এই মাস থেকে কেতাব-ই ব্লগজিনে শুরু হল ‘জেলার সাহিত্য’ নামের এক বিশেষ আয়োজন। যার মূল উদ্দেশ্য পাঠককে বিভিন্ন জেলার নতুন ও পুরনো লেখকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন জেলার ভিন্ন স্বরকে একত্রিত করে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক রূপনির্মাণ। আমাদের প্রথম নির্বাচিত জেলাগুলি হল দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, এবং কোচবিহার। গোটা এপ্রিল মাস জুড়ে আমরা প্রকাশ করব এই পাঁচ জেলার সাহিত্য। আজ প্রকাশিত হল কোচবিহারের গদ্যকার মঈন চিশতি-র ছোটোগল্প ‘ডোডেয়ারহাটের বোধো ডাঙ্গোয়াল’।
হাঁটতে হাঁটতে যে মানুষ ইতিহাস বয়ে নিয়ে যায়—এক ডাঙ্গোয়ালের জীবনে প্রেম, ভয় এবং মাটির দীর্ঘ পথ।
ভোরের কুয়াশা তখনও পুরো কাটেনি। পিচ রাস্তার ওপর দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে কয়েকটা গরু—গলায় বাঁধা দড়ি তাদের একসঙ্গে বেঁধে রেখেছে। তারা পাশাপাশি হাঁটছে। সামনে গরুগুলো। পেছনে হাঁটছে একজন মানুষ। তার হাতে ছোট্ট একটি বাঁশের লাঠি—যাকে কোচবিহারের মাটির ভাষা প্রাণের ভাষা ‘রাজবংশী ভাষা’ বা কামতপুরী ভাষায় বলা হয় ‘পেন্টি’। দেড়/দু-ফুট লম্বা একটি বাঁশের দণ্ড বা লাঠি হল পেন্টি বা পেনটি।
রোদ উঠতে এখনও দেরি আছে। কিন্তু সেই মানুষটা জানে—আজও তাকে হাঁটতে হবে অনেক দূর। কারণ তার পেশার নাম ডাঙ্গোয়াল।
কোচবিহারের পুন্ডিবাড়ির কাছে একটি ছোটো গ্রাম—লোকেরা তাকে বলে ‘কচুবন বারামখানা’।
পাটখেতের গন্ধ, কুয়াশায় ঢাকা পথ, আর দূরে কোথাও ভোরের পাখির ডাক—সব মিলিয়ে মাটির ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক নিঃশব্দ পৃথিবী। সেই কচুবন বারামখানা গ্রামেই থাকে বোধো মিঞা। ভোর নামার আগেই সে বেরিয়ে পড়ে। ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে ডোডেয়ারহাটে তখন সাজতে শুরু করে সাপ্তাহিক হাট। রাস্তার পাশে ঘাসের ওপর শিশির জমে থাকে। হাঁটার শব্দে মাঝে মাঝে কাঁকর কেঁপে ওঠে। বোধো হাঁটে। তার হাঁটার ভেতর একটা ছন্দ আছে—যেন রাস্তার বুকের ওপর সময়ের নরম আঙুল বয়ে যাচ্ছে।
বোধো একজন ডাঙ্গোয়াল। ডাঙ্গোয়াল মানে সেই মানুষ, যে হাটে বিক্রি হওয়া গরুগুলোকে হেঁটে হেঁটে তাদের নতুন মালিকের বাড়ি বা অন্য হাটে পৌঁছে দেয়। কখনও দালাল গরু কিনে তাকে দায়িত্ব দেয়—গরুগুলো ঠিক ঠিকানায় পৌঁছে দিতে।
সবই পায়ে হেঁটে। গরুগুলো সাধারণত দুই বা চারটে করে পাশাপাশি হাঁটে। কখনও দশ-বারোটা গরুকেও এভাবে একসঙ্গে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে হয়। গরুর গলায় দড়ি বাঁধা থাকে—সেই দড়ি দিয়ে তারা একসঙ্গে জোড়া। সামনে তারা এগোয়। বোধো থাকে পিছনে। তার হাতে থাকে ছোট বাঁশের লাঠি বা পেন্টি। দেড় বা দুই ফুট লম্বা। গরুর পিঠে খুব হালকা টোকা দিলেই তারা বুঝে যায়—হাঁটতে হবে। পেন্টির সেই টোকা যেন এক অদ্ভুত ভাষা। গরু বোঝে।বোধোও বোঝে।
প্রতিটি গরুর জন্য মালিক তাকে টাকা দেয়। কিন্তু সেই টাকার জন্য তাকে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়—গরুর গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে। এই কাজ সে করছে দশ বছর বয়স থেকে।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
এক সময় তারও স্কুল ছিল। বই ছিল। নুন মাখা ভাত খেয়ে দুপুরে মাঠে দৌড়নোর ছোট্ট স্বপ্ন ছিল। কিন্তু একদিন তার বাবা বলেছিল—“বাপ, বই দিয়া প্যাট ভইরবে না।”
বোধো জিজ্ঞেস করেছিল—“তাইলে?”
