preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
বিনিসুতোর মালা
প্রবন্ধ

বিনিসুতোর মালা

ভারতীয় ইতিহাসচর্চার দীর্ঘ পরিক্রমা—কলহনের রাজতরঙ্গিনী থেকে কোশাম্বী, শর্মা, থাপার, হাবিব ও বিপান চন্দ্রের দর্শন—এই নিবন্ধে স্পষ্ট হয় ইতিহাসের বহুমাত্রিক পরিসর। ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস এবং সমাজের পারস্পরিক টানাপোড়েন বুঝতে এ লেখা এক অপরিহার্য দিশারি।

বিশ্বব্যাপী ইতিহাস চর্চার একটি ক্রমবর্ধমান শাখা হল ইতিহাস দর্শন। ইতিহাস পাঠের মধ্যে ইতিহাস চর্চা সীমাবদ্ধ থাকে না। ইতিহাসের দর্শন উপলব্ধি না করলে ইতিহাস পাঠই ব্যর্থ হয়। ইতিহাসের পাতায় সন্নিবিষ্ট তথ্যাদি কখনোই উপলব্ধ হয় না যদি-না ইতিহাসের অন্তরস্থ বোধকে উপলব্ধি করা যায়। কারণ কে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসের কোন তথ্য কীভাবে ব্যাখ্যা করছেন তার উপরেই নির্ভর করছে ইতিহাসের অবয়ব। অতএব মূল ইতিহাস পাঠের আগে বুঝতেই হবে ইতিহাসের দর্শনকে। নয়তো ইতিহাস পাঠই ব্যর্থ হবে নিশ্চিত। ভারতে সর্বপ্রথম বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাস রচনা করেন কাশ্মীরের কর্কট রাজ বংশের সভাকবি কলহন। তিনি রচনা করেন রাজতরঙ্গিনী। তিনি সমকালের ঘটনা, ধর্ম, ভূ-প্রকৃতি, প্রশাসনিক ত্রুটি-বিচ্যুতির দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করেছেন। রাজনৈতিক বোধ ছিল তাঁর সম্যক। কিন্ত রাজনীতি তাঁর ইতিহাস রচনাকে প্রভাবিত করেনি। কারণ, কোনো রাজনৈতিক দর্শন তাঁর ইতিহাস রচনার পিছনে সক্রিয় ছিল না। কিন্ত পরবর্তী কালে নির্দিষ্ট কিছু দর্শন, পদ্ধতি, আঙ্গিক, শৈলী ইতিহাস রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। ইতিহাসের দর্শনকে ইংরেজিতে historiography বলা হয়। যার আভিধানিক অর্থ হল the art of writing history. এই তত্ত্বটি বিশ্লেষণ করলে ঐতিহাসিকের মনন, চিন্তাভাবনা, সমকালীন রাজনীতি, সাহিত্য, অর্থনীতি ও সমাজ তাঁর মানসিক গঠনকে তৈরি করে দেয়। সেই মানসিকতাই তাঁকে ইতিহাস রচনায় প্রবৃত্ত করে। এইভাবেই ইতিহাসের নতুন রূপ ও চেহারা তৈরি হয়। রূপান্তর ঘটে ইতিহাসের পাঠ প্রক্রিয়ায়।

