মৃত্যু, বিদ্রোহ, প্রেম, সামাজিক ক্ষোভ ও ব্যক্তিগত বিভ্রম—সব মিলিয়ে এক তীব্র প্রতীকময় কাব্যভাষা নির্মাণ করে সুমন জানার দীর্ঘকবিতা ‘অতএব বিষাক্ত বাঁশি’। কাক, নদী, নক্ষত্র, গুজব আর শহুরে ক্লান্তির ভেতর দিয়ে কবি উচ্চারণ করেন প্রতিবাদী মানুষের একাকী সুর। এই দীর্ঘ কবিতায় বাস্তব ও স্বপ্নের সীমানা ভেঙে জেগে ওঠে এক বিষণ্ন অথচ অদম্য বাঁশির ডাক।
১.
যে তুমি কবর খুঁড়ে নগ্ন করেছ আরও আমার চাতক-প্রাণ লাশ
যে তুমি অনেক রাতে সহসা ভাঙিয়েছিলে আমার মরণপার ঘুম
যে তুমি আমাকে আরও বেঘোরে মারবে বলে শানিয়ে রেখেছ ওই ডাক
যতই হৃদয় খোঁড়ো, সকাতরে যত ডাকো, আমিও সমান নিরুপায়
তোমাকে দেব না আজ ভাঙতে দেব না এই পাহাড়ি মোষের বাঁকা শিং
২.
কখনও দেখিনি আগে এত কাক এখন যেমন
সেদিনও ছিল না মাটি, রোদ-হাওয়া-আকাশ ছিল না, ছিল কাক—
আমার ব্যথিত ঘুমে লেসবীয় শীৎকার,
ঋতুজলে ভেসে গেলে বোধিবৃক্ষ সম্মোহিত আমি
ময়ূরপালক দেখে ভুলে যাই কাক, আর ওরা
আমাকে ভুজুং দিয়ে শিখে নেয় কোকিলের ভাষা,
এবার সমুদ্রযাত্রা—
হে নক্ষত্র রক্তস্রাবী, এ কোন পৃথুলা মহাদেশ
কাকের সংসার ছেড়ে তোমার রক্তের তীরে হেঁটে যেতে চায়
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
৩.
আমরা যারা মধ্যরাতে বোনের দরজায় টোকা দিয়েছি
আমরা যারা চাঁদ ধরতে ভরা গঙ্গায় খাবি খেয়েছি
আমরা যারা সূর্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হেঁটেছি
আমরা যারা বিদ্যুৎ ভেবে চাবুকের প্রেমে পড়েছি
আমরা যারা ফুসফুস নিংড়ে অক্ষর সাজাই আর লোকে বলে প্রলাপ
আমরা যারা আগুন উগরে ছাই হই আর লোকে বলে কারসাজি
আমরা যারা ভালোবেসে খুন হই আর লোকে বলে অভিনয়
ঝোড়ো কাকে ছুঁয়ে গেলে ফসলের দিন
সেইসব রতিচোর হাঘরে পাজির জাত সকলে মিলিত স্বরে বলি
কখনও দেব না শোনো পরাতে দেব না এই জ্যান্ত নদীর পায়ে বেড়ি
৪.
