতে চায়। মানুষ নিজের ভিতরের নিষিদ্ধ অঞ্চলগুলোকে ছুঁতে চায়।
এবং সম্ভবত এই কারণেই তাঁর কালী এত জীবন্ত।
তিনি মন্দিরের দেবী নন।
তিনি সভ্যতার দুঃস্বপ্ন।
তিনি কামনা আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক কালো আলোকরেখা।
নজরুল সেই আলোর দিকেই তাকিয়েছিলেন।
আর সেই কারণেই তাঁর শ্যামাসংগীত আজও নিছক ভক্তিগীতি নয়। এগুলো এক বিদ্রোহী আত্মার অন্ধকার ডায়েরি।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।