তারাশঙ্করের উত্তরাধিকার বহন করে বীরভূমের নাট্যভুবন আজও সজীব। এই প্রবন্ধ তুলে ধরে আঞ্চলিক মাটি, লোকসংস্কৃতি, সমাজবাস্তবতা ও নতুন ভাবনার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা নাট্যধারা ও জেলার নাট্যচর্চার এক সমৃদ্ধ, বহুমাত্রিক ইতিহাস। ‘জেলার সাহিত্য’ প্রকল্পে এই মাসের নির্বাচিত জেলাগুলি হল বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া। আজ প্রকাশিত হল বীরভূমের নাট্যকার মলয় ঘোষের প্রবন্ধ।
প্রথমে কবিতা প্রকাশিত হলেও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম আত্মপ্রকাশ করতে চেয়েছিলেন নাটকের মাধ্যমেই। সে-রচনা গৃহীত না হলেও, পরে নাটককার হিসেবে তারাশঙ্কর বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছিলেন, একথা আমাদের সকলের জানা। যদিও বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘এন একর অব গ্রিন গ্রাস’ গ্রন্থে তারাশঙ্করকে ‘রিজিওন্যাল নভেলিস্ট’ বলেছেন, কিন্তু তবুও বাংলা নাটকের সীমায় তারাশঙ্কর আপন মহিমায় তথাকথিত ‘আঞ্চলিকতা’র বেড়া টপকে ‘সামগ্রিকতা’য় উজ্জল হয়েই আছেন অবিসংবাদিতভাবেই। গ্রামবাংলার পরিবেশ আর সেখানকার মানুষের জটিল মনন সমৃদ্ধ গল্প দিয়ে চমকে দেওয়ার মতো সব নাটক বুনেছিলেন তারাশঙ্কর, যা গৃহীত হয়েছিল সারস্বত সমাজে। পেশাদারি রঙ্গমঞ্চে জনপ্রিয় সেসব নাটক বীরভূমের নাট্যচর্চায়ও কিছু কিছু প্রভাব ফেলেছিল বই-কি। সেই প্রভাবের রেশ কতটা ছড়িয়েছিল বীরভূমে সেদিকে কিঞ্চিৎ অগ্রসর হওয়া যেতে পারে দুর্বল পায়ে। আর সেই পদচারণার ফলশ্রুতিই হল তারাশঙ্কর পরবর্তী বীরভূমের নাটককারদের নাট্যচর্চার বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা। আলো অবশ্য খুব একটা তীব্র হবে না, কিঞ্চিৎ মৃদুই হবে, কারণ আলো যিনি জ্বালাবেন তার অসমর্থতা ও অসহায়তা...। তারাশঙ্করের প্রয়াণ ঘটে ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। বীরভূমের অনেকেই তাঁর সময়ে এবং তার পরবর্তী সময়ে নাট্যরচনা করেছেন এবং করছেন, একথা বলা বাহুল্য। কিন্তু নাট্যরচনায় তাঁর সমকক্ষ কেউ হয়ে উঠতে পারেননি সেভাবে। নাট্যরচনায় তারাশঙ্কর যে উচ্চতাকে স্পর্শ করতে পেরেছিলেন, তাকে ছোঁয়া এখনও পর্যন্ত প্রায় দুঃসাধ্যই হয়ে রয়েছে এ জেলার নাটককারদের কাছে। তবে রচনা সৌকর্য্যে ও বৈচিত্র্যে বীরভূমের অনেকেই নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছেন নাটক রচনার ক্ষেত্রে এও সবিশেষ উল্লেখ্য। তারাশঙ্করকে অনুসরণ করে, বা তাঁর রচনা থেকে নাটক লেখার কাজ এখনও সমান গতিতে চলেছে এ জেলায়, অন্য নাটক লেখার কাজও বন্ধ হয়নি পাশাপাশি। এ লেখায় তারাশঙ্কর পরবর্তী বীরভূমের নাটককারদের নাটক নিয়ে সেই আলোচনারই প্রয়াস রাখছি কিঞ্চিৎ।
