মানসী সরকারের এই লেখায় উন্মোচিত হয় তিন নারী শিল্পীর দীপ্তি ও দহন—বিনোদিনী, কেয়া, শেফালি। সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও পুরুষতন্ত্র, প্রতারণা ও সামাজিক দ্বিচারিতায় তাঁদের জীবন ক্রমে নির্বাসিত। শিল্পের জন্য সব বিসর্জন দেওয়া এই নারীরা শেষজীবনে কতটা আলো পেলেন, আর কতটা অন্ধকারে হারালেন—এই নির্মম প্রশ্নই লেখাটির কেন্দ্রবিন্দু।
মেঘে ঢাকা তারা সিনেমার শেষ দৃশ্য। অধিক গ্রেইন্ড ছবি, গতি আটকে আটকে যাচ্ছে, শব্দ ছেঁড়া ছেঁড়া। অভিনেত্রীর কন্ঠে সংলাপ “আমি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলাম দাদা!”। শিল্পী, স্রষ্টারা বাঁচতেই চান। কাজের টানে, সৃষ্টির টানে বাঁচতে চান। কিন্তু হতভাগ্য এ তৃতীয় বিশ্বে তারা সবাই বাঁচতে পারেন না। কারা কারা তাদের কাজের সাথে শেষদিন অবধি বাঁচতে পারেননি তাঁর একটি স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিপোর্ট প্রস্তুত করতে গিয়ে দেখি, এখানেও একই পরিণতি। না পাওয়ার তালিকায় সব সময়ই প্রান্তিক আর দ্বিতীয় লিঙ্গের মানুষেরাই এগিয়ে। এই একটিই তালিকায় সমাজ আমাদের এগিয়ে রেখেছে। প্রসঙ্গ, হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া ‘নারী তারকা’, যাঁরা স্বদর্পে গগনচুম্বী সাফল্যে পৌঁছেও অবহেলায় হারিয়ে গেলেন বা বলা ভালো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাদের নির্বাসনে পাঠাল অকালে।
হতদরিদ্র ঘরের বারো বছর বয়সি এক বালিকা জীবনে প্রথমবারের জন্য বাংলা থিয়েটারের রঙ্গমঞ্চে উঠেছে। মাত্র দুটি সংলাপ। খুব ছোটো। নাটক ‘বেনী সংহার’। দ্রৌপদীর সখীর ভূমিকায়। দুরুদুরু বুকে এতদিনের অভ্যাসের নিবেদনটুকু করেই চকিতে বেরিয়ে এল। উইংসে ঢুকেই শুনতে পেল দর্শক আসন থেকে উচ্চকিত করতালির শব্দ। সেই শুরু এবং তা অবিরাম চলেছিল পরবর্তী বারো বছর, তাঁর মঞ্চাভিনয়ের শেষ দিন পর্যন্ত। কর্নওয়ারলিস স্ট্রিট, ১৪৫ নম্বর বাটীর মেয়ের ঘরের, মেয়ের ঘরের, মেয়ে বিনোদিনী দাসী। কী করলে দুটো পয়সা আসে, নিতান্ত এই চিন্তা থেকেই নাতনিকে গ্রেট ন্যাশানাল থিয়েটারে পেশাদারি অভিনেত্রী হিসেবে পাঠান তাঁর মাতামহী। মাত্র বারো বছর তিনি মঞ্চাভিনয় করেছেন। কী কী পালক জুড়ল এই বারো বছরে তাঁর মুকুটে একবার দেখে নেই—বঙ্কিম, দীনবন্ধু, মাইকেল, গিরিশ প্রমুখের কঠিন নাটকে ততধিক কঠিন কঠিন সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন। মোট পঞ্চাশটি নাটকের ষাটটি চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন যার সিংহভাগেই তিনিই নায়িকা। আমরা যারা অভিনয় করি তারা জানি নিজের বয়সের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে অন্য বয়সের চরিত্রে অভিনয় করাটা খুব সহজ কথা নয়। কিন্তু বিনোদিনী কৈশোর থেকেই যুবতি, চৌষট্টি কলা পরিশিলীতা, ঘনঘোর নায়িকা। শুধু কী তাই, ‘মৃণালিনী’ নাটকে ‘মনোরমা’ চরিত্রে একাধিক শেডের নিপুণ সামঞ্জস্য অবাক করেছিল ওই চরিত্রের স্রষ্টা স্বয়ং বঙ্কিমকেও। যে চরিত্র শুধু কাগজে কলমে লেখা যায়, বাস্তবে তার রূপ চাক্ষুষ হবে বলে তিনিও কখনও ভাবেননি। ‘মেঘনাদ বধ’ নাটকে নাট্যরূপে তিনি একই মঞ্চে সাতটি চরিত্র একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। ১ম চিত্রাঙ্গদা, ২য় প্রমীলা, ৩য় বারুণী, ৪র্থ রতি, ৫ম মায়া, ৬ষ্ঠ মহামায়া, ৭ম সীতা। বাংলা নাট্যাঙ্গনে এর আগে তো নয়ই, এর পরেও আর কেউ এই সাহস