দামোদর ধর্মানন্দ কোশাম্বী

কার্ল মার্ক্স-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে-সঙ্গেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। আর অর্থনীতির পরিবর্তনই হল ইতিহাসের প্রধান চালিকাশক্তি। আর এই পরিবর্তন থেকেই ভবিষ্যৎ সামাজিক গঠনের আভাস পাওয়া যায়। যে কয়েকজন ভারতীয় ঐতিহাসিকের ওপর মার্ক্সের এই তত্ত্বের প্রভাব দেখা যায় তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন দামোদর ধর্মানন্দ কোশাম্বী। কোশাম্বী মার্ক্সের চিন্তাধারার আলোকে ভারতীয় ইতিহাসের ব্যাখ্যার সূত্রপাত করেন। বর্তমানে নিম্নবর্গীয় ইতিহাস চর্চার প্রসার ঘটার ফলে মার্ক্সীয় তত্ত্ব প্রাধান্য পেয়েছে। কোশাম্বী প্রচলিত রীতিনীতি অনুসরণ করেননি। তিনি আপাদমস্তক একজন মার্ক্সবাদী ঐতিহাসিক। মার্ক্সের তত্ত্ব অনুযায়ী, উৎপাদন মাধ্যম ও উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে মিথস্ক্রিয়া ( interaction)-র ফলে যখন সামাজিক গঠনের পরিবর্তন ঘটে তখনই নতুন ইতিহাস তৈরি হয়। এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে লিপিবদ্ধ করাই ইতিহাসের কাজ। অন্যভাবে যে ইতিহাস তৈরি হয়, তা হল রোমান্টিক কল্পনাজাত ইতিহাস। তা আদৌ বাস্তবোচিত নয়। মনুষ্যসমাজের অন্তর্নিহিত যে সংস্কৃতি তা শুধু মূল্যবোধ আর ধর্মীয় চেতনার সাহায্যে গড়ে উঠতে পারে না। সে শুধু নামেই ইতিহাস মাত্র।
কোশাম্বীকে ভারতের ইতিহাস চর্চায় মার্ক্সবাদী ধারার জনক বলে অভিহিত করা যায়। তিনি নেহেরুর নীতির সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, নেহরুর নীতি প্রকৃতপক্ষে, সমাজতন্ত্রের আড়ালে পুঁজিবাদকেই উৎসাহিত করে। তিনি চিনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের সমর্থক ছিলেন। কমিউনিস্ট বিরোধী কোনো কোনো চিন্তাবিদ অবশ্য মার্ক্সের মতামতকে উনিশ শতকের এক পুরোনো মতবাদ বলে আখ্যাত করেছেন।
এই ঐতিহাসিক ইতিহাস ছাড়াও আরও অন্যান্য বিষয়ে আগ্রহ দেখান। গণিত, সংখ্যাতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, জেনেটিকস ইত্যাদি নানা বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল। বৌদ্ধ ধর্ম ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহের বিষয়। তবুও তিনি ইতিহাসের উপর চারটি গ্রন্থ ও ষাটটি প্রবন্ধ রচনা করেন। তিনি ইতিহাস রচনায় বস্তুবাদী পদ্ধতিকে অবলম্বন করেন।
কোশাম্বী তাঁর Introduction to the study of Indian history-তে ভারত ইতিহাসের মূল ধারাগুলিকে নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই গ্রন্থে তিনি উৎপাদন ব্যবস্থা এবং তজ্জনিত পরিবর্তনগুলিকে আলোকিত করেছেন। কোশাম্বী ইতিহাস রচনার এই পদ্ধতিকেই প্রকৃত পদ্ধতি বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। কোশাম্বীর মতে, প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে প্রথাগত উপাদানের যথেষ্ট অভাব আছে। তাই প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার কাজ খুব একটা সহজ নয়। কিন্ত কিন্ত প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে এমন কিছু উপাদান আছে যার উপর নিশ্চিত নির্ভর করা যায়। রাজা রাজড়ার নামের চেয়ে, কৃষকের লাঙলের উপর কোশাম্বী নির্ভর করেন বেশি। কারণ উৎপাদন ব্যবস্থার উপর কোশাম্বীর আস্থা বেশি। তাঁর মতে ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনাই উৎপাদন ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। ঐতিহাসিক সুমিত সরকার তাঁর এই গ্রন্থটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, ১৯৫০-এর দশক থেকেই কোশাম্বী অনুসৃত ইতিহাস রচনার পদ্ধতিকেই সমগ্র বিশ্বে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং দেশে-বিদেশে দক্ষিণ এশিয়ার যে ইতিহাস পড়ানো হয় তা কোশাম্বীর সমতুল্য তো বটেই বরং কোশাম্বী অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের চেয়েও সফল। এ এল ব্যশাম কোশাম্বীর এই গ্রন্থটিকে এক যুগান্তকারী সৃষ্টি বলে উল্লেখ করেছেন।
কোশাম্বী মার্ক্সবাদী ঐতিহাসিক হলেও গোঁড়া মার্ক্সবাদী নন। ভারত সম্পর্কে মার্ক্সের সব মতামত কোশাম্বী মেনে নিয়েছেন এরকম কথা বলা যাবে না। তবুও কোশাম্বীর ইতিহাস দর্শন মার্ক্সকেই অনুসরণ করেছে বলতে হবে। মার্ক্সের dialectic materialim ব্যবহার করে কোশাম্বী ইতিহাস পাঠের নতুন ধারার পরিবর্তন করেছেন। 