প্রথমেই বীরভূমের তারাশঙ্কর পরবর্তী নাটককারদের আমি কয়েকটি ভাগে ভাগ করে নিতে পারি আলোচনার সুবিধার্থে। যেমন—প্রথমত, যাঁরা শুধু নাটক লেখেন, কিন্তু অভিনয় করার দিকে ততটা আগ্রহী নন, বা নাট্যদল সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও বিশেষ মনোযোগী নন অর্থাৎ যাঁরা নাটককার হিসেবেই নিজেদের প্রকাশ করতে চান মাত্র। দ্বিতীয়ত, যাঁরা নাটক লেখেন, অভিনয় করেন আবার অন্য অনেক নাট্যদলকেও তাঁদের নাটক অভিনয় করতে দেন অর্থাৎ অভিনেতা, নির্দেশক ও নাটককার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতেই এঁরা আগ্রহী। তৃতীয়ত, যাঁরা শুধু নিজেদের দলের প্রযোজনার জন্যই মূলত কলম ধরেন, অর্থাৎ দলের কথা ভেবে দলের উপযোগী করে নাটক লিখে থাকেন। অন্যান্য নাট্যদলের জন্য এঁরা নাটক লেখেন না। এঁরা নাটককার হিসেবে নিজেদের প্রকাশে ততখানি আগ্রহী নন, যতখানি আগ্রহী নির্দেশক ও নির্মাতা হিসেবে নিজেদের প্রকাশে।
প্রথম বিভাগের নাটককারদের বিষয়ে আসি প্রথম। ষাটের দশকের শেষ দিকে অর্থাৎ তারাশঙ্করের সম সময়ে দুবরাজপুরের অনুপম দত্ত নাটক লিখতে শুরু করলেও তাঁকে বীরভূমের তারাশঙ্কর পরবর্তী নাটককারদের মধ্যে প্রধান বলে স্বীকার করে নেওয়া যায় অনায়াসে। অনুপম দত্ত মূলত একজন সাহিত্যিক, যিনি গুণে ও মানে অনন্য। কিন্তু নাটকের প্রতি তাঁর আলাদা দুর্বলতা ছিল, অনেকটা তারাশঙ্করের মতোই। বেতার ও মঞ্চের জন্য অনেক নাটক লিখেছেন তিনি। তাঁর ‘দ্বাদশ ভক্তা চাড়ুম’ ‘সুন্দরমে’র ‘পার্থপ্রতিম সম্মান’ লাভ করে ১৯৯৮ সালে। নাট্যক্ষেত্রে এই সম্মান যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয় বাংলায়। ‘দ্বাদশ ভক্তা চাডুম’ নাটকটি মূলত ‘ধর্মমঙ্গল’ কাহিনির উপর নির্ভর করে রচনা। এ নাটকে ‘ধর্মমঙ্গল’ কাহিনির ভিতরকে ছুঁয়ে ফেলার চেষ্টা করেছেন অনুপম। ‘ধর্মমঙ্গলে’র বাইরের যে গল্পের আকার তাকে নিরাকারে পরিণত করে আপন মানস-পাত্রের উপযোগী করতে সমর্থ হন অনুপম। ফলত, অন্তজ শ্রেণির অধিকারের কথাই যেন মুখ্য হয়ে উঠেছে এ নাটকে। সে সময়ে আলোড়ন ফেলা দেওয়া এ নাটক ‘আনন’ ও ‘ভিক্টর জারা, গণনাট্য’ সফলভাবে মঞ্চস্থ করে বিভিন্ন জায়গায়। ‘আনন’ একটিই প্রদর্শন করে এ নাটকের, ‘ভিক্টর জারা’ অনেকগুলি মঞ্চায়ন ঘটায় নাটকটির। এ ছাড়া তাঁর ‘বরফে ঢাকা মানুষ’, ‘আজব বুড়োর গজব কথা’, ‘হাঁস নিয়ে খেলা’, ‘বীপ্রতিপে বাতাস’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য নাটক। তাঁর প্রকাশিত নাট্যগ্রন্থের নাম ‘তিনটি পূর্ণাঙ্গ নাটক’। অনুপমের নাটক বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে রচিত। ‘নায়কের সন্ধানে’, ‘জলপরি’, ‘যাদুকরের মঞ্চ’, ‘এক আজব কুঁজোর গজব কথা’, ‘আর এক তোতা কাহিনী’, ‘পারের হাওয়া’, ‘পালা রে পালা রে পাখি’, ‘পাখির আকাশ’, ‘এই পৃথিবী’, ‘শিব ঠাকুরের আপন দেশে’, ‘বাছারা