কল্পনা করেছেন বলে জানা যায় না। যে সময় আজকের মেয়েরা সদ্য সাবালিকা হন, প্রায় দেড়শো বছর আগে সমাজের নিচু তলার অন্ধকার গলি থেকে উঠে আসা একটি বাঙালি মেয়ে ‘স্টারডম’র শীর্ষে ছিলেন। কিন্তু তারপর কী হল? জীবনের দুই যুগ বসন্তেই নিভে এল সব তারার আলো। বিনোদিনী অভিনয় ছাড়লেন। পেশার দায়ে প্রতারণা যার “চির সহচরী” তিনিই সরল বিশ্বাসে এ কী ভুল করে ফেললেন! বিনোদিনী জানতেন তাঁর দাম। জীবনে কখনও ‘অ্যামেচার’ শিল্পী হিসেবে অভিনয় করেননি। তাই কাজের ক্লান্তিতে অসুস্থ হয়ে এক মাস ছুটি নেওয়ায় বেঙ্গল থিয়েটারের প্রতাপবাবু যখন তাঁর মাইনে কাটার হুমকি দেন তখন বিনোদিনীও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন প্রাপ্য পারিশ্রমিক ছাড়া কাজ তিনি করতে পারবেন না। কিন্তু পরম পূজ্য গুরু গিরিশ ঘোষ ও নাট্যবান্ধবগণ, তাঁর (পড়ুন বিনোদিনী) ন্যায্য প্রাপ্তি, নিজের থিয়েটার গড়ার আশা দেখিয়ে সেবারের মতো তাঁকে নিরস্ত্র করেন। “মিছে গোলে কাজ কী?”, তাই বিনোদিনীও মেনে নিয়েছিলেন গুরু ও সহকর্মীদের আশার বাণী। ‘আমার কথা’ আত্মজীবনীতে তিনি অভিমানের সাথে লিখেছেন “আমাদের আত্মরক্ষাও নিন্দনীয়”।
একবার ভেবে দেখা যাক, দেড়শো বছর আগে শুধু অভিনয়কে ভালোবেসে নিজের যা কিছু সম্বল সব উজাড় করে, এক নারী প্রথম স্বপ্ন দেখলেন তাঁর নিজের নামে রঙ্গালয় তৈরির। প্রাক্তন বাবুর হাতে মারা পরার ভয়, ন্যায় অন্যায়ের দ্বিধা কাটিয়ে এই পুরুষ প্রতিষ্ঠিত বাজারে দাঁড়িয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন। বলা বাহুল্য, তাতে যে শুধু তাঁর আগ্রহ ছিল এমন নয়, গুরু গিরিশ ঘোষসহ সকল নাট্যবান্ধব তখন “বিনোদ তুই না দেখিলে” আমরা অতলে ভাসব, এই কাকুতি নিয়ে তাঁর দ্বারস্থ হন। গুর্মুখ রায় জানান ‘বিনোদ’ যতক্ষণ না সম্পূর্ণ তাঁর বশে আসেন ততক্ষণ তিনি রঙ্গালয় তৈরির টাকা দেবেন না। তা-ই হল; কেবল অভিনয়কে ভালোবেসে বিনোদিনী সব দিলেন। কথা হল নতুন থিয়েটারের নাম হবে ‘বি-থিয়েটার’। তারপর রেজিস্ট্রেশন হল অন্য নামে। গুরু সহিত সেইসকল নাট্যবান্ধবেরা মিলে তাঁর অবর্তমানে থিয়েটার রেজিস্ট্রি করিয়ে আনলেন ‘স্টার থিয়েটার’ নামে। নটী বিনোদিনীর জীবনী গ্রন্থে উল্লেখ আছে, গিরিশ ঘোষ বিনোদিনীর মাকে বলছেন, “বিনোদের মা ওসব ঝঞ্ঝাটে তোমাদের কাজ নেই, তোমরা স্ত্রীলোক অত ঝঞ্ঝাট বহিতে নাই।” সরল বিশ্বাস। এই বিশ্বাসেই তো গুর্মুখ রায় যখন থিয়েটার তৈরির কাজ বন্ধ করার বিনিময়ে বিনোদিনীকে অর্ধলক্ষ টাকা দিতে চান তখন তিনি সেই টাকা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সেই সময়ের এই পরিমাণ অর্থের মূল্য নিশ্চয়ই আমরা সহজেই অনুমান করতে পারছি। সে-টাকা যদি সেদিন তাঁর কাছে গচ্ছিত থাকত, তবে এটুকু নিশ্চিত যে শেষ জীবনটা বিনোদিনীকে এমন রোগশয্যায়, দারিদ্রে কাটাতে হত না। কিন্তু তা তো তিনি চাননি। চেয়েছিলেন প্রাপ্য সম্মান। তাঁর ন্যায্য অধিকার। বিনোদিনী অর্থ উপার্জন করেছিলেন, অর্থ তাকে উপার্জন করেনি। বিনোদিনী প্রতারিত হয়েছিলেন, ব্যবহৃত হয়েছিলেন তাঁরই গুরু ও সহকর্মীদের দ্বারা। বড়ো অভিমান নিয়ে, অপমান নিয়ে চলে গেলেন। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে বিনোদিনীর রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় এক অপূরণীয় ক্ষতি। বাংলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে কালো দিন।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
