সত্যজিৎ রায়ের শেষ তিনটি চলচ্চিত্র—গণশত্রু, শাখা-প্রশাখা ও আগন্তুক—কে কেন্দ্র করে অয়ন মুখোপাধ্যায়ের এই প্রবন্ধ নির্মাণ করেছে এক গভীর দার্শনিক পাঠ। যুক্তিবাদ, নৈতিকতা, বিবেক, সভ্যতার মুখোশ এবং মানুষের অন্তর্গত স্বাধীনতার প্রশ্নকে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন মেটাফিজিক্সের আলোয়। অবক্ষয়ের অন্ধকারের মধ্যেও কীভাবে সত্য, সুর ও মানবিকতা পুনরুত্থিত হয়, তারই এক মননশীল অনুসন্ধান এই লেখা—যেখানে সত্যজিতের অন্তিম ট্রিলজি হয়ে ওঠে মানুষের আত্মিক উত্তরণের এক শাশ্বত দলিল।
শেষ ট্রিলজি এবং অন্তিমের মেটাফিজিক্স: অবক্ষয়ের ল্যাবরেটরিতে নৈতিকতার পুনরুত্থান
বৃত্ত সম্পূর্ণ হওয়ার দর্শন
নিশ্চিন্দিপুরের মাটি থেকে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা পালামৌর অরণ্যের ধূসর দর্পণ এবং শুন্ডী-হাল্লার লোকায়ত রূপকের ভেতর দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে এসে থমকে দাঁড়ায় এক চূড়ান্ত ও অন্তিম বিন্দুতে। সত্যজিৎ রায়ের মেটাফিজিক্যাল মহাকাব্যের এই পঞ্চম তথা শেষ ধাপটি হল তাঁর জীবনের শেষ তিনটি ছবি—‘গণশত্রু’, ‘শাখা-প্রশাখা’ এবং ‘আগন্তুক’। চলচ্চিত্র সমালোচকেদের অনেকেই একে প্রায়শই তাঁর ‘ইনডোর ট্রিলজি’ বা ‘চেয়ার ট্রিলজি’ বলে থাকেন, কারণ বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে সত্যজিৎ তখন স্টুডিওর চার দেওয়ালের ভেতর দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু এই বাহ্যিক সীমাবদ্ধতাই তাঁর দর্শনের জন্য হয়ে উঠল এক পরম মেটাফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি। দার্শনিকরা অনেক সময় বলেন “যখন চারপাশের জগৎ ভেঙে পড়ে, তখন মানুষের একমাত্র আশ্রয় তার ভেতরের নৈতিক সততা।” সত্যজিৎ তাঁর এই শেষ পর্বে এসে সমস্তরকম সিনেমাটিক অলংকার, দূরপাল্লার শট বা প্রকৃতির জাদুকরী দৃশ্যকে বর্জন করলেন। তিনি ক্যামেরাকে দাঁড় করালেন মানুষের মুখের ঠিক সামনে, চার দেওয়ালের এক রুদ্ধশ্বাসের ভেতর। যেখানে সমাজ, পরিবার এবং ব্যক্তি সত্তার চরম অবক্ষয়কে ব্যবচ্ছেদ করতে করতে তিনি পৌঁছে গেলেন এক পরম আধ্যাত্মিক ও যুক্তিবাদী উত্তরণের শিখরে।
‘গণশত্রু’: বিশ্বাসের মেটাফিজিক্স ও অন্ধকারের জ্যামিতি
হেনরিক ইবসেনের নাটককে সমকালীন বাংলার প্রেক্ষাপটে এনে সত্যজিৎ যখন ‘গণশত্রু’ তৈরি করলেন, তখন ডঃ অশোক গুপ্তের (সৌমি্ত্র চট্টোপাধ্যায়) লড়াইটি কেবল দূষিত জল আর জন্ডিসের মহামারীর বিরুদ্ধে ছিল না। তা ছিল বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অন্ধ বিশ্বাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা গভীর মেটাফিজিক্যাল সংঘাত।
চরণা মৃতের পবিত্রতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মৃত্যুর জীবাণুকে যখন ডঃ গুপ্ত ল্যাবরেটরির কষ্টিপাথরে প্রমাণ করেন, তখন সমাজ তাকে ঈশ্বরের শত্রু বলে দাগিয়ে দেয়। এখানে সত্যজিৎ দেখান, কীভাবে লৌকিক স্বার্থ এবং ক্ষমতার লোভ মানুষের সাধারণ বিচারবুদ্ধিকে গ্রাস করে এক অতিপ্রাকৃতিক অন্ধকারের জন্ম দিচ্ছে। মন্দিরের ঘণ্টা আর ডঃ গুপ্তের একাকিত্বের মধ্যে সত্যজিৎ এক অদ্ভুত জ্যামিতি তৈরি করেন। কিন্তু এই অন্ধকারের শেষ সীমায় দাঁড়িয়েও ডঃ গুপ্তের পরাজয় ঘটে না। ছবির শেষে যখন তরুণ যুবকেরা তাঁর পাশে এসে দাঁড়ায় এবং স্লোগান তোলে, তখন প্রতিষ্ঠিত হয় যুক্তিবাদের সেই পরম সত্য—যেখানে সত্য একক হতে পারে, কিন্তু তা অবিনশ্বর।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