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

রামশরণ শর্মা

রামশরণ শর্মা অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের ঐতিহাসিক। তাঁর মতে প্রাচীন ভারতের কালানুক্রম গঠন করা খুব সহজ ছিল না। বরং মার্ক্সবাদ প্রয়োগ করলে তা অনেক সহজ হয়।
মার্ক্সের মতে উৎপাদনের স্তরের ব্যবহার করে কাল বিভাজন করলে কাজের অনেক সুবিধা হয়। অতএব ইতিহাস রচনার কাজে মার্ক্সের বস্তুবাদী দর্শনের প্রয়োগ অনিবার্য। শর্মার প্রথম গবেষণা গ্রন্থ Sudras in Ancient India. কারণ শর্মা মনে করেছিলেন বর্ণ প্রথা হল সমাজব্যবস্থাকে বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায়। নিম্নবর্গের মানুষের উপর সবাই সহানুভূতিশীল। উৎপাদন ব্যবস্থার উপর নির্ভর করেই শূদ্রশ্রেণীর উদ্ভব। মনুস্মৃতি অনুসারে শূদ্ররা ক্রীতদাসের পর্যায়ে অবনমিত হয়। ভারতীয় দাসদের শ্রমের ভিত্তিতে উৎপন্ন কৃষি উদ্‌বৃত্ত প্রাচীন ভারতের সমাজ গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। তৈরি হয় বৈশ্য শূদ্র সমাজ। ফলে শূদ্রদের অবস্থার উন্নতি হয়। শূদ্ররা কৃষকের পর্যায়ে উন্নীত হয়। সমাজ ও ধর্মের অধিকারও তারা পায়। শূদ্রদের মধ্যে কারিগর শ্রেণির লোক যথেষ্ট পরিমাণে বর্তমান থাকায় বৈশ্য ও শূদ্রদের মধ্যে প্রভেদ করা যেত না।
১৯৬৬ সালে রামশরণ শর্মা একটি বই প্রকাশ করেন। নাম: ইন্ডিয়ান ফিউডালিজম। এই গ্রন্থে রামশরণ শর্মা বলেছেন, ভারতে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব হয় গুপ্তদের সময় থেকে। কিন্ত ক্রমশ শহরের অবক্ষয় হতে থাকে। গৌতম বুদ্ধের সময় থেকে শহরের ক্রমবিকাশ ঘটতে থাকে। কিন্ত তারপর থেকে শহরের ক্রমবিকাশের দ্রুত অবনতি ঘটে। এই মর্মে তিনি ‘আরবান ডিকে ইন ইন্ডিয়া’ নামে একটি বই লেখেন। এই গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন গুপ্ত যুগ পর্যন্ত নগরোন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলেও গুপ্তোত্তর যুগে শহরগুলি ক্রমশ ধ্বংসের মুখে অগ্রসর হতে থাকে। এর মূল কারণ ছিল ভারতে দূরপাল্লার বাণিজ্যের অবক্ষয়। এর ফলেই সামন্ততন্ত্রের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। গুপ্ত যুগে ভূমিদান প্রথাকেও সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ঘটার একটি কারণ বলে শর্মা মনে করেন। তাঁর মতে নতুন নতুন জনপদ স্থাপনের প্রয়োজনে ভূমিদান প্রথা প্রাধান্য পায়। কোনো কোনো ঐতিহাসিক শর্মার সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশের তত্ত্বকে অস্বীকার করেছেন। অধ্যাপক দীনেশ চন্দ্র সরকার, হরবংশ মুখিয়া ও ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় এঁদের মধ্যে অন্যতম। এঁরা বলেছেন অন্ততপক্ষে ইউরোপে যে ধাঁচে সামন্ততন্ত্র গড়ে উঠেছিল ভারতে সেই ধাঁচে সামন্ততন্ত্র গড়ে ওঠেনি। অতএব শর্মার ভারতে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভবের তত্ত্বটি যে একেবারে বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়, একথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। ঐতিহাসিক শর্মা মেটিরিয়াল কালচার অ্যান্ড সোশ্যাল ফর্মেশন ইন এনশিয়েন্ট ইন্ডিয়া নামামে একটি গ্রন্থ লেখেন। গ্রন্থটি পুরোটাই মার্ক্সের তত্ত্ব অনুসরণ করে লেখা। শর্মা তাঁর আর্লি ইন্ডিয়ান সোসাইটি অ্যান্ড ইকনমি গ্রন্থে আরও অনেক বিচিত্র তথ্যের আলোচনা করেছেন। সতীপ্রথা, নগরোন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়গুলি তার অন্যতম। ঐতিহাসিক শর্মার দুই ছাত্র ডি এন ঝা, বি এন এস যাদব শর্মার মার্ক্সীয় পথে গবেষণার তত্ত্বটিকে পুরোপুরিই অনুসরণ করেছেন।