যখন পাকাপাকিভাবে ঠিক করলাম, অন্য কোনো আর্ট নয়, পারফর্মিং আর্ট ফর্মকেই পেশা হিসেবে বেছে নেব, তখন থেকেই নিতান্ত কৌতুহলের বশে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম কারা আমার পূর্বসূরি। একটা বিশেষ ক্রাইটেরিয়া মাথায় রেখেই মাঠে নেমেছিলাম। মহিলা শিল্পী হতে হবে। বিনোদিনীর অসহায় প্রতারিত জীবন, অভিমান নিয়ে মঞ্চ ছাড়া আমায় ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে ততদিনে। সম্ভবত সেখান থেকেই এ যাত্রার শুরু। আবার খুঁজতে বসলাম আরও কি কেউ আছেন? যিনি তাঁর চর্চায় শিখরপ্রমাণ সাফল্যে পৌঁছেও দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি, কেউ বা কারা তাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল। নাম পেলাম। কেয়া চক্রবর্তী। কেয়ার সম্পর্কে পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল, এতদিন চিনিনি কেন? উত্তরটাও যদিও পরে পেয়েছি। স্কটিস চার্চ কলেজে ইংরেজি বিভাগের কৃতী ছাত্রী। দ্বিতীয় বর্ষেই কলেজ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হল তাঁর নিবন্ধ ‘রবীন্দ্রমানসে মৃত্যু’। তিনি লিখছেন, “অন্ধকারের ঝরনা থেকে আমাদের জীবন শুরু। অন্ধকারের নিস্তব্ধতার মধ্যেই মৃত্যুর আক্রমণ। মানুষ কিন্তু কোনো দিনই মেনে নিতে পারেননি এই মৃত্যুর আক্রমণ”। তারপর স্কটিস চার্চেই অধ্যাপনা শুরু। শেক্সপিয়ারের নাটক শুধু পড়াননি গায়েগতরে-অভিনয়ে সাহিত্যকে আত্মীকরণ করতে শিখিয়েছিলেন। ঘুরতে ভালোবাসতেন কেয়া। আজকের দিনেও মনিপুর নাগাল্যান্ডে ঘুরতে যাওয়ার ভাবনা এলে যেখানে পাঁচ বার ভাবতে হয়, প্রায় বেশিরভাগ ট্রাভেল এজেন্সি যে ট্যুর প্ল্যান থেকে একটু হাত কচলে বিরত থাকেন, ৪১ বছর আগে এক মা-মেয়েতে মিলে উদ্দাম সাহসে ঘুরে এসেছিল সেই ‘অনিশ্চয়তার রাজ্যে’। এরপর জীবনে এক বড়ো সিদ্ধান্ত নেন কেয়া। স্কটিস চার্চের মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে ঠিক করেন থিয়েটারে হোল-টাইমার হবেন। যদিও কলেজ পড়ুয়া বয়েস থেকেই তিনি অভিনয়ের নেশায় একেবারে বুঁদ। কথা প্রসঙ্গে বলি, এক দুপুরের ঘটনা; কেয়ার সাথে তাঁর অজিতদার তুমুল তর্ক। যাকে বলে একেবারে ‘সিলিং ছোঁয়া’। তর্ক গড়াল রাত অবধি কিন্তু শেষ হল না। পরদিন সকালে রিকশায় চেপে কেয়া আসছে, সঙ্গে পাহাড়প্রমাণ বই। সব কটিতে মার্কার ফ্ল্যাপ লাগানো। আবার শুরু হল তর্ক, যুক্তির রেফেরেন্সে একের পর এক বইয়ের পাতা উলটিয়ে দেখিয়ে দিলেন। শেষে ন্যায্যরূপেই অজিতেশ হার স্বীকার করেন। ঘটনাটা উল্লেখের কারণ, কেয়া তাঁর কর্মক্ষেত্রে ছিলেন অপ্রতিরোধ্য, অন্তত জীবদ্দশায়। শুরু হল তাঁর থিয়েটারে হোল-টাইমার জীবন। নিজের বিয়ের সমস্ত গয়না এবং মায়ের জমানো গয়না দিয়ে দাঁড় করালেন ‘অজিতেশ-রুদ্রপ্রসাদের’ ‘নান্দীকার’। আর মা সহ নিজের সংসার খরচ চালাতে জুতোর কোম্পানিতে বিজ্ঞাপনের কপি লেখার কাজ নিলেন। এবার মায়ের বুকের পেসমেকার বসাতে হবে একা দায়িত্ব নিয়ে। ছুটলেন চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে। সেই টাকায় পেসমেকার বসল। নাটক, থিয়েটারের প্রতি শুধু ভালোবাসা নয়, কতটা দায়িত্ববান হলে মায়ের অপারেশনের দিনেও তিনটি শো-এ অভিনয় করা যায়, কেয়া তাঁর উদাহরণ। সাহিত্যিক-সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষের বয়ান থেকে।