বাছারা আমার’। আশির দশকে কলকাতা ও শিলিগুড়ি আকাশবাণী থেকে তাঁর অনেক নাটক একাধিকবার সম্প্রচারিত হয়। এর মধ্যে ‘স্মৃতি ফলক’, ‘খোলা জানলা’ (ও হেনরি’র অনুবাদ), ‘মৃত্যুহীন প্রাণ’ (গ্রেগর জোহান মেণ্ডলের জীবনী), ‘প্রতিধ্বনি ফিরছে’, ‘তথাপি মানুষ’, ‘নক্ষত্রের চোখ’, ‘গৃহস্বামী খেলার ছলে’ ইত্যাদি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। অনুপম দত্ত তাঁর নতুন নাটক ‘লবুগুরু পাহাড়ের দুরাং দুরাং গান’ মঞ্চায়নের কথা ভাবেন এখনও। বেশ কতকগুলি নাট্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে অনুপমের।
সিউড়ির ডাঃ জগন্ময় ব্যানার্জী পেশায় বেশ নামকরা ডাক্তার হলেও পরের দিকে নাট্য ও সংস্কৃতিচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। ঐতিহাসিক ও পৌরানিক নানা বিষয় নিয়ে জগন্ময় নাটক লিখেছেন। শ্রী অরবিন্দের রচনা থেকে তিনি ‘সাবিত্রী’, ‘কারাকাহিনী’র নাট্যরূপ দেন। ‘অম্বা’, ‘রূপমতি’, ‘রাণী রাসমণি’, ‘সারা বার্ণহার্ড’, ‘রূপমতি’, ‘দন্ততীর্থ’ ইত্যাদি নাটকগুলি মঞ্চস্থ হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। বীরভূমে সবথেকে বেশি সংখ্যক নাটক লেখার কৃতিত্ব ডাঃ জগন্ময় ব্যনার্জীর। তাঁর প্রায় শতাধিক নাটক গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে এরই মধ্যে। নাটক ছাড়াও গল্প, উপন্যাস, কবিতা এবং সংগীত রচনা করেছেন তিনি অজস্র। এত বিষয়ে এত নাটক বীরভূমের আর কোনো নাটককার লেখার সুযোগ পাননি সেভাবে। নিজে অভিনয়ও করতেন। হঠাৎ প্রয়াণে তাঁর অনেক নাটক অসমাপ্ত রয়ে গেল।
শান্তিনিকেতনের অসীম চট্টরাজ বিভিন্ন ধরনের নাটক লিখেছেন বহুকাল ধরে। তাঁর লেখা নাটক ‘সাহিত্যিকা’ সহ এ রাজ্যের বিভিন্ন নাট্যদল অভিনয় করেছে, আজও করছে। তাঁর লেখা ‘ইতিহাসের আত্মা’ ‘বহুরূপী’ নাট্যদল অভিনয় করেছে এক সময়। ‘বহুরূপী’ সহ অনেক সুখ্যাত নাট্যপত্রে তাঁর লেখা অনেক নাটক প্রকাশিতও হয়েছে সুনামের সঙ্গে এবং সেই ধারা এখনও বহমান। ‘অথ কৃষ্ণকথা’, ‘নিমকেতু’, ‘অন্দরমহল’, ‘বিশ্বনাথের আজব কল’, ‘নগর মঙ্গল’, ‘ধ্বংসস্তূপে বৃষ্টি’, ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ ইত্যাদি তাঁর লেখা উল্লেখ্য কিছু নাটক। অত্যন্ত পরিণত রচনাশৈলী ও বিভিন্ন বিষয়কে নিয়ে গভীর অনুসন্ধানী হয়ে ওঠাই অসীমের নাটকের বৈশিষ্ট্য। তাঁর ‘অথ কৃষ্ণকথা’ নাটক মহাভারতের প্রেক্ষিতে গোটা বিশ্বের অস্ত্রমুখী হওয়াকে এমনভাবে প্রকাশ করে যা অনন্য। রবীন্দ্রনাথের ‘যোগাযোগে’র নাট্যরূপ দেন অসীম এক সময়। ইতিহাসের সন্ধানে অগ্রসর হওয়া এই নাট্যকার এই মুহূর্তে বীরভূমের নাটককারদের মধ্যে অগ্রগণ্য গুণে, মানে এবং রচনাসৌকর্য্যে। অসীম নিজে একজন সুঅভিনেতাও। দীর্ঘকাল ‘সাহিত্যিকা’য় তিনি অভিনয় করেছেন নানা নাটকে।
