preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
দোসর
গল্প

দোসর

এই মাস থেকে কেতাব-ই ব্লগজিনে শুরু হল ‘জেলার সাহিত‍্য’ নামের এক বিশেষ আয়োজন। যার মূল উদ্দেশ্য পাঠককে বিভিন্ন জেলার নতুন ও পুরনো লেখকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন জেলার ভিন্ন স্বরকে একত্রিত করে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক রূপনির্মাণ। আমাদের প্রথম নির্বাচিত জেলাগুলি হল দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, এবং কোচবিহার। গোটা এপ্রিল মাস জুড়ে আমরা প্রকাশ করব এই পাঁচ জেলার সাহিত্য। আজ প্রকাশিত হল জলপাইগুড়ি জেলার গদ্যকার জয়শীলা গুহ বাগচী-এর গল্প।

—বাক্যতত্ত্ব কাকে বলে জানিস? কীভাবে কথা বললে সেটা সঠিক হয়? কোথায় ক্রিয়া বসাবি কোথায় কতটা বিশেষণ দিবি সেটা বুঝতে হবে। বাক্য বলে গেলেই হয় না, সেটা সুন্দর করে বলতে হবে। কী বলবি সেটা ভেবে নিবি। তারপর পড়াশোনা করবি। তথ্য নিবি তথ্য। তথ্য ছাড়া তোর কথা কেউ শুনবে না। শুধু তথ্য দিলেও কেউ শুনবে না। ওকি অমন মুখ করেছিস কেন? আর্ট বুঝিস? কবিতা পড়। একটা ঠিকঠাক শব্দ কত কী বলে দিতে পারে। শিখে নে। আচ্ছা থাক আবার পরে বলব। যা এখন। আমি বের হব। মিটিং আছে। আজ আমি যখন শুরু করব বলতে মিটিঙের ভরকেন্দ্রটা ওইখানেই থাকবে। প্রথমে সমালোচনা করব নিজেদের নীতির, বুঝলি। এমন বলব যে সবার মাথা গরম হয়ে উঠবে। যত মহানই হোক নিজেদের নিন্দা কেউ সহ্য করতে পারে না বুঝলি। আমার কথা শুনতেই হবে। তারপর যাব পরিস্থিতি বিশ্লেষণে। আসি রে।