— ‘‘আন্তিগোনে দেখবার স্মৃতিটা আমার সাঙ্ঘাতিক। সাধারণত কেয়া-রুদ্র (রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত) যখন আমাকে নেমন্তন্ন করত তখন একটু আগেই আমি যেতাম। ব্যাপারটা হত অদ্ভুত। কেয়া তখন শিশু হয়ে যেত। অপেক্ষা করত যে ও স্টেজে ঢোকবার আগেই যাতে আমার সঙ্গে দেখা হয়। ... ওই দিন একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। ... ঢোকার মুখেই রুদ্রর সঙ্গে দেখা। রুদ্র আমাকে একেবারে টানতে টানতে নিয়ে চলে গেল সাজঘরে। আমি কেয়াকে খুঁজে পাইনি। এরকম আমার একদম হয় না। তারপর আমি দেখলাম, কেয়া আর নেই। আন্তিগোনে বসে আছে। পুরোপুরি।”
যে-কোনো চরিত্রেই তিনি অদ্বিতীয়া। তাঁর জ্ঞান, চর্চার সীমা আমাদের দৃষ্টির ওপারে। আর ইচ্ছাশক্তি, সে তো কেয়ার অপর নাম। তিনি জানতেন যে একজন নারী নাট্যকর্মী অথবা অভিনেতার রাস্তাটা শুধু চর্চায়ই সীমিত নয়। পথের আশেপাশের নানা কিছু গুছিয়ে, সামলে তারপর এগোনো। যার ছবি পরিষ্কার আঁকা রয়েছে কেয়ার লেখা ‘মিসেস. আর. পি. সেন’ প্রবন্ধে। দৃশ্যে মিসেস. আর. পি. সেন লিখতে বসেছেন। আধ ঘন্টার মধ্যে তাঁকে ছয় বার লেখা ছেড়ে উঠতে হয় নানারকম গৃহস্থালি কাজ সামলাতে। প্রথমবার, দুধওয়ালাকে দরজা খুলতে। দ্বিতীয়বার, তাঁর স্বামীকে গেঞ্জি খুঁজে দিতে। তৃতীয়বার, প্রতিবেশী আসেন সরষে চাইতে। এরপর ল্যান্ড নম্বরে দুটি ফোন কল। যদিও সে-মুহূর্তে তাঁর স্বামী এবং তাঁর দেওর বাড়িতেই ছিল, কিন্তু ফোনটা ধরতে হয় তাঁকেই। তারপর বাড়িতে দেওরের বন্ধু আসে, তাকে চা করে দিতে হবে, যদিও গৃহিনী সকাল থেকে এই নিয়ে পাঁচ বার চা করেছেন। এবং এর পরের ঘটনা আমরা জানি। কেয়ার এই লেখা আরেকবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল কীভাবে ঘরের কাজের বোঝা একজন মেয়ের উপর চাপিয়ে দিয়ে জোর করে তাঁকে তাঁর আসল কাজটা, তাঁর ভালোলাগার কাজটা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে আসা হয়। মাত্র তিন পৃষ্ঠায় নারীর শৈল্পিক শ্রমের মূল্য নিয়ে যে প্রশ্ন কেয়া তুলেছিলেন তা দলীয় নাট্যজগতের আদর্শ ও তার প্রকাশের মধ্যেকার অসামঞ্জস্য এবং দ্বিচারিতাকেই স্পষ্ট করে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক একটি পডকাস্টে বিশিষ্ট নাট্যকর্মী, অভিনেত্রী, নাট্য প্রশিক্ষক তুর্ণা দাস তার সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন—‘বীরাঙ্গনা কাব্য’ নাটকের স্ক্রিপ্ট তাকে বাধ্য হয়ে শৌচালয়ে বসে লিখতে হয়েছে। এক্ষুনি কেউ বাহবা দিয়ে বলে উঠবেন “মেয়েরা সব পারেন”। না, পারেন না। বরং মেয়েরা এসব পারতে চান না। পারতে যাবেনই-বা কেন? এ অত্যন্ত লজ্জার কথা যে আজও নারীর নিজস্ব চর্চায় বারবার বৈরী হয়ে দাঁড়াচ্ছে তার গৃহস্থালির কাজ। ঘর তো তার একার নয়। একটি সাক্ষাৎকারে কেয়াকে বলতে দেখা যায়, ‘‘যদি মহিলা প্রকৃত অর্থেই সাধিকা হন, তা হলেই কিন্তু তাঁকে সামাজিকভাবে নিন্দিত হতে হবে। তাঁর স্বামী হয়তো, যে গান শুনে এক কালে তাঁকে ভালবেসেছিলেন, সেই গানের চর্চায় বেশি মন দেবার অপরাধে, পাশের বাড়ির বৌটিকে দেখে আহ্লাদিত হবেন— ভাববেন— আহা বৌটি কেমন সুন্দর, সংসার করে, রাঁধাবাড়া করে, সেজেগুজে থাকে। আর যে-মা অসুস্থ ছেলেকে ছেড়ে শো করতে গেল, তাকে তো ডাইনি মনে করা হবে।’’ স্পষ্ট ভাষায় কেয়া বলে দেন, বিছানা, রান্নাঘর, আঁতুড়ঘরের বাইরের জীবনে যেতে স্ত্রীদের ভূমিকা স্বামীরা কতটা মানতে রাজি, তার ওপরেই নির্ভর করে ঘরনির চৌকাঠ পেরোনো!
