রাধাবল্লভ চক্রবর্ত্তীর দীর্ঘ কবিতা উন্মাদবাহিত এক গভীর আত্মসমীক্ষার যাত্রা। মৃত্যু, উন্মাদনা, প্রেম, রাজনীতি ও ইতিহাসের জটিল অভিঘাতে কবির চেতনায় জন্ম নেয় ভাঙাচোরা কিন্তু তীব্র ভাষা। শ্মশান, স্বপ্ন, স্মৃতি ও বিদ্রোহের ভেতর দিয়ে মানুষ, দেশ ও অস্তিত্বের প্রশ্ন উঠে আসে। শেষপর্যন্ত কবিতা হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার আর্তি ও প্রতিরোধের উন্মত্ত স্বর। কেতাব-ই-র ব্লগজিনের পাতায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে এই ৭০ পর্বের দীর্ঘ কবিতাটি। নবম পর্বে থাকছে আরও সাতটি কবিতা।
৫৮.
এখনই অপ্রস্তুত হয়ে যেয়ো না। মুখাগ্নির
আগে, আছে বহু মন্ত্রোচ্চারণ—যেহেতু, সসম্মানে
সবই নগ্ন হতে চায় অধুনা, অভিশাপ,
গোপন বিরহে, কান্না নয়, হয়েছে নদী:
বিশ্বস্ত, নীরবে চেয়ে-থাকা। কুয়াশার মাঝে
কারা প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছে? কুয়াশার মাঝে কারা
রাজনীতি করে? ইঙ্গিত থেকে এই নির্মাণ
আসে; আর তুমি সদলবলে পদাতিক হয়ে
নয়, একাকী, সেইসব স্বপ্ন লেখো। সেসব
তোমার যন্ত্রণা, কান্না! বিলাস কখনও নয়;
যদি, ভাবে কেউ তা, তবে ভুল—
এমন দৈন্যদশা পরম্পরাও—সবেতেই মুক্তিপণ, কাঁটার
মুকুট দাবি করে সকলেই—দুর্বল প্রবাহের
দোল ওঠে ওই—কিছুই আলাদা নয়। অদ্বিতীয়।
কুয়াশা মাটির খুব কাছে নেমে এসে,
কপালে, ঠোঁটে ও চরণে চুম্বন দিয়েছে।
৫৯.
ভারোত্তোলন নয়; ত্রুটি দিয়ে, তুলমূল্য বিচার
হয় হেথা। পরিমার্জন কিছু হতে পারে;
অধীনতা নিয়ে কোনো পরীক্ষকের, পুনর্মূল্যায়ন
সম্ভব হবে। দ্বেষ নেই, তবু, অপরিমেয়
ব্যবধান। মৈত্রী নেই; মুক্তি নেই; মাত্র
শ্বসন জারি তার! সুখের চন্দন নয়,
জলের তিলক ছিল, আঁকাবাঁকা আয়ুরেখা
সম্বলিত ভাগ্যললাটে—বিবিধ অনুষ্ঠান, একা
হেঁটে যাওয়া; পথপ্রদর্শক কখনও ছিল না।
শালুক ফোটানো সেই দীঘি; শোলোক জোটানো
রমণী; অতীত হয়েছে সবই, হয়তো সময়ে;
অসময়ে আমাদের সমাধি জেগেছে মাত্র...
৬০.
হয়তো পতঙ্গের মতো, পাপের জন্ম আছে,
বৃদ্ধি আছে, এবং আছে, মেটামরফসিস্—
উৎকণ্ঠায় নয়, উত্তেজনার কোনো চিৎকারে নয়,
সহজ কিন্তু সবিশেষ অনাচারে, তাকে
মন্থন করে, সহজে ভাঁড়ারে আনা যায়।
এই বিশ্বাস আর কতদিন থাকে! ভেঙে
যায়। এখন অন্য জঠরের গল্প শোনো:
প্রবেশ অবাধ ছিল, অগাধ সাগরে; প্রবাস
এখনও তবু পরস্ত্রীর দেহ, তাপ। আমরা
কল্পনার জীব; এই আছি, এই নেই—
যেন একটি সর্বনাশের সৌষ্ঠব, শৌকর্যের জন্যই,
বাকি সর্বনাশগুলিকে যমুনার জলে ভাসিয়ে, দূরে,
শুদ্ধ হয়ে থাকা। তোমাকে বাঁচাবে কোন
নতুন দেবতা? তোমাকে পোড়াবে কোন নতুন
আগুন? এখানে এসেই এত দখলদারি শিখেছ?
মাত্রাতীত কোনো উদ্ভিদ, ছায়া, পাপের জন্ম হেসেছ...
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
৬১.