‘শাখা-প্রশাখা’: সুরের অতীন্দ্রিয় জগত এবং বিবেক-পরাবিদ্যা
আগের পর্বে আমরা এই ছবির নৈতিকতার কথা সংক্ষেপে ছুঁয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু এর মেটাফিজিক্যাল গভীরতা আরও অনেক বেশি নিগূঢ়। আনন্দমোহনের চার ছেলের মধ্যে মেজো ছেলে প্রশান্ত (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) এক দুর্ঘটনার পর থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন। সে সমাজের তথাকথিত ‘সুস্থ’ ভাষা বোঝে না, কিন্তু সে বোঝে জোহান সেবাস্টিয়ান বাখ বা লুডভিগ ভ্যান বেঠোভেনের ধ্রুপদি সুরের ব্যাকরণ। এখানে সত্যজিৎ এক আশ্চর্য বিবেক পরাবিদ্যা’ (Metaphysics of Conscience) তৈরি করেছেন। অন্য তিন ভাই যখন বাবার অসুস্থতার শিয়রে বসে কালো টাকা, দুর্নীতি আর কর্পোরেট শঠতার হিসেব কষছে, তখন প্রশান্ত তার ঘরে বসে বুনছেন সুরের এক অলৌকিক জাল। তাই এই ছবিতে সুর কোনো বিনোদন নয়, বরং সুর হল এখানে জগতের সমস্ত পঙ্কিলতার ঊর্ধ্বে থাকা এক পরম পবিত্রতা। ইমানুয়েল কান্ট যেমন মনে করতেন, মানুষের ভেতরে যেমন একটি ‘Categorical Imperative’ বা সহজাত নৈতিক নিয়ম থাকে, ঠিক তেমনি প্রশান্তর মধ্যেও যেন লুকিয়ে আছে সেই নিয়মের এক অবাস্তব ও সুন্দর প্রতীক। বাবা আনন্দমোহন যখন তাঁর অন্য ছেলেদের দুর্নীতির সত্যটা জানতে পেরে হৃদরোগে আক্রান্ত হন, তখন তিনি সমস্ত জাগতিক যুক্তি ছেড়ে আশ্রয় খোঁজেন সেই ‘পাগল’ ছেলের ঘরে। প্রশান্ত যখন পিয়ানোর চাবিতে আঙুল ছোঁয়ায়, তখন সেই সুর বৃদ্ধের ক্ষতবিক্ষত আত্মাকে এক অতীন্দ্রিয় শান্তি দেয়। সত্যজিৎ প্রমাণ করেন, যে জগৎকে আমরা সুস্থ বা স্বাভাবিক বলি, তা আসলে আত্মিকভাবে মৃত; আর যাকে আমরা উন্মাদ বলি, সেই আসলে সত্যের একমাত্র কাস্টোডিয়ান।
‘আগন্তুক’: সভ্যতার মুখোশ এবং বিশ্ব-নাগরিকের মহাপ্রস্থান
সত্যজিতের সমগ্র সিনেমাটিক ও দার্শনিক জীবনের রাজকীয় সমাপ্তি ঘটে ‘আগন্তুক’ চলচ্চিত্রের মনমোহন মিত্রের (উৎপল দত্ত) চরিত্রের মধ্য দিয়ে। মনমোহন কেবল একজন পরিব্রাজক বা নৃবিজ্ঞানী নন, তিনি হলেন সত্যজিৎ রায়ের নিজের মেটাফিজিক্যাল সত্তার মুখপত্র। ড্রয়িংরুমের সভ্যতায় অভ্যস্ত মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারটির সামনে তিনি যখন এসে দাঁড়ান, তখন তিনি আসলে এক মহাজাগতিক পরিব্রাজকের মতো তাদের ক্ষুদ্রতাকে পরিমাপ করেন। পৃথ্বীশের মতো সন্দেহবাতিক সমাজ যখন তাঁর সম্পত্তির লোভ বা ছদ্মবেশ নিয়ে কদর্য প্রশ্ন তোলে, তখন মনমোহন মিত্রের যুক্তিবাদ এক পরম উপনিষদিক ঔদার্যে রূপ নেয়। তিনি যখন বলেন যে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন বা প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের চেয়ে