আমরা একজন কৃতী শিল্পীর সৃষ্টিটা দেখে খুব আপ্লুত হই। তুলনা করি অন্যান্য পুরুষ শিল্পীদের সাথে এক মাপকাঠিতে। কিন্তু ভুলে যাই দৌড়ের ময়দানে তাদের দু-জনের স্টার্টিং পয়েন্টের মধ্যেকার লক্ষ যোজন পার্থক্যের ছবি। তারপর যখন সমস্ত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে কেয়া চক্রবর্তী, কেয়া চক্রবর্তী হয়ে উঠছেন তখন আমাদের ফুল পাঞ্জাবি পরা সমাজ তার হাতাটা একটু গুটিয়ে নেয়। চশমা নামিয়ে আড়চোখে মেপে নেয় আপাদমস্তক। আর মনে মনে বলে, এবার সময় এসেছে। এরপরের ঘটনা আবারও আমরা সবাই জানি। ১৩ মার্চ রবিবার সকাল দশটায় পোর্ট পুলিশের লঞ্চ সাঁকরাইল থেকে এক ঘণ্টার উজানে হীরাপুরের কাছে কেয়া চক্রবর্তীর মৃতদেহ উদ্ধার করে, জানাচ্ছে পরদিন ১৪ মার্চের ‘আনন্দবাজার’। ‘কেয়ার মৃতদেহে তিন চারটি ক্ষত দেখা দেয়। তাঁর হাত দুটি ভাঙা। মুখে আঘাতের চিহ্ন। তাঁর হাত ভাঙলই বা কী করে?… গঙ্গার জলের তোড়ে, স্টিমারের প্রপেলারের ঘায়ে? না ধস্তাধস্তির চোটে…?’—লিখছে এক হপ্তা পর ২০ মার্চের ‘যুগান্তর’।
প্রশ্ন ওঠে, তদন্ত বন্ধ হয়ে গেল কেন? যদি হয়েই গেল তার প্রতিবাদ নেই কেন? বাংলা থিয়েটারের আঙিনায় কেয়া চক্রবর্তীর নাম, তাঁর কাজ কি সেই জোরের সাথে উচ্চারিত হচ্ছে? আমার মত—হচ্ছে না। কারা আটকে দিল? আর সব থেকে বড়ো প্রশ্ন, কেয়া চক্রবর্তীর শেষ সম্বলকে পুঁজি করে যে দল গড়ে উঠল তা আজও অজিতেশ-রুদ্রপ্রসাদের দল হয়েই থেকে গেল কেন? উত্তর পাওয়া যায় না। কেয়ারা এমনি এসে ভেসে যায়।
দেশভাগের বছরে বাংলাদেশ থেকে ছিন্নমূল হয়ে কলকাতায় আহিরীটোলার এক গুদাম ঘরে আশ্রয় পায় আরতি দাসের পরিবার। আরতি তখন দুধের শিশু। পাঁচটা পেট কীভাবে চলবে সেই ভেবে মাথায় হাত বাবা-মার। মা বাবুর বাড়ি ঠিকে কাজ নিলেন আর বাবা গেলেন দোকানে খাতা লিখতে। কলকাতার এক বাবুর “কিগো খুকি কোথায় থাকো?” নিতান্ত এই প্রশ্নেই, না কি অন্য কিছু, সঠিক জানা যায় না, বড়দি ভয় পেয়ে ওই যে ঘরে ঢুকল তারপর আর বেঁচে ফিরল না। পক্স হয়েছিল। আরতির যখন পাঁচ কি ছয় বছর বয়স হবে তখন থেকেই তাকে নাচে পেল। ঘাটের ধারে, কোথাও কোনো গান কানে এলেই সে বসে পড়ে। সন্ধে হলেই শুরু হয় মজার নাচ। গান নেই, কী নাচছেন তাও সে-বয়সে কিছুই জানা নেই কিন্তু পা থামে না। যতক্ষন না নাচতে নাচতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। নাচতে না পারলে তাঁর ঘুম আসে না, স্বাদ পান না। নাচলে ওই একরত্তি মেয়েটাকে ভিটে হারা হওয়ার যন্ত্রণা ছুঁতে পারে না।