এসবের উত্তরে কী বলতে হয় জানি না সঠিক—ওকে দেখি, ওকে শুনি। ওর কথার স্রোত আমার ভেতরে যে বিদ্যুতের জন্ম দেয় তা তো বলতে পারিনি ওকে। আর বললেই বা শুনবে কে? ওর কাছে আমার অস্তিত্বের কোনো গন্ধই পৌঁছয় না। ‘ও’ তো নিজের গন্ধেই মাতোয়ারা। খুব তাড়াতাড়ি ও যে কারও ভেতর ঢুকে যেতে পারে। বিশেষ করে এই আমার মতো অল্প আলো, নিছক খিদে তেষ্টার মিল-অমিলটুকুই যেখানে আমিত্ব বহন করে সেখানে ও ঢুকে পড়ে তিরের ফলার মতো। তাতে কী হয়, গায়ে অঝোর বৃষ্টি পড়তে থাকলে যেমন আমিহারা হয় সবাই, ঠিক তেমন প্রত্যেক স্নায়ুর ভেতর ও এসে ঘনিয়ে তোলে এক-একটা গল্পের স্তর, সেখানে আমি নেই, সেখানে এত এত কথা, ওর বলা বিচিত্র সব থিয়োরি, ওর ফেলে যাওয়া উঠোনে ওর শ্বাসপ্রশ্বাসের পরিচয়… এইসবই থাকে। আমি কী করি তখন? এতদিনের ধারণার চাদরগুলো একটা একটা করে তুলতে থাকি, কয়েকগাছা কচিকাঁচা বালিকাস্বপ্ন, একটা বালিকা- গাছের ঝোপ, যার সারাগায়ে বেগুনিরঙা ফুল আর জোনাকির মেলা, একটা জলভরা মাঠে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকা চিকমিকে আলো এইসব অর্ধশিক্ষিত ফাঁকফোকরে তুমিরং এসে লাগে। কিন্তু সত্যিটা হল আমার মাথার ওপর যে কাচের ছাদ তা আমি ভাঙতে পারিনি কখনও। আমার এই সজনে ফুলের প্যানপেনে চরিত্র ওর দু-চোখের বিষ। হোক বিষ, আমি যেমন আমি তেমনই। বুনো ফুল বুনো ফুলের মতোই ফোটে। কে দেখল কে দেখল না তাতে কী যায় আসে। তার বেশি আমি হতেও চাই না। এই যে এইটুকু ভাবতে পারছি আমি, এইই বা কম কী? ও কথা বলে, কিন্তু আমিও আমার মতো করে ভাবতে পারি। সেদিন দোকানে শ্যাওলাসবুজ রঙের একটা শাড়ি দেখেছিলাম। কী সুন্দর রং। আমাকে মানাত কিন্তু। কানের পাশে ঝুলে পড়ত নাম-না-জানা কোনো অচেনা ফুলের গুচ্ছ। হালকা বুনো গন্ধ। তোমার কী খারাপ লাগত? একবারও তাকাতে না বুঝি? মাধবীলতার একটা পাপড়ি টিপের মতো পরতাম দুই ভ্রূর মাঝে। তারপর যেতাম তোমার বক্তৃতা শুনতে। তুমি স্ট্রিটকর্নারে বক্তব্য রাখছ, সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছে। শুধু তো রাজনীতির কথা নয়, তুমি বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে কোথায় যে মানুষকে ঘুরিয়ে মারো... কথা শেষ হলে ক্লান্ত অথচ আনন্দিত মনে ভাবতাম, একটা ছোট্ট পানসি নিয়ে সারা পৃথিবীর এ বন্দর সে বন্দর ঘুরে এসেছি। তারপর কলকলিয়ে কথা বলতে বলতে বাড়ি ফেরা। এইতো এইটুকুই...

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

—আর কীভাবে বলব বল? মানুষ হল কথার দাস। হাঁ করে শুনতে সে খুব ভালোবাসে। কিছু থাক বা না-থাক অনর্গল বলতে পারা চাই। চন্ডীতলা বুড়োশিবতলা আমাদের রক্তে আছে বুঝলি তো। মোদ্দা কথা হল মানুষের হাতে অনেক সময় আছে নষ্ট করার মতো। সেইটাই হল আমার পুঁজি। ওদের সেই নষ্ট সময়কে তুই নিজের কবজায় আন, আর বলে যা যেমন খুশি। ওরা যত শুনবে তত তোর টিআরপি বাড়বে। আর ওদের সময়টা তোর ঝুলিতে চলে আসবে। তবে আমি যেমন খুশি বলি না। পড়তে হয় বুঝলি। তারপর ভাবতে হয়। তবে হ্যাঁ, শুধু মুড়ির চেয়ে ঝালমুড়ি যেমন আলাদা, কথাও কিন্তু তেমনি হওয়া চাই। আরে কখনও তো পোলকা গানে ব়্যাপ দিবি... ওহ্! তোর তো আবার নীরবতাই কথা।