আনন্দগোপাল গরাই পাঁড়ই থানার প্রসাদপুর গ্রামে বসে নাটক লেখার কাজ করছেন অনেক কাল ধরে। যাত্রা ও নাটক নিয়ে প্রায় চব্বিশটি বই লিখেছেন তিনি। অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষকের ‘সবুজ প্রাণের সন্ধানে মেঘের ফাঁকে আলোর রেখা’ শীর্ষক গ্রন্থটিতে দুটি নাটক রয়েছে। সমাজসচেতনতামূলক গ্রামীণ পটভূমির উপর লেখা তাঁর যাত্রা নাটক অনেক জায়গায় অভিনীত হয়েছে।
রামপুরহাটের অপূর্বকুমার দাসের লেখা নাটক মঞ্চস্থ করেছে অনেক নাট্যদল ও অনেক বিদ্যালয়। নিজের স্কুলে নাট্যদল তৈরি করে নাটকের বিস্তার ঘটানোর ক্ষেত্রে অপূর্ব একটি বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। নাটকগুলি কিশোরদের জন্য লেখা। ছোটদের নিয়ে ‘ত্রয়ী’, ‘আরো ত্রয়ী’, ‘অন্য ত্রয়ী’, ‘রবীন্দ্র ত্রয়ী’, ‘উপেন্দ্র ত্রয়ী’, ‘বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রয়ী’ নামে বেশ কয়েকটি নাটকের বই প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানচেতনার বিস্তারের একটা শৈল্পিক মাত্রা দেখা যায় অপূর্বর নাটকে। ‘শীর্ষবিন্দু’, ‘গোধূলির অস্তরাগ’ নাটকদুটি মৌলিক এবং অন্য ধারার নাটক। ছোটোদের জন্য লেখা নাটককে বড়োদের উপযুক্ত করে তোলায় অপূর্বর জুড়ি মেলা ভার। রবীন্দ্রনাথ থেকে রূপান্তরিত তাঁর নাটক ‘বিদূষক’ বিভিন্ন জায়গায় মঞ্চস্থ হয়েছে, পুরস্কৃতও হয়েছে নানা জায়গায়।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
সুব্রত নাগ সাম্প্রতিক সময়ে বীরভূমের একজন বিশেষভাবে উল্লেখ্য নাটককার। অপূর্ব সংলাপ এবং নিটোল গল্প সুব্রতর নাটকের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। তাঁর লেখা ‘নহন্যতে’ নাটকটি ‘সুন্দরমে’র ‘পার্থপ্রতিম স্মারক সম্মানে’ সম্মানিত। মানুষ ও ভূতের অপূর্ব এক সংশ্লেষ এ নাটকে চিত্রিত হয়েছে। রায়গঞ্জে ‘বিবেকানন্দ নাট্যচক্রে’র নাট্য প্রতিযোগিতাতেও সুব্রত নাগের ‘আমার বন্ধু অমল’ নাটকটি প্রথম স্থান পায়। এ ছাড়াও তাঁর লেখা ‘খাই খাই’, ‘রানার’, ‘কর্ণ এখন’, ‘টুকলি’, ‘সবার উপরে’, ‘স্বপ্ন এন্টারপ্রাইজ’, ‘ইভারেস্ট’ ইত্যাদি নাটকগুলি বিভিন্ন নাট্যদলের প্রযোজনায় মঞ্চস্থ হচ্ছে নানা মঞ্চে। প্রত্যেকটি নাটকই বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যে অনন্য। তবে প্রধানত কৌতুক রসের ধারাকে সপ্রাণে বইয়ে দিয়ে নিজের নাটকের অভিমুখ স্থির করে দেন সুব্রত। ‘আত্মজ’ সহ রাজ্যের বেশ কিছু নাট্যদল তাঁর নাটক অভিনয় করে সগৌরবে।