বয়ঃসন্ধির গোড়াতেই আরতি বুঝেছিল তাঁরা গরিব, খুব গরিব। তাঁর দু-বেলা ভাত নেই, পরনে ঠিকঠাক জামা নেই, পাহাড়, সমুদ্রে বেড়াতে যাওয়া নেই। হ্যাঁ ঠিকই শুনছেন। নিজের দেশ থেকে রাতারাতি পালিয়ে আসা ইস্তক আহিরীটোলার অন্ধকার গুদাম ঘরেই যার দিন-রাত কাটত একই ছবির মতো, সে পাহাড় দেখতে চায়। আর পাঁচটা বাঙালি যখন পুজোর ছুটিতে সমুদ্রে গিয়ে পা ভেজায় তখন আরতির ওই ঘুপচিতে কোনো হাওয়াই ঝাপটা মারে না। তাও সে স্বপ্ন দেখে। ৪৭-এর সময় এমন অনেক আরতি কলকাতায় ভেসে এসেছিল, তাদের মধ্যে কেউ মধ্যবিত্ত হয়েছেন, কেউ প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী হয়েছেন, বেশিরভাগটাই কলকাতার এঁটো বাসন ধুতে ধুতে আস্তাকুঁড়েয় সেঁধিয়ে গেছেন। কিন্তু আরতি দাস হয়েছিলেন ‘মিস শেফালি’। পঞ্চাশের দশকে কলকাতায় বড়ো বড়ো রেস্তোরাঁয় ক্যাবারে ডান্সের রীতি ছিল। বলা ভালো মূল আকর্ষণ। কিন্তু সেখানে গ্রাহক হতেন হয় সাহেব-সুবোর দল নয় তো কেতাদুরস্ত উচ্চবিত্ত বাঙালিজন। ফলে তাদের বিনোদনে যে নৃত্যশিল্পী অর্থাৎ ক্যাবারে ডান্সাররা ছিলেন তাঁরা সবাই প্রায় বিদেশি, নয় তো কিছু রেড ইন্ডিয়ান। মোটমাট কথা শেতাঙ্গ। সেখানে অতি সাধারণ এক বাঙালি মেয়ে দেশের প্রথম ক্যাবারে ডান্সার হয়ে গেল! একই লিডো রুমে বাকি শেতাঙ্গ মেয়েদের সাথে নাচছে এই ঘটনাটাই তখন একটা মস্ত বোমা। তায় আবার পৌঁছে গেল সেই পেশার তুঙ্গে, অর্থ আর খ্যাতির প্যারাডাইসে। চিত্রনাট্য মনে হচ্ছে তো? এই সাফল্য থেকে বিচ্যুতিও কম নাটকীয় না। গ্রিক ট্রাজেডি, নেমেসিস।
যা-ই হয়ে যাক রোজগার করতে হবে। এমনি এমনি মরে যেতে নারাজ বাঙাল একরোখা মেয়েটা। প্রথমে এক রেড ইন্ডিয়ান গৃহস্থের বাড়িতে পরিচারিকার কাজে ঢোকেন। কিন্তু পেরে ওঠেন না। প্রাণের দায়ে আর নাচের নেশায় প্রায় অপরিচিত ভিভিয়ানের হাত ধরে সেখান থেকে পালান। মোকাম্বো হোটেলের লিড সিঙ্গার ভিভিয়ানই আরতিকে রাতের কলকাতা চিনিয়েছিল। তখন আরতি বারোর কিশোরী। পরনে ধার করা শাড়ি-ব্লাউজ, ধার করা হিল তোলা জুতো পরে মেয়েটা সেদিন এঁকেবেঁকে হেঁটে গিয়েছিল ওবেরয় গ্রান্ডের প্রাসাদপ্রমাণ গেটের সামনে; ঢোকার সাহস পায়নি। তখন কি সে জানত একদিন সে-ই হবে ‘প্রিন্সেস’ অফ ওবেরয় গ্রান্ড। কলকাতার রাতের রানি।
কিন্তু পথ, সে যে বড়োই নির্মম। যতই তুমি হাড়-মাস খাটুনি খেটে, জীবনের চরম অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়ে, সাফল্যে পৌঁছাও না কেন, সব কিছু একনিমেষে ফিকে হয়ে যায় যখন তোমার লিঙ্গ নয় ‘পুরুষ’। কিন্তু আরতি ওসবে পাত্তা দেননি, দিলে হারিয়ে যেতেন। তাই যখন লালবাজারের পুলিশ ঠোঁটের কোনে শ্লেষ উগড়ে বলে, “বাঙালির মেয়ে হয়ে হোটেলে নাচবে!” তখন আরতির সপাটে জবাব “ক্যান আপনে আমারে খাওয়াইবেন? রাখবেন আপনার বাড়িতে? ঝি হইয়া থাকুম না, মেয়ের মতো রাখতে অইব। তাইলে আমি হোটেলে নাচুম না।” দয়ায় নয়, বাঁচার অধিকারে বাঁচতে চেয়েছিল আরতি। বাংলাদেশ থেকে আসা, রিফিউজি ক্যাম্পে বড়ো হওয়া আরতির বয়স যখন এককের শেষ ঘরে তখনও খালি পায়ে হাঁটাই তাঁর দস্তুর। দু-বছরেই সব বদলে গেল। আরব্য রজনীর গল্পের মতো এসে পড়ল চকচকে পালিশ করা কাঠের