তার বাবা বলেছিল—“মোর সাথত হাটোত চল। ডাঙ্গোয়ালি কর।”
সেদিন থেকেই বোধোর জীবন বদলে যায়। সে গরুর পেছনে হাঁটতে শুরু করে। রাস্তা তার শিক্ষক হয়ে যায়। গরুর চোখ তার বই। স্কুলের বেঞ্চ ছেড়ে সে দাঁড়িয়ে পড়ে গরুর পাশে।
সেই থেকে গরুর চোখের দিকে তাকিয়েই সে পৃথিবী পড়তে শিখেছে।
ডোডেয়ারহাটে সপ্তাহে দু-দিন হাট বসে—শনিবার আর মঙ্গলবার। এই দুই দিন বোধোর জীবন অন্যরকম হয়ে ওঠে। কখনও তুফানগঞ্জ, কখনও দিনহাটা। কখনও ত্রিশ, কখনও চল্লিশ কিলোমিটার হাঁটা। মাথার ওপর আগুনের মতো রোদ। শরীর জুড়ে ঘামের নোনা গন্ধ। তবু তার মুখে থাকে এক ধরনের শান্তি। যেন হাঁটাই তার ধর্ম।
এই পথেই বড়ো হয়েছে তার দুই সঙ্গী—মন্টু আর ঝন্টু। ডোডেয়ারহাটে সুবল নামে এক চায়ের দোকানদার আছে। সে জানে কোন লোক অভাবে গরু বিক্রি করতে এসেছে। ঝন্টু মাঝে মাঝে গরুর দালালদের হয়ে দর কষে। দালালদের কাছ থেকে দু-জনেই কিছু কমিশন পায়। তিনজনই একই গ্রামের ছেলে। ডোডেয়ারহাটের গরুহাটই তাদের লাইফ লাইন।
বিউটি বয়সে পঁচিশের কাছাকাছি। কম কথা বলে। চোখে শান্ত অথচ গভীর এক নির্ভরতা।
মহিষবাথান গ্রামেই বাড়ি। তিন বছর আগে অসুখে তার স্বামী মারা গেছে। সন্তান ছিল না।
মা-ও আর বেঁচে নেই। খাগড়াবাড়ি চৌপথি এলাকায় কয়েকটি বাড়িতে রান্না করে সে।
তার রান্নার সুনাম আছে। ধোঁয়া ওঠা ভাত, কাঁচা দিয়ে তেলেভাজা, লাউ আর ছোট মাছের ঝোল, তোরসা নদীর বোরোলি মাছের ভাপা—আর তার হাতের বিখ্যাত রান্না ‘সিদল আওটা’, সব কিছুতেই যেন মাটির গন্ধ মিশে থাকে।
এক হাটের সকালে বোধো নিজের ঘরে রান্না করছিল। হঠাৎ দরজায় এসে দাঁড়াল বিউটি।
সে একটু হাসল। তারপর বলল—“তুই রান্ধির ধইরছিস?”
বোধো একটু লজ্জা পেল।
“আর কায় করি দিবে এ্যালা?”
বিউটি হেসে বলল—“ব্যাটা ছাওয়া মানষি র এইল্লা কাজ নোয়ায়। দে, মুই রাঁধি দ্যাং।”
সে হাঁড়িটা নিজের হাতে নিয়ে নাড়তে লাগল।
বোধো চুপ করে বসে রইল।
কিছুক্ষণ পরে বিউটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—“তুই কতদূর করি হাঁটিস!”
“হ্যাঁ।”
“তোর দুই ঠ্যাং বিশায় না?”
বোধো একটু ভেবে বলল—“গরিব মানুষের ঠ্যাং বিশাইলে চলে?”