কিচ্ছুটি নেই গো বন্ধু পরনে কাপড়ও নেই, আমি তবু একা খেয়াঘাটে
আমারই বাঁশির ডাকে দাঁড়ালাম, অন্ধকারে হাওয়া
ফেরারি বাঁশির সুর, সহবাসে দ্যাখো দ্যাখো নিশীথের সমূহ আকাশ,
আর কত আলো দিলে ও জোনাকি, নিশি ভোর
হল গো, এবার সপ্ত সাগর আর ত্রয়োদশ নদী পারে ‘কৃষ্ণ’ নামে গাও শুক
‘রাধা’ নামে শারি, দ্যাখো জিয়ন কাঠির ছোঁয়া পেয়ে
জেগে উঠে তম্বি কত রাজদুলালীর, বলে কিনা—“ঘাটে নাও তরী,
ফিরে চলো মাঝিভাই, তুমি বড়ো দুষ্টু লোক, বিরক্ত কোরো না,
শোনো গুজব রটল পাড়াময়”, আর কত বোকা আমি
গুজব শুনেই অমনি তড়িঘড়ি উঠে বসি, অন্ধকারে মশারাও
হেসে ওঠে খুব এই ঘামে সপসপে বেডরুমে।
অযথা সে-গল্পে মজে এই আমি ইহকাল খোয়ালাম, আর
পরকাল খুইয়ে দ্যাখো কতই-না দেরিতে এসে দাঁড়ালাম এইচ-এম-টি শোরুমে,
সেলস গার্লকেই দেখে অনায়াসে ভাবলাম—
মেয়েরাও মাঝে মাঝে সহৃদয় হয়।
হে সমুদ্র পারের নাবিক, হে বিদেশি পাখিদের দল
তৃষ্ণার্ত বন্ধুকে ভুলে তাই বুঝি ফেলে গেলে বলো
দিগ্বিদিক জ্ঞানহীন এই লবণ-বহুল মহাদেশ,
আজ তবে চলো নদী আমরাও হয়ে যাই রামধনু হাঁস আর
বউবাজারের সেই দরদি নার্সকে বলে আসি—
আবারও আসব জেনো, সেধেই বাঁধাব রোগ আর
নিজ হাতে জল দিয়ো, কপাল মুছিয়ে দিয়ো, তুমি যেন সেরকমই হেসো
৫.
দূরে যারা বসে আছ নতমুখ ক্রোধে, তারাও এবার এস ঢেউ খুলে দ্যাখো
চাকরি চাকরি করে ইহকাল মাটি পরকালে মনোহারী বাতাস ঢুকেছে
চুনের গাদায় দ্যাখো ভূতের দোসর সর্দার পোড়োর চোখে আকরিক জল
পোকায় কেটেছে যত নবাব সিরাজ ঘুড়ির পোশাকে ওড়ে চাণক্য শ্লোক
এখনও ধর্ষণ কেন প্রতিকারহীন, শোকেসে সাজানো থাকে নারী-স্বাধীনতা
মুদ্রাদোষে পরিচিত অনেকে সফল দেবদারু কলোনিতে জবর-দখলে
তাই বলে অভিমান কখনও কোরো না, বেনোজলে ধুয়ে দেব তোমার তোরণ
৬.
তোরণ প্রাচীন সুরে ছাড়ো ধান্দাবাজি
চলো দাঁড়কাক হরো ময়ূরপালক
সাগর বাতাসে যত দিন গুজরান
সে-ও তো গোলামবাজি গোলকধাঁধায়
তবে আর দেরি নয় এস জোট বাঁধো
দ্যাখো মৃত্যু ফুঁড়ে ওঠে অবাধ্য মানুষ
৭.
শোনো গঙ্গা-না-পাওয়া যত ভাগের মা, শোনো রত্নগর্ভা ধরিত্রী
শোনো রক্ত-জমাট সব গ্রাম্যমুখ, শোনো ক্যালকেশিয়ান তরুণী
শোনো হাইভোল্টেজ হ্যালোজেন, শোনো টিমটিমে কেরোসিন
শোনো হারিয়ে যাওয়া পালকি, শোনো রাশভারী লিমুজিন
শোনো হে ঘুরপথ পাহাড়ি সিঁড়ি আর শোনো শর্টকাট খুচরো গলি
শোন যত পেশাদার ধর্ষণকারী শোনো শোনো প্রতিবাদী মহিলা সমিতি
তোমাদের সবাইকে এক ঘরে পুরে আজ বাজাতে এসেছি
এই বাজিয়ে চলেছি দ্যাখো আমার হাড্ডিসার মোহন বাঁশি...
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।