ডান্স ফ্লোরে। প্রথম শোয়ের দিন; অন্যের ব্যবহৃত নোংরা অন্তর্বাস আর প্রায় সর্বাঙ্গ উন্মুক্ত জামা তাঁর চোখ ফেটে জল এনেছিল। আরতি তখনও জানেন না ক্যাবারে কী? শুধু জানেন তিনি নাচতে ভালোবাসেন, বাঁচতে ভালোবাসেন। আর তার জন্য তিনি সব করতে পারেন। শুরু হল ট্রেনিং। রাত দুটোয় ঘুমোতে গিয়ে আবার সকাল সাতটায় ক্লান্তিহীন পায়ে ফ্লোরে চলে এসেছেন। কী অদম্য জেদ ওই একরত্তি মেয়ের। ফিরপোজে তখন সর্বকনিষ্ঠা তিনি, বহুবার শেতাঙ্গ সহকর্মীদের বিষনজরে পড়েন। একদিন দেখেন শোয়ের আগে তাঁর কস্টিউমে ফালা ফালা করে ব্লেড চালানো। টিকে থাকার লড়াই রিফিউজিরা জানে। জানে কীভাবে মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হয়। তাই তো গোটা ট্র্যুপ একদিন অরু বলতে পাগল হয়েছে, দেখনদারিতে নয় আত্মীয়তায়। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি আরতিকে। মিস শেফালি নামটা তাঁর ফিরপোজ থেকেই পাওয়া।
লিডো রুম, ফিরপোজ, ওবেরয় গ্রান্ড, বিশ্বের নানা প্রান্তের নানার ঘরানার নাচ, তা নিয়ে পড়াশোনা, হাঁটা-চলা-বলা-খানা-পিনা সব কায়দাকানুনই অমানুষিক পরিশ্রমে শিখে নিয়েছিলেন শেফালি। কার সাধ্যি তখন তাঁর দিকে কেউ ‘দিশি’ বলে বাঁকা চোখে তাকায়!
ভুল বললাম। তাকিয়েছিল, বাঁকা নজরেই তাকিয়েছিল। তথাকথিত প্রগতিশীলতার জিম্মা কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো সমাজ সংস্কারকের দল এবং তাদের মাথারা রীতিমতো সংস্রব এড়িয়ে চলত শেফালির। সময়টা সত্তরের দশক। অভিনেতা তরুণ কুমার এসে একেবারে হাতে ধরে অনুরোধ করেন, থিয়েটারে কাজ করার জন্য। সে সময় বিশ্বরূপা থিয়েটার হলের ম্যানেজার ও ডিরেক্টর রাসবিহারী বসুর ব্যাবসায় মন্দা চলছে। পরপর তিনটি হাই বাজেট, সুপার কাস্ট পালা চলল না। তাই ক্যাবারে নাচ ব্যবহার করে বন্ধুর ব্যাবসা যদি বাঁচানো যায়; সেই অভিলাষে তরুণ কুমার দ্বারস্থ হলেন শেফালির। সে সময় মিস শেফালিকে একবার দেখার জন্য মানুষ পাগল। একথা নাট্য-বান্ধবদ্বয় ভালোই জানতেন। আর জানতেন শেফালি তাঁর বুড়োদার(পড়ুন তরুণ কুমার) কথা ফেলতে পারবেন না। শেফালির শিল্পচর্চা একেবারে শুরুর দিন থেকেই ইউরোপীয় ধ্যানধারণা কেন্দ্রিক। তিনি নিজেই বলেছেন—“যে চেহারা এত যত্ন নিয়ে তৈরি করেছিলাম, সেটা দেখাতে আপত্তি থাকবে কেন! এ নিয়ে খামোখা লজ্জা পাওয়ারই বা কী আছে! নাচতে নেমে ঘোমটা টানলে ঘোমটার ইজ্জত থাকে না, নাচটাও ভালো হয় না।” কিন্তু বাঙালি সাধারণ দর্শক কিংবা বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে তাঁর কোনো ধারণাই ছিল না। ভেবেছিলেন শিল্পী মানেই প্রগতিশীল। সে যে মাধ্যমেরই হোক-না-কেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, দিনের পর দিন নাচের ফ্লোরে তাঁর হাড়ভাঙা খাটুনির, বর্ণবিদ্বেষের শিকার হয়েও মাটি কামড়ে পড়ে থাকার