রোমিলা থাপার

প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যে রোমিলা থাপার অন্যতম নাম। থাপারের গবেষণার কাজ শুরু হয় মৌর্য সম্রাট অশোককে কেন্দ্র করে। থাপার তাঁর ‘অশোক অ্যান্ড দ্য ডিক্লাইন অব দ্য মৌর্যস’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন কলিঙ্গ যুদ্ধের পর অশোকের জীবনে যে মৌলিক পরিবর্তন এসেছিল, তা নাটকীয়ভাবে আসেনি। তৎকালীন ভারতের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনই এর জন্য দায়ী ছিল। এই মতবাদের পক্ষে যাঁরা সমর্থন জুগিয়েছেন তাঁদের অন্যতম ছিলেন কোশাম্বী। কোশাম্বী স্বীকার করেছেন যে কলিঙ্গ যুদ্ধের পর এই মূলগত পরিবর্তনের জন্য দায়ী ছিল সমকালীন আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন। থাপার বলেছেন এই ধর্মীয় আদর্শের জন্ম হয়েছিল অশোকের মনে। সমকালের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি ছিল যথেষ্ট জটিল। এই জটিল অবস্থার অবসান ঘটানো জন্যই সৃষ্টি হয়েছিল ‘ধম্ম’ নামে নতুন ধর্মাদর্শের। মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের একটি অন্য একটি চিত্র অঙ্কন করেছেন অধ্যাপিকা থাপার। তিনি মৌর্যদের পতনের জন্য সাম্রাজ্যের প্রকৃতিগত ত্রুটির প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কুড়ির দশকের দ্বিতীয়ার্ধে বিশেষত ষাটের দশকে ঐতিহাসিকদের একটি গোষ্ঠী মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের জন্য অর্থনৈতিক সংকটকে দায়ী করে থাকেন। তাঁরা বলেন, সামগ্রিকভাবে মৌর্য সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা সচ্ছল হলেও শেষের দিকে মৌর্য অর্থনীতি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সময়ে রুপোর মুদ্রায় খাদ দেওয়া শুরু হলে মৌর্য অর্থনীতির সংকটের চেহারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
History of India গ্রন্থে থাপার ভারতের ইতিহাসের সরলীকৃত ব্যখ্যা দিয়েছেন। কিন্ত তাঁর বক্তব্য সরলীকৃত হলেও এতে থাপারের রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়। থাপার রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসকে যুক্ত করেছেন। থাপারের মতে, এর ফলশ্রুতিতে পাওয়া যায় জনগণের সংস্কৃতির ইতিহাস। সংস্কৃতির ইতিহাসের মধ্যে তিনি অন্তর্ভুক্ত করেছেন অর্থনীতি, ধর্ম, সাহিত্য, ও শিল্পকে। কৃষি, শিল্প, গ্রামীণ ও নগর জীবন এবং দূরপাল্লার বাণিজ্য ও সামুদ্রিক কার্যক্রমকে তিনি এই ইতিহাসে প্রাধান্য দিয়েছেন। থাপার এই গ্রন্থে কার্ল মার্ক্সের ভারতীয় ইতিহাসের ব্যাখ্যারও সমালোচনা করেছেন। থাপার বলেছেন মার্ক্স যেমনভাবে ভারতীয় ধনতন্ত্রের উদ্ভবের ব্যাখ্যা দিয়েছেন সেই ব্যাখ্যা ঠিক নয়। ভারতে ইউরোপের কায়দায় ধনতন্ত্র গড়ে ওঠেনি। এর ফলে মার্ক্সের কলমে ভারতীয় ধনতন্ত্রের ব্যাখ্যা একপেশে হয়ে দাঁড়িয়েছে।
থাপার প্রাচীন ভারতের পুরোনো ব্যাখ্যারও সমালোচনা করেছেন। বিদেশের ঐতিহাসিকরা যেখানে ইতিহাসে গতিশীলতার অভাব লক্ষ করেছেন থাপার তার প্রতিবাদ করেছেন। থাপার পদে পদে প্রাচীন ইতিহাসে গতিশীলতার প্রমাণ দিয়েছেন। থাপার প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রটিকে পুনর্বিন্যস্ত করার কথা বলেছেন। তিনি প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যার নিন্দা করেছেন। মার্ক্সের ভারতীয় উৎপাদনের ধারণাকে নস্যাৎ করে দিয়েছেন।