শুধু কী নীরবতা? নীরবতার মাঝে কথা আছে তো। তুমি দেখতে পাও না। তোমার তো মাইক্রোফোন। আমার ভালো লাগে জানো। খুব ভালো লাগে। ওই আত্মবিশ্বাস, যেন ভিড়ের ভেতর ছুটে চলা ঘোড়ার গাড়ি। আমি ঘোড়ার গাড়ি দেখিনি, ওইরকমই হবে। ওই যে সেদিন হিটলারকে এনে ফেললে তার পেছনে পেছনে আর্যতত্ত্ব তো বলোনি, বললে চার্বাকের কথা। অতশত কেউ বুঝেছে কি না জানি না। আমার দারুণ লেগেছিল। তুমি আমাকে দেখতে পাওনি বোধহয়, আমি ছিলাম তো। আসলে আমি তখন ভাবছিলাম এই যে একটা নতুন কিছু তুমি বলার চেষ্টা করলে এটা আমি অন্যদের কাছে বিশ্লেষণ করব কী করে...। যাইহোক, সেদিন আমি কী রঙের শাড়ি পরেছিলাম জানো? নীল আর ছেয়ে মেশালে যে রংটা হয়... তুমি তো জানোই আমি মেঘ দেখতে ভালোবাসি। কী মনে হয়েছিল বলো তো... ওই কবিতাটা আছে না... “ঘাট ছেড়ে ঘট কোথা ভেসে যায়, মধুমালতীর কচি দলগুলি আনমনে কাটে দশনে, গুরু গুরু মেঘ গুমরি গুমরি গরজে গগনে গগনে”। এসব ভাবতে ভাবতে আমি দেখছিলাম ওই নীল ছেয়ে রঙের শাড়িটা ঠিক আমার হয়ে উঠছে না। সে-মুহূর্তে মনে হল শাড়িটা সহেলীদির। ওই রংটা আমার নয়। ওর কোনোকিছু আমার হতে পারে না। খুব বিরক্ত লাগছিল জানো। সবাইকে আমার ভেতর মানে আমার চিন্তার ভেতর আমি নিতে পারি না। কেমন একটা চিটচিটে রাগ ছড়িয়ে যেতে লাগল। আমি বাড়ি ফিরে ভাবলাম তোমার কথাগুলো। মোবাইলের ভিডিয়োটা অন করে তোমার মতো করে বলতে শুরু করলাম। যদিও কোনো কনফিডেন্স নেই বুঝলে। তবু কেমন জেদ চেপে যায় মাঝে মাঝে। ওই সহেলী আমার রং নিয়েছে কিন্তু আর কিছুতে জিততে দেব না। ওর শরীর আমার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর, রেজাল্টও। আমি তোমার কথা ভাবব, না কি সহেলীর কথা? ধুর, সহেলী কে? তোমার কথা শুনতে শুনতে আমার জ্বর আসে জানো...। তোমার শব্দগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করি। সেদিন পপুলার পলিটিক্স নিয়ে কত কী বললে... আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম... তবে আমিও ভাবি বুঝলে। সহেলীদির মতো ঝাঁ-চকচকে ইয়ে না হতে পারে। যৎসামান্য বুদ্ধিতে কিছু পলিটিক্স আমিও করি। এইসবই তুমি বড়োসড়ো করে বলছিলে। আমিও একটু বড়োসড়ো করে বুঝে নিচ্ছিলাম। খুব পার্থক্য কিছু নেই।

—আরে তুই তো রান্নাঘর থেকে বেডরুম পর্যন্ত আটকে থাকছিস। পরিবার নামক ইউনিট হবার আগে থেকেই এইসব পলিটিক্যাল লড়াই চলছে। তুই নিজেকে দিয়েই দ্যাখ, সংসারে না ঢুকেই সহেলীর সাথে বেশ অস্বস্তিকর সম্পর্ক বানিয়েছিস। কী ব্যাপার তোর? শোন তুই বাইরে যে বিজ্ঞাপনটা দিবি সেটা যদি তুই নিজে কনভিন্সড হবার মতো না বানাস তাহলে সন্ধানী মানুষ নকলটা ঠিক ধরে নেবে। সেই পথেই তুই হেরে যাবি কিন্তু। অবশ্য তুই তো বোবা। বোবার শত্রু নেই বলা হয়। কিন্তু তুই ঠিক তা নোস। তোকে একদিন নিয়ে বসব কাল্টিভেট করতে। আসি রে... একটা কথা, ব্রিটেনের স্টোনহিঞ্জকে এক-একজন এক-একরকম ব্যাখ্যা করে। কেউ বলে অবজারভেটরি। কেউ বলে দেবতার মন্দির, অথবা ভিনগ্রহের মানুষের তৈরি স্থাপত্য। যে যা-ই বলুক ওটা কিন্তু আছে। বায়বীয় নয়।