ছড়াকার অতনু বর্মন বেশ কিছু নাটক লিখেছেন। কিছু নাট্যদল তাঁর লেখা নাটক অভিনয়ও করেছে। তাঁর লেখা ‘কহেন কবি কালিদাস’ কিছুটা ‘মুষ্টিযোগে’র আদলে লেখা, যা ‘আনন’ অভিনয় করে। ছড়া লিখে বিপ্লব এনে দেবার অবিশ্বাস্য বিষয়টি এ নাটকে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে অসাধারণভাবে অতনুর অতুলনীয় দক্ষতায়। অতনুর ‘অরূপকথা’ বহুরূপী সম্প্রদায়ের যাপন নিয়ে লেখা, আর ‘নাসিরুনি মোল্লা’ ও ‘বনেদি কাঙাল’, ‘আলোর পথযাত্রী’ জীবনীনির্ভর নাটক। এ নাটকগুলি বীরভূমের ‘আত্মজ’ ও ‘বক্রেশ্বর আড্ডাটোরিয়াম’, ‘আখর’ সাফল্যের সঙ্গে অভিনয় করে। অতনুর নাটকের ধারায় গল্প মূল হয়ে ওঠে না সেভাবে, মূল হয়ে ওঠে তাঁর সংলাপ আর নির্মাণ।
ছড়াকার আশিস মুখার্জীও নাটকের জগতে আছেন নিজস্ব ধারায়। ছোটোদের নিয়ে তাঁর লেখা নাটক বেশ নাড়া দেয় ছোটো-বড়ো সকলেকেই। বেশ কিছু নাট্যদল অভিনয়ও করেছে তাঁর নাটক। তাঁর ‘শূন্য পেল সরস্বতী’ ও ‘হাসির লড়াই’ বেশ জনপ্রিয় নাটক। মূলত খুব আলতো করে গল্পের আড়ালে এক অন্য বার্তা দেবার প্রচেষ্টাই আশিসের নাটক লেখার মূলকথা।
খুব অল্প নাটক লিখেও বেশ আলোড়ন তুলেছেন বীরভূমের নাট্যমহলে এমন বেশ কিছু নাটককার আছেন বীরভূমে। সত্যেন্দু মুখার্জীর ‘কবি’, ‘পংখে’ খুব আলোড়িত নাটক। তারাশঙ্করের রচনা থেকে নাটকদুটি নির্মিত। অর্ণব মজুমদারের ‘রঙ্গলাল’ এরকমই একটি নাটক, যা ‘অতুলশিব ক্লাব’ মঞ্চস্থ করে আলোড়ন ফেলে দেয় নাট্যমহলে। জীবনকৃষ্ণ সরকারের লেখা ‘আমরা বাউল’, ‘ভাদু রাজার বিটি’, ‘রাক্ষসরাজ’, ‘টহলদার’ ইত্যাদি নাটকগুলি নানা ধরনের বিষয়বৈচিত্র্যে ভরা। হেমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘মধ্যবর্তিনী’, অগ্রদানী’, ‘তিল থেকে তাল’ ইত্যাদি কিছু নাটকও সার্থক হয়ে উঠেছে রচনার গুণে।
এবার আসি দ্বিতীয় বিভাগে অর্থাৎ নাটককার, নির্দেশক ও অভিনেতাদের বিষয়ে। সুবিনয় দাস এই তালিকায় প্রথমেই আসবেন। তিনি মূলত সামাজিক সমস্যা ও দরিদ্র মানুষের অন্তরাত্মা নিয়ে নাটক লিখেছেন প্রচুর। তাঁর ‘ঢোলিয়া’ ‘গ্রুপ থিয়েটার’ প্রদত্ত ‘কালীপ্রসাদ স্মারক সম্মানে’ (২০০৪) সম্মানিত এবং আলোড়িত একটি নাটক। ‘ড্রামা আকাদেমি অব ইন্ডিয়া’ (কলকাতা) তাঁকে ১৯৯৪ সালে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করে। ছত্তিশগড়ী ভাষা ও পরিবেশ নিয়ে সুবিনয় বেশ কিছু নাটক লিখেছেন। ‘দেওতা দুশমন’, ‘ঢোলিয়া’, ‘বংশী বাইগার অভিষেক’ ইত্যাদি তাঁর এই আঙ্গিকে লেখা নাটক। অন্ত্যজ শ্রেণির উপর উচ্চ জাতির অত্যাচারের কাহিনিই এইসব নাটকের বিষয়বস্তু। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক নানা অভিঘাতও তাঁর লেখায় প্রতিভাত হয়েছে। তাঁর লেখা নাটকগুলি হল ‘মোড়ল তুমার ভুট নাই’, ‘লোক আদালতে ছিদেম বাউরি’, ‘বারগেনিং’, ‘ধনপতির উপাখ্যান’, ‘রাজার পৃথিবী’, ‘রাতের চেয়েও অন্ধকার’ ইত্যাদি। সুবিনয় দাসের নাটকের সাধারণ সারল্যের কারণেই রাজ্যের বহু নাট্যদল সুবিনয় দাসের বহু নাটক বহু কাল ধরে অভিনয় করে আসছে। বহু পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নাটক। ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নাট্যগ্রন্থ ‘নির্বাচিত দশ একাঙ্ক’। তারপর থেকে পরপর প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নাট্যগ্রন্থ ‘নির্বাচিত এক ডজন’, নির্বাচিত কুড়ি’, ‘স্বামী বিবেকানন্দ’, ‘এবার একুশ’ ইত্যাদি।