লড়াইটাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তাদের বস্তুবাদী-মুক্তিকামী মাথা কেবল উন্মুক্ত ঊরু আর শরীরের ভঁজেই শুচিবাইগ্রস্ত হয়ে আটকে থাকবে। সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে অভিনয় করার পরেও রায় কোম্পানির স্নেহভাজনরা নাক সিটকে এড়িয়ে গেছেন। তকমা দিয়েছেন ‘বিষকন্যা’। সবাই আবার তেমন ছিলেন না। উত্তম কুমার, গৌরী দেবী, সুচিত্রা সেন, অমিতাভ বচ্চন শেফালির কদর করে গেছেন বরাবর। তবে তা সিন্ধু মাঝে বিন্দুতুল্য।
শেফালির বাবা কোনোদিনই তাঁর ক্যাবারে ডান্সারের পেশা মেনে নেননি, যদিও মাটির মতো নরম মায়ের হাত তাঁর মাথার উপর ছিল, তবে তা খুব সন্তর্পণে। সংসার ও ছোটো ভাইয়ের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েও পারিবারিক হতে পারেননি। একটা অলিখিত ‘না’ সব সময়ই শেফালি আর তাঁর পরিবারের মধ্যে থেকে গেছে। যদিও সে-সময়ে এ ঘটনা অবশ্যম্ভাবী বাস্তব, কেবল সেসময় কেন এখনও তার ব্যতিক্রম কিছু দেখা যায় কি? যদিও সেসব নিয়ে অল্প অভিমান বই আর কিছুই ছিল না শেফালির। কিন্তু এশিয়ার প্রথম ক্যাবারে কুইনকে ওই লাল বই পড়া লোকগুলো বাজারি, অশ্লীল, অপসংস্কৃতি, বিপ্লবের পরিপন্থী বলে দাগিয়ে দেবে; শেফালি শুধুমাত্র হয়ে থাকবে বাংলা থিয়েটারে বক্স অফিস হিট করার ‘মোক্ষম চাল’ বা হাজার রজনী শোয়ের মুনাফা তৈরির কল দেওয়া পুতুল, এ তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই আস্তে আস্তে নির্বাসন নিলেন। প্রাসাদ ছেড়ে ঠাঁই নিলেন ছোট্ট পায়রার খোপে। একসময় থিয়েটারে শেফালিকে দেখতে মফস্সল থেকে বাস ভাড়া করে লোক আসত। বলতে দ্বিধা নেই শেফালির শিল্পকে বোঝার মতো গুণমুগ্ধ দর্শক যেমন ছিলেন, তেমনি তাকে গোগ্রাসে গেলার লোকেরও অভাব ছিল না। আর এই তালিকায় শহরের পরিশীলিত সমাজ অগ্রগণ্য।
মোকাম্বো, ব্লু ফক্সের দামি রেস্তোরাঁর বিলে যার সই ছিল শেষ কথা। কখনও কেউ ধার চাইলে টাকা গুনে দেননি; সেই মিস শেফালি শেষ বয়সে এসে হাজার বার গুনেও হিসেব মেলাতে পারেননি। কাজ চলে যাওয়ার পর জীবন কাটিয়েছেন সবার চোখের আড়ালে৷ তবে কী পড়ে রইল তাঁর শিল্পী জীবনের সঞ্চয়? যে দর্শকদের তিনি এতগুলো বছর ধরে রক্ত জলের বিনিময়ে বিনোদন দিয়ে গেলেন তারা কি জানে তাঁর শেষ দিনগুলোর ঠিকানা কোথায় ছিল?
শ্রী শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অনুলিখন থেকে আমাদের প্রতি শেফালির কিছু প্রশ্ন তুলে ধরছি; দেখুন তো উত্তর আছে কি না!—
“এত লোক চেনে-জানে, কেউ ডেকে একটা ‘পার্ট’ দেয় না। একটা কাকিমা, পিসিমার ছোটো রোলও কি করতে পারতাম না?”
“তোমার কী মনে হয়, আমি ঠিক করেছিলাম?”
“আমার সম্পর্কে কী বুঝলে?”
নটী বিনোদিনী, কেয়া চক্রবর্তী বা মিস শেফালির কোনো গডফাদার ছিল না। সম্ভবত দরকারও ছিল না।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।