হ্যাঁ আছে তো। তুমি আছ আমি আছি কথা আছে। সহেলীদিও আছে। আমি ওর সাথে কী আচরণ করি তা তোমার জানা হল কী করে? আমি তো তোমাকে বলিনি। তুমি বুঝলে কী করে? যাইহোক, আমি আমিই। এত কাল্টিভেট করার আছেটা কী? আমার এসব ভালো লাগে না। সেসব তো বলারও উপায় নেই। তোমাকে বলতে পারব কি না জানি না। তোমাকে এটাও বলতে পারব না যে সহেলী আমার রং নিয়ে নিয়েছে। হ্যাঁ আমি ওকে হিংসে করি। না না, কোনো পজেটিভ হিংসে খুঁজো না। দরকার হলে আমিও ওর নামটাও কেড়ে নিতে পারি। সত্যিই কি পারি আমি কিছু? পারি তো। মণিদিদা অনুকে একটা খুব সুন্দর গল্পবলা কাঁথা বানিয়ে দিয়েছিল। আমাকে দেয়নি। আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। আমি একদিন ওই কাঁথা থেকে সব গল্প তুলে নিয়েছিলাম। সবাই যখন খুঁজছিল আমি তখন সব গল্পগুলো মুখে পুরে দিয়েছি। কেউ টের পায়নি। তারপর থেকে ভয় হয় বেশি কথা বলতে। যদি গলা বেয়ে উঠে আসে সেইসব গল্প। আমার হয়ে তুমি বলো কত কথা। তুমি যে এত ভালো বলো কেউ বিশ্বাস করে না জানো। কতবার বলেছি সবাইকে তোমার স্ট্রিট কর্নারগুলোতে যেতে, কেউ যায় না। এবার আর ছাড়ছি না তোমাকে। কাল তুমি আসছ লাইব্রেরিতে। ওখানেই আসতে বলেছি সবাইকে। সবাই দেখুক আমি কার শব্দের মোহে আটকে পড়েছি চিরতরে। আর কোনো অজুহাত চলবে না। হ্যাঁ সহেলীদিকেও আসতে বলেছি। আমি দেখাতে চাই। আমি ওকে দেখাতে চাই। ঠিক বিকেল পাঁচটা, আমি মনে করিয়ে দেব। কী নিয়ে বলবে মনে আছে তো? নৈতিক বাণিজ্যিকরণ না কী যেন বলেছিলে, যাকগে, তুমি যা বলবে সেটাই শোনার মতো।

—কী হল শুরু কর, কী নিয়ে আজ বলবি? তোর সব কটা বলাই দারুণ। আমরা তো আজ রেকর্ডিং করব। উশখুশ করছিস কেন? কেউ আসবে? আর কে বাকি? সব চেয়ার ভরে গেছে, নে শুরু কর। সেই আমাদের মুখচোরা মেয়ে এতদূর উঠে এসেছে, ভাবতেই ভালো লাগে রে মামণি।

—আমি? আমি বলব? তা তো বলিনি। ও আসবে, ও বলবে। আমি কোথায় বলতে পারি? কবে বলেছি? ও আসুক। এক্ষুণি এসে পড়বে। আমার সাথে কথা হয়েছে।

—কী যে বলছিস মামণি... তোর শরীর ঠিক আছে? এত এত স্ট্রিট কর্নার করা, এত এত সভা জমিয়ে দেওয়া মেয়ে তুই, এসব বিনয় আর তোকে মানায় না। যা শুরু কর। এবার থেকে সব ইন্টারনেটে আর্কাইভ করে রাখা হবে।

আমি ... আমি ... বলব? আমি বলি? আমি তো বলি না। ও বলে। আমি শুনি। আমার ঘট

ভেসে যায়। আমার ঘাটও ভেসে যায়। পলিটিক্স আর ইকোনমিক্সের ফাঁকেফোকরে

মাধবীলতা দোলে। আমার প্রেমিক পুরুষ সে। কে কথা বলে? কে বলে যায় কথা...


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

জয়শীলা গুহ বাগচী জলপাইগুড়ি জেলার বাসিন্দা। কবিতার জগতে তাঁর বিচরণ কম দিনের নয়। কবিতার পাশাপাশি শুরু করেছেন গদ্যচর্চাও। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা এগারো। নয়টি কাব্যগ্রন্থ, একটি উপন্যাস ও একটি গল্প সংকলন। পেশায় উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা।

অন্যান্য লেখা