টাটাদের জামশেদ পুরের খনি অঞ্চলের এক আদিবাসী সাঁওতাল রমণীর সরল নাচ তাঁকে বেশি টালমাটাল করেছে, তখন তা কেবল কোনো রোমান্টিক আদিমতা নয়। তা হল সভ্যতার সমস্ত কৃত্রিম পোশাক খুলে ফেলে জীবনের মূল উৎসে ফিরে যাওয়ার এক অন্তিম মেটাফিজিক্যাল আকুতি। এই ঋজু ও আপসহীন দর্শনের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের অবচেতনে বেজে ওঠে জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার সেই চিরন্তন মরমী উপলব্ধি:
জানি— তবু জানি
নারীর হৃদয়— প্রেম— শিশু— গৃহ– নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—
আরো-এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে
ক্লান্ত— ক্লান্ত করে;
মনমোহন মিত্র সেই বিপন্ন বিস্ময়কে জয় করেছেন। তিনি চেনা সমাজের ক্ষুদ্র মায়া কাটিয়ে আবার যখন ঝোলা কাঁধে অন্তহীন পথের দিকে পা বাড়ান, তখন তিনি আর কোনো সাধারণ মানুষ থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন এক অনন্তের পথিক, যার কোনো দেশ নেই, কোনো সীমানা নেই।
অন্তিমের মেটাফিজিক্স: একাকিত্ব থেকে পূর্ণতার আলোয়
সত্যজিতের এই শেষ ট্রিলজির চূড়ান্ত নির্যাস হল মানুষের সেই একাকিত্ব, যা তাকে নিঃস্ব করে না, বরং এক মহাজাগতিক পূর্ণতা দেয়। অপুর নিশ্চিন্দিপুরের ভাঙা ভিটে থেকে শুরু করে মনমোহন মিত্রের বিশ্ব-ভ্রমণের এই যে বৃত্ত, তা আসলে মানুষের চেতনারই এক সম্পূর্ণ আবর্তন।
এই অন্তিম ধাপে এসে যুক্তিবাদ আর আধ্যাত্মিকতা আর তখন আলাদা থাকে না। যুক্তিই এখানে আধ্যাত্মিক তার রূপ নেয়, যেখানে সত্যে কে সন্ধান করাই মানুষের একমাত্র উপাসনা। সত্যজিতের ক্যামেরা যখন এই শেষ ছবিগুলোতে ক্লোজ-আপ শটে মানুষের চোখের ভেতরের শূন্যতা আর দৃঢ়তাকে ফ্রেমবন্দি করে, তখন তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে—জগতের সমস্ত কোলাহল, ক্ষমতা আর অবক্ষয়ের শেষ উত্তরটি লুকিয়ে আছে মানুষের নিজের বিবেকের মধ্যে।
মহাকাব্যের শেষ লাইন
সুতরাং পথের শেষে এসে একদিন বুঝতে পারি, সত্যজিৎ রায় কেবল একজন গল্পকার বা রূপকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানুষের অস্তিত্বের এক পরম দার্শনিক পরিব্রাজক। মাটির ধুলোবালি থেকে শুরু করে সুরের জ্যামিতি, আর সেখান থেকে শেষ জীবনের চার দেওয়ালের ভেতরের নৈতিক লড়াই—এই সবটাই আসলে এক সুসংহত মেটাফিজিক্যাল যাত্রা। জীবনানন্দ দাশের কবিতার সেই অমোঘ লাইনের সুরেই বলা যায়, সত্যজিতের এই রেখে যাওয়া সৃষ্টি আমাদের চেতনার আকাশে চিরকাল এক ধ্রুবতারার মতো আলো দেবে:
চারিদিকে শান্ত বাতি—ভিজে গন্ধ—মৃদু কলরব;
খেয়া নৌকোগুলো এসে লেগেছে চরের খুব কাছে;
পৃথিবীর এই সব গল্প বেঁচে র’বে চিরকাল;—
ধুলোমাখা মাটির পৃথিবী থেকে শুরু হয়ে মানুষের অন্তরাত্মার এই যে আধ্যাত্মিক ও যুক্তিবাদী উত্তরণ—এটাই হল সত্যজিৎ রায়ের সেলুলয়েডের ফিতের মধ্যে খোদাই করা আমাদের সভ্যতার সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত এবং শাশ্বত ইশতেহার। বৃত্ত সম্পূর্ণ হল, কিন্তু তার দর্শন রয়ে গেল অনন্তের পথে।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।