ইরফান হাবিব

ভারতের আর এক মার্ক্সবাদী ঐতিহাসিক হলেন ইরফান হাবিব। মধ্য যুগের ভারত ইতিহাসের এক শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক মহম্মদ হাবিবের পুত্র ইরফান স্বল্প বয়সেই মার্ক্সবাদে দীক্ষা নেন। তিনি প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করলেও তাঁর গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মার্ক্সবাদ। হাবিব ইতিহাস রচনার কতকগুলি প্রধান বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন ইতিহাস একবারই রচনা করা যায়। বারবার তার পুনর্নির্মাণ করা যায় না। প্রদত্ত উপাদানের উপর ভিত্তি করে বরং তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। ঐতিহাসিক সমকালের সামাজিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে তাঁর বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে অতীত ইতিহাসের উপর আলোকপাত করেন।
ইন্টারপ্রেটিং ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি গ্রন্থে হাবিব দেখিয়েছেন যে শ্রমের সরবরাহ হত দিনমজুর, দাস ও ক্রীতদাসের মাধ্যমে। উৎপাদনের উদ্‌বৃত্ত আহরণ করা হত খাজন,, রাজস্ব আর লভ্যাংশের মাধ্যমে এবং এর জন্য একরকম নেটওয়ার্ক বা পদ্ধতি গড়ে তোলা হয়েছিল। অধ্যাপক হাবিব ‘কাস্ট অ্যান্ড মানি ইন ইন্ডিয়ান হিস্টরি’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। কারণ হাবিব লক্ষ করেছিলেন যে ভারতে বহুদিন পর্যন্ত জাতি প্রথা এক বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি হিসেবে কাজ করে এসেছে। প্রথমে শ্রম বিভাজনের প্রয়োজনে যে জাতিপ্রথার উদ্ভব হয়েছিল পরে তা উৎপাদনের প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। হাবিবের ‘দ্য আগ্রারিয়ান সিস্টেম অব মুঘল ইন্ডিয়া’ গ্রন্থের মূল বিষয়বস্তুই ছিল মোগল আমলের কৃষি সংকট। তিনি দেখিয়েছেন যে এই কৃষি সংকট ও তজ্জনিত কৃষক বিদ্রোহই ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ। হাবিব ভারতের অর্থনৈতিক মানচিত্র বিষয়ে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে ভারতের অর্থনৈতিক উপাদানগুলির প্রাপ্তিস্থান সম্পর্কে এক বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। এ ছাড়াও কেম্ব্রিজ ইকনমিক হিস্ট্রি-র প্রথম খণ্ডে তিনি অর্থনীতি বিষয়ে সাতটি মূল্যবান প্রবন্ধ রচনা করেন।
তিনি তাঁর গবেষণায় মার্ক্সের চিন্তাধারাকে আত্মস্থ করলেও মার্ক্সের দর্শন তাঁর মস্তিষ্ককে কখনোই গ্রাস করেনি। ইতিহাসের উপরে অর্থনীতির অমোঘ প্রভাব ও আনুষঙ্গিক কার্যকারিতাকে তিনি অস্বীকার করেননি। মহম্মদ হাবিবের ইতিহাস দর্শন সম্পর্কে মতান্তর থাকলেও তিনি ছিলেন ভারতের, বিশেষত মধ্যযুগের ভারতের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক। 