সাঁইথিয়ার বিজয়কুমার দাস কবিতা, প্রবন্ধের সঙ্গে নাটক লিখেছেন বেশ কিছু। খুব সহজ সরলভাবে লেখা তাঁর নাটকগুলিতে সম সময়ের নানা বিষয় দেখা যায়। ফাল্গুনী ভট্টাচার্যের ‘মধু গায়েন, সাকিন রতনপুর’ উপন্যাস নিয়ে বিজয় দাস লেখেন লোকসংস্কৃতিমূলক নাটক ‘ভাদুকথা’। এ ছাড়া বিপ্লবীদের নিয়ে লেখা তাঁর ‘অগ্নিযুগের সূর্য’, ‘ওদের মৃত্যু নেই’ এবং সামাজিক নানা অবক্ষয় নিয়ে ‘আর এক নিরুপমা’, ‘আর এক যতীনের গল্প’ নাটকগুলিও জনপ্রিয় হয়েছে জেলায়। তাঁর লেখা ‘যতীনের গল্প’ নাটক গড়িয়ার ‘রিকশা চালক নাট্য সমিতি’ অভিনয় করেছে তাঁদের জীবনের কথা আছে বলে। তারাশঙ্করের রচনা থেকে ‘খাজাঞ্চিবাবু’ নাটক লিখেছেন তিনি। অভিনেতা ও নির্দেশক বিজয়কুমার দাসের ‘অনুনাটক শ্রুতিনাটক’ বলে একটি নাটকের বই প্রকাশিত হয়েছে ২০২২ সালে।
পার্থপ্রদীপ সিংহ দীর্ঘকাল ধরে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নানা রচনা থেকে নাট্যরূপ দিয়ে নানা নাটক নির্মাণ করেছেন। তাঁর নাট্যরূপান্তরের মূল ধারাই হল মূলের অভিসারী হয়ে থাকা। লাভপুরের জল-হাওয়ায় বাস করার সুবাদে এবং তারাশঙ্করের সান্নিধ্যধন্য বিশিষ্টদের সঙ্গে আলাপচারিতার সুযোগে পার্থ তারাশঙ্করের রচনার অভিমুখকে সার্থকভাবে নির্ধারণ করে তা আত্মস্থ করতে সমর্থ হয়েছেন অতুলনীয়ভাবে। ফলত, তাঁর লেখা নাটকে তারাশঙ্কর যেন জীবন্ত হয়ে ওঠেন অন্য এক মাত্রায়। গল্প ও উপন্যাসে তারাশঙ্কর যেসব সংলাপ ব্যবহার করেছেন তাঁর চরিত্রগুলির মুখে অনেক ক্ষেত্রেই হুবহু সেই সংলাপ তাঁর রূপান্তরিত নাটকেও আমরা দেখি একইভাবে। অনেক নাট্যদল তাঁর লেখা নাটক মঞ্চস্থ করেছে। শুধুমাত্র তারাশঙ্করের লেখা দশটি গল্প থেকে দশটি নাটক লিখে তিনি প্রকাশ করেছেন একটি নাট্যগ্রন্থ ‘দশ গল্পে দশ নাটক’। বিভিন্ন পত্রে তাঁর লেখা নাটক প্রকাশিতও হয়েছে সুনামের সঙ্গে। তাঁর লেখা উল্লেখ্য কিছু নাটক হল ‘হারানো সুর’, ‘ডাকহরকরা’, ‘বেদেনী’, ‘বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা’, ‘কালিন্দী’, ‘কামধেনু’, ‘বাউল’, ‘স্থলপদ্ম’, ‘জটায়ু’, ‘প্রতীক্ষা’, ‘রাধারাণী’, ‘গার্ড সাহেব’, ‘রাধা’ ইত্যাদি। এ ছাড়া ‘উত্তরণ’, ‘সুরক্ষা’, ‘জল’, ‘একটি গাছ একটি প্রাণ’ ইত্যাদি অন্য কিছু নাটকও লিখেছেন পার্থ।