রাত্রি গভীর হলে অপচয় হবে
রাত্রি গভীর হলেক্যাটাক্লিজ়ম
যমের দুয়ারে আমি যাইনি, বরং,
আমার দুয়ারে আজ এসেছেন যম।
যে ছন্দে সাজাবে, সাজাও
শব্দের তরী বেয়ে যাও
দু-চোখ সহজ করে মেলো—চাও
যদি, পিটুনি দিয়ে তুমি ঠিকানা বানাও।
ভুল ছিল যদি কোনো পবিত্র পাপ,
আমিও ভুলে যাই; মনেও রাখিনি—
দূরের প্রতিমা সে—দূরত্ব চায়
সে খুব সরলমতি; প্রণয়ে ডাকিনী...
৬২.
বৃক্ষের ন্যায় অতিশয়, তুমি যে ভিক্ষার
জীবন কাটালে? উঁচু-নিচু, এলোমেলো পথ আর
রঙিন আলোর খেলায় কখন নিঃশব্দে কেটে
গেল সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত তোমার একমাত্র জন্মদিন।
অর্থের নিজস্ব মাত্র আছে, দায় আছে,
সৌন্দর্যও আছে নিজেকে ফুটিয়ে তোলার। অর্থ
হয় তাই—শূন্যের দিকে তাকিয়ে থাকাও
অর্থকরী মনে হয়। একটি পরিবার সমক্ষে
তরুণের দহন বোঝে না; তবু, কী নেশায়
গ্রস্ত হয়ে তারা বাঁচে, বেঁচে থাকতে
জানে। হয়তো অভ্যাস বা হয়তো প্রারব্ধে
লিখিত ভাষ্য বলে মেনে নেয়, নিয়মিত
অর্চনা করে, পাঠ করে। রেকারেন্স বলে
যাকে কথ্যভাষায়—তবে কি সমৃদ্ধ হওয়ারও
আরও প্রমাণ লাগে? তবে কি ঘটিত
ঘটনা ও তথ্যের মাঝে আজও অসংগতি
থেকে গেছে? তবে কি মুখের কথা,
দয়া, পরবশ ও ষড়যন্ত্রের মাঝে, প্রকাশ্যে
বিভাজন করা যায়? গড়ে তোলা যায়?
৬৩.
যেভাবে এখন তুমি সঙ্গোপনে জেগে ওঠো,
একদিন সেভাবে আমিও—সিঁদুরে গোধূলি পেরোনো
সান্ধ্যকালে। পূর্বপীঠিকাগুলি, দূরের অন্ধকারে
ভেসে ওঠে—কুড়িয়ে নিতে নিতে নিস্তেজ
হলে; তৃপ্ত হওয়ার কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই।
খাঁ-খাঁ এই নদীচর হাঁসের খেলায় অতি
জীবন্ত হয়ে যেত যদি, আমাকে আসতে
হত; না, ভাগ্যদোষে সেসবও হয়নি। তবুও
অভিযোগ নেই; মৃত মানুষের মতো শান্ত,
সহজ আর কিছুটা সফলও—ভুলে যেতে
যেতে, তাও ভাবি আমি, বন্ধুপ্রীতির কথা
নয়, বরং তাদের বিরাগভাজন হয়ে ওঠার
নেপথ্যকাহিনি। হয়তো আছে; এখন মনে নেই;
কিংবা, এমনও যদি হয়—হতে পারে—
স্মৃতির তঞ্চকতা, মুখ লুকিয়ে ওই পালানো
মহিলার চাপা-কান্না, আমার সবটুকু ভুলিয়ে
দিয়ে, আমাকে আরও বেশি ভিখিরি করেছে...
৬৪.
‘শৈশবের দিন আর কি রয়েছে?’, বলে
প্রশ্ন করেছি যখন দেবতাকে, কোনো মন্দিরে
নয়, শ্বাসরুদ্ধকর ঘরে, বলেছেন, সংক্ষেপে: ‘নেই’—
অতএব, সময় এসেছে, বাহিনী সাজানোর—তোমার
জন্মভূমি সশস্ত্র হোক—সামরিক হোক—
কার দিব্যবাণী ফলেছে এখন? অঘটন ঘটেছে
সর্বনাশী তোর ঘরে? ত্যাগের বাসনা জেগেছে
এখন; স্থৈর্যের দিকে যায় প্রাবল্য, অনুবর্তিতা।
অনুপ্রবেশ ঘটে কম্পনে, জীবদ্দশায়; তোমার জীবন
সেই, রজ্জুসর্পে বেঁধে রাখা। বিসর্পিণী তুমি
দেখো—ময়ূরের নাচ আর মানুষের হিমদগ্ধ হওয়া!
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।