বিপান চন্দ্র

বিপান চন্দ্র মার্ক্সবাদী হলেও জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক। তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তুই ছিল অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ। তিনি মার্ক্সবাদের মূল তত্ত্বে আস্থা স্থাপন করলেও মানুষের সমান্তরাল চিন্তাধারাকেও উপযুক্ত মর্যাদা দিয়েছেন। ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে অর্থনীতির মূল সূত্রগুলি কতটা কার্যকরী ছিল ড. চন্দ্র তা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন। তিনি মোট যে পাঁচটি গ্রন্থ লিখেছেন তার মধ্যে দুটি গ্রন্থই ভারতের ইতিহাস ও অর্থনীতির পারস্পরিক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে। তাঁর গবেষণার শীর্ষ নামটি ছিল ‘The Rise and growth of economic nationalism’ ভারতে স্বদেশি আন্দোলনের সময় থেকে অর্থনীতির প্রশ্নগুলি নেতাদের সামনে আসে। তাঁরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে ভারতের দারিদ্র্যের মূল কারণ ছিল ঔপনিবেশিক অর্থনীতি। কিন্ত এই চিন্তার সূত্রগুলি সংগঠিত অবস্থায় ছিল না। বিভিন্ন সংবাদপত্র, সাহিত্য, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র ও বক্তৃতায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। কিন্ত ড. চন্দ্র এগুলিকে একত্রিত করেন। তবে তিনি লক্ষ করেছেন, এই চিন্তার মূল ভিত্তি ছিল সমাজতন্ত্র নয়, পুঁজিবাদ। আমাদের জাতীয় নেতৃত্ব পুঁজিবাদকেই উন্নতির একমাত্র রাস্তা বলে মনে করেছেন। তাঁরা জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পুঁজিবাদকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁরা যে পুঁজিবাদকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তা দেশি পুঁজিবাদ, বিদেশি পুঁজির দাসত্ব তাঁরা করেননি। ইংরেজ ঐতিহাসিকরা ভারতের ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁরা বলেছেন, ভারতের আন্দোলন আসলে ক্ষমতা দখলের আন্দোলন। এর পিছনে জাতীয় কোনো স্বার্থ ছিল না। কিন্ত বিপান চন্দ্র দেখিয়েছেন, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নেতৃত্বে সাধারণ মানুষের আন্দোলন। কিন্ত ঐতিহাসিকদের আর একটি গোষ্ঠী বিপান চন্দ্রের এই ব্যাখ্যা অস্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেছেন, ড. চন্দ্রের ব্যাখ্যায় কোথাও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের উল্লেখ নেই। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি জাতীয়তাবাদকেই মূল সূত্র হিসেবে ধরেছেন। মার্ক্সবাদী ঐতিহাসিক রজনী পাম দত্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ‘বুর্জোয়া বিপ্লব’ আখ্যা দিয়েছেন। বিপান চন্দ্রের কলমে ভারতের সাম্প্রদায়িকতা অন্যভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে। তিনি বলেছেন, ভারতের সাম্প্রদায়িকতার বিস্তারে ইংরেজদের ভূমিকা ছিল ঠিকই, কিন্ত সমাজের সাধারণ মানুষ নিজেদের অর্থনৈতিক দুরবস্থার দরুন পারস্পরিক বিভাজন তৈরি করেছিল, যার ফলে সৃষ্ট হয়েছিল দ্বন্দ্ব ,সম্প্রদায় গত বিভেদ। অতএব এই বিরোধকে প্রতিরোধ করা ছিল জরুরি কর্তব্য। স্বাধীনোত্তর ভারতের কথা আলোচনা করতে গিয়ে তিনি ১৯৬৪ সালকে সীমারেখা ধরেছেন। অর্থাৎ জওহরলাল নেহরুর প্রধানমন্ত্রীত্বকাল পর্যন্ত। এই সময়সীমায় ভারতের যাবতীয় সমস্যার কথা তাঁর আলোচনায় এসেছে।
গত প্রায় এক যুগ ধরে এরকম অজস্র ঐতিহাসিকের রচনা আমাদের ভারত ইতিহাস চর্চার ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে। সেই কলহনের সময় থেকে শুরু করে ইদানিংকালের মার্ক্সবাদী ও সাব অল্টার্ন ইতিহাসের দার্শনিকরা পর্যন্ত নতুন নতুন দৃষ্টিকোণের অবতারণা করেছেন। তবে এ কথাও অনস্বীকার্য যে ভারতীয় ঐতিহাসিকরা যে ভারতে ইতিহাস চর্চার নতুন এক ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
বিদেশের ঐতিহাসিকরা ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে মোহমুক্তির কথা বলেছেন এবং সমকালীন তথ্য নিখুঁত ভাবে ব্যবহার করার উপর জোর দিয়েছেন। এ হল জার্মান ইতিহাসবিদ ব়্যাঙ্কের কথা। তাঁর এই বিশ্লেষণ সর্বতোভাবে মানা যায় না। কারণ ইতিহাস পুরোপুরি subjecive হতে পারে না। ইতিহাস লিখতে হলে ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনার প্রতিফলন ঘটবেই। পৃথিবীর প্রত্যেক ঘটমান ঘটনারই ইতিহাস আছে। নারীর ক্ষমতায়নের ইতিহাস যেমন আছে, তেমনই আছে শ্রমজীবী আন্দোলনের ইতিহাস। সাহিত্য, ভাষা, বৌদ্ধিক চর্চা, সমাজতত্ত্ব, শিল্প সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, ধর্ম সবেরই ইতিহাস আছে। অতএব ইতিহাস চর্চার শেষ কথা বলে কিছু নেই।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

জন্ম ৫ আগস্ট, ১৯৫০। শিক্ষকতা জীবন দীর্ঘ চার দশকের। তার মধ্যে পনেরো বছর কলকাতার হিন্দু স্কুলে। ৮০-৯০ দশকের স্কুল ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল শীর্ষে। শিক্ষকতা জীবনে তিনি স্কুল পাঠ্য বই অনেক লিখেছেন। পরিণত বয়সে তিনি বিদ্যাসাগর চর্চায় মন দিলেন। প্রকাশিত হল ‘বিষয়: বর্ণপরিচয়’। ‘তথ্যসূত্র’, ‘কৃত্তিবাস’ প্রভৃতি পত্রিকার লেখার সুবাদে তাঁর নাম ইতিমধ্যেই পাঠক মহলে সুপরিচিত।

অন্যান্য লেখা