জুলফিকার জিন্না এ সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ নাটককার। তাঁর লেখা নাটকের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ের ছবিই প্রকট হয় বেশি। জিন্নার নাটকে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা এবং সরাসরি প্রতিবাদের বৈশিষ্ট্যই বেশি পরিলক্ষিত হয়। এই প্রতিবাদ জিন্না নানা দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর নাটকে হাজির করেন। ‘ওহি ফালতু কিস্সা’ নাটকে জিন্না যেভাবে সরাসরি প্রতিবাদ করেছেন তা সচরাচর দেখা যায় না। সরকারী কর্মচারীদের মহার্ঘ্যভাতার বিষয়টিও তিনি এনেছেন তাঁর নাটকে। তাঁর ‘শাড়ি’ নাটকে নারীদের উপর অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন তিনি। তাঁর ‘নির্বাচিত সংবাদ’, ‘হায় ধর্ম’, ‘শিক্ষা বা হত্যার গল্প’ ইত্যাদি নাটকে সাম্প্রতিকতার সঙ্গে অনাদি অতীতের মেলবন্ধন ঘটিয়ে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন তিনি। জিন্নার ভাষা-আন্দোলনের নাটক ‘চর্যাপদের কবি’ কলকাতার ‘ভূমিসূত’ নাট্যদল সাফল্যের সঙ্গে মঞ্চস্থ করেছে। এ ছাড়াও তাঁর ‘উড়াল বাওয়ের নাও’ ইত্যাদি নাটক অন্যান্য নাট্যদল মঞ্চস্থ করে। তাঁর নাট্য সংকলন ‘নয় নাটক’ প্রকাশিত হয়েছে এই ২০২২ সালে। বেশ কিছু নাট্যপত্রে তাঁর লেখা নাটকও প্রকাশিত হয়েছে। ‘অশ্বমেধের ঘোড়া’ নাটকের জন্য জিন্না ২০২৫ সালে থিয়েটার ওয়ার্কশপ প্রদত্ত সত্যেন মিত্র পুরস্কারে সম্মানিত হলেন।
দুবরাজপুরের দীপক দত্তের লেখা ‘ভদ্রেশ্বরী’ নাটকটি বেশ কিছু মঞ্চে অভিনীত হয়েছে সুনামের সঙ্গে। তাঁর লেখা ‘সাত কাহন’ নাটকটি প্রকাশিত হল ২০২২ সালের বইমেলায়।
এই প্রবন্ধ লেখকের লেখা বেশ কিছু নাটক (‘পাশফেল’, ‘সে এক আজব গপ্পো’, ‘এক স্বপ্নওয়ালা’ ইত্যাদি) বিভিন্ন নাট্যদল ও কলেজ-স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা অভিনয় করেছে বিভিন্ন সময়ে, বেশ কিছু নাটক প্রকাশিতও হয়েছে বিভিন্ন নাট্যপত্রে। এই প্রবন্ধকারের লেখা ‘কবিকথা’ নাটকটি ২০১৬ সালে এবং ‘পঞ্চরসের পাঁচালি’ নাটকটি ২০২৪ সালে ‘সুন্দরম’ প্রদত্ত ‘পার্থপ্রতিম স্মারক সম্মানে’ সম্মানিত হয়েছে। বাংলার পুরোনো কবিগান ও পঞ্চরস নিয়ে বিশেষ পরীক্ষামূলকভাবে নাটকদুটি লেখা হয়েছে। এ ছাড়া ‘এক স্বপ্নওয়ালা’ রায়গঞ্জ ‘বিবেকানন্দ নাট্যচক্রে’র নাট্যরচনা প্রতিযোগিতায় এবং ‘বিদ্যে বোঝাই বাবু’ হাবড়া ‘মিলন তীর্থে’র ‘সারা বাংলা নাট্যরচনা’ প্রতিযোগিতায় পুরস্কৃত হয়েছে। এই প্রবন্ধকারের উল্লেখ্য কিছু নাটক হল ‘হৃদয়পুর কত দূর’, ‘মানব-জমিন’, ‘লাশ’, ‘পাশাপাশি ঠাসাঠাসি’, ‘মরণ রে’, ‘এক যে ছিল ভূত’ ইত্যাদি। ডাঃ জগন্ময় ব্যানার্জীর ৮০টি নাটকের পর্যালোচনা করে এই প্রাবন্ধিক লিখেছেন নাট্য আলোচনা-গ্রন্থ ‘জগন্ময়ের নাট্যভুবন’। এই প্রবন্ধকারের নাটকের মূল বৈশিষ্ট্যই হল সাধারণ ঘটনাকে সামনে রেখে আরও গভীর কোনো দিকের কথাকে প্রকাশের চেষ্টা করা। নিটোল একটি সাধারণ গল্পে সাধারণ মানুষের মুখের কথাকে সংলাপে তুলে এনে হাসির ভিতর দিয়ে খুব বড়ো কোনো সাম্প্রতিকতাকে স্পর্শ করাতেই এই প্রবন্ধ লেখকের অভিনিবেশ।