বিউটি তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটা অন্যরকম। কিন্তু গ্রাম কখনো-কখনো মানুষের চোখের চেয়ে বড়ো হয়ে যায়।
কিছুদিন পর লোকের কথাও বাড়তে লাগল। কারও কানে কানে ফিশফাশ। কারও ঠোঁটে চাপা হাসি। কারও চোখে প্রশ্ন। কারণ বোধো আর বিউটি একই মাটির মানুষ হলেও তাদের প্রার্থনার ভাষা আলাদা। গ্রাম এসব দ্রুত ভুলে যায় না।
এক সন্ধ্যায় হাট থেকে ফেরার পথে মন্টু বলেছিল—“সাবধানে থাকিস রে বোধো, এ্যালা ধর্ম নিয়া রাজনীতি চলির ধৈরচ্ছে, বুঝিস তো।”
বোধো কিছু বলেনি।
সেই রাতে বিউটি এলে বোধো বলেছিল—“তোর আর মোর দুইজনের ভালোবাসা নিয়া যদি গ্রামের মাইনশি ঝগড়া করে? যেদু অগুন নাগে গ্রামের ভিতিরা?”
বিউটি অনেকক্ষণ চুপ ছিল।
তারপর বলেছিল—“তোরও বাপ, মাও, ভাই, বইন কাও নাই। মোরও কাও নাই এই দুনিয়াত। চল গ্রাম ছাড়ি পালে যাই।”
এক ভোরে তারা কাউকে কিছু না জানিয়ে নিউ কোচবিহার স্টেশনে এসে ট্রেনে উঠে পড়ল।
গন্তব্য—গুরুগ্রাম।
সেখানে বিউটি পরিচারিকার কাজ পেল একটি আবাসনে। বোধো সাফাইয়ের কাজ করতে লাগল। মাসে চল্লিশ হাজার টাকার মতো আয়। বাঙালি শ্রমিকদের বস্তিতে টিনের ছাউনি ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করল তারা। এক বছর পরে জন্মাল তাদের সন্তান—বকুল।
কিন্তু শান্তি বেশিদিন টেকে না। এক রাতে পুলিশ হানা দিল শ্রমিক বস্তিতে। বাংলা ভাষা শুনলেই সন্দেহ। সেই রাতেই বোধো সিদ্ধান্ত নিল—সে ফিরে যাবে নিজের গ্রামে।
আবার ট্রেন। আবার দীর্ঘ পথ। ফিরে এল তারা কোচবিহারে।
ফিরে এসে আবার শুরু হল হাঁটা। আবার গরু নিয়ে হাটের পথে বোধো। বকুল কখনও বাবার ঘাড়ে চড়ে থাকে। বিউটি বাজারের থলে হাতে হাঁটে পিছনে।
তবে পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। এখন ট্রাক আছে। পিকআপ ভ্যান আছে। গরুও গাড়িতে করে যায়। মানুষ হাঁটা ভুলে যাচ্ছে। তবু এখনও কয়েকজন আছে যারা হাঁটে, বোধো তাদের একজন।
একদিন এক তরুণ সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করেছিল—“আপনি এখনও এই কাজ করেন কেন?”
বোধো একটু হেসেছিল। তারপর বলেছিল—“গরুর দুই চোখের ভাষা মুই পড়ইর পাং। আর কিছু জানং না।”
ডাঙ্গোয়াল পেশা এখন প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার অঞ্চলে এখনও কিছু মানুষ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তারা হাঁটে। গরুর পাল নিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটে। বোধো তাদেরই একজন প্রতিনিধি। আজও বোধো মিঞা হাঁটে। সামনে কয়েকটা গরু। পেছনে সে। হাতে পেন্টি। পেন্টির হালকা টোকায় গরুগুলো আবার হাঁটা শুরু করে।
হয়তো একদিন ডাঙ্গোয়াল পেশাটাও শুধু গল্প হয়ে যাবে। কিন্তু যতদিন বোধো হাঁটে—ততদিন এই মাটির ইতিহাসও হাঁটতে থাকে। কারণ কিছু মানুষ আছে, যারা রাস্তা দিয়ে নয়—নিজেদের জীবন দিয়ে পথ তৈরি করে। বোধো মিঞা তাদের একজন।
সে হাঁটে। হাঁটতেই থাকে। ক্লান্তিহীন সেই হাঁটা।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।