এবার তৃতীয় বিভাগ, অর্থাৎ দলের প্রযোজনার জন্য নাটক লেখার বিভাগ। তবে একথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে এঁদের নাটক নিজেদের দল ছাড়া অন্য দল কম অভিনয় করেছে বলে এঁদের নাটক বাকিদের চেয়ে কম কিছু। বরং অনেক ক্ষেত্রেই পেশাদারি নাটককারদের সঙ্গে রীতিমত পাল্লা দেবার সক্ষমতায় সার্থকভাবে উত্তীর্ণ এঁদের অনেকের নাটক। লাভপুরের মহাদেব দত্ত বেশ কিছু নাট্যরূপান্তর করেছেন তারাশঙ্করের রচনা থেকে। এগুলি মূলত ‘অতুলশিব ক্লাবে’র প্রযোজনায় অভিনয় করার অভিপ্রায়েই লেখা। মহাদেব দত্তের রূপান্তরে ‘ধাত্রীদেবতা’, ‘শিবনাথ’, ‘হাঁসুলীবাঁকের উপকথা’ ইত্যাদি নাটক অনবদ্য। মহাদেব দত্তের নাট্যরূপান্তরের সার্থকতা এখানেই তিনি তারাশঙ্করের মূল রচনা থেকে কখনও বিচ্যুত হন না। তাঁর নাটক দেখার সুবাদে এ কথা অনুভব করেছি, তারাশঙ্কর যেন স্বয়ং উঠে আসতেন মঞ্চে। বিদ্যাসাগরের জীবনী আশ্রিত একটি নাটক তিনি বিদ্যাসাগরের দ্বিশত জন্মবার্ষিকীতে রচনা করেছেন। সে-নাটকটিও বেশ সুন্দর হলেও, তেমন প্রচার ও প্রসার পেল না সেভাবে।
রজকুমার সাহা অভিনয় ও নাট্যনির্দেশক হিসেবেই সুপরিচিত হলেও বেশ কিছু ভালো নাটক তিনি রচনা করেছেন। সামাজিক নানা সমস্যার কথা নিয়ে তাঁর লেখা ‘তিনি’, ‘দাহ’, ‘একটু আশ্রয়’ ইত্যাদি নাটকগুলি দর্শককে আলোড়িত করেছে বার বার। স্বপন রায় মূলত নাট্যপত্র সম্পাদনা, অভিনয় ও নাট্যসংগঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করলেও নাটক লিখেছেন কিছু। তাঁর সম্পাদিত ‘সুদিনের লেগে’ অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল ‘আননে’র প্রযোজনায়। এ ছাড়া ‘মহেশ’ গল্পকে নাটকে রূপান্তরিত করেছেন তিনি সার্থকভাবে।
দুবরাজপুরের মধুসূদন কুণ্ডু যিনি বাপি কুণ্ডু নামে অধিক পরিচিত তিনিও কিছু নাটক লিখেছেন। মূলত একজন দক্ষ অভিনেতা হিসেবে পরিচিত মধু তাঁর নিজের দলের নানা প্রয়োজনে বেশ কিছু ভালো নাটক রচনা করেছেন। তাঁর লেখা নাটকগুলির মধ্যে উল্লেখ্য কিছু নাটক হল ‘মুখোস’, ‘মুখোসের আড়ালে মুখ’, ‘আসছে রাঙা দিনগুলি’, ‘বিজ্ঞাপন’ ইত্যাদি। বামপন্থী মানসিকতায় বিশ্বাসী মধুসূদনের নাটকে রাজনৈতিক সচেতনতা ও দরিদ্র মানুষের চিত্রই প্রকট হয়েছে যথার্থভাবে। পরিবেশ নিয়ে তাঁর লেখা ‘পরিবেশ এক’ বেশ জনপ্রিয় হয়েছে স্কুল কলেজ সহ নাট্যমহলে।
প্রিয়ব্রত প্রামানিকের লেখা ‘সন্দীপন পাঠশালা’, ‘পাঠশালা’, ‘গোবিন্দপুরের কড়চা’, ‘ফসিল’, ‘চক্রব্যূহ’, ‘অসমমেরু’ ইত্যাদি নাটকগুলি নানা রচনা থেকে নাট্যে রূপান্তরিত। প্রিয়ব্রতর লেখার সহজ ও স্বাভাবিকতা আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে অনায়াসে। তাঁর সংলাপ ও বুনন নাটকগুলিকে বিশিষ্টতা দিয়েছে।
বিশিষ্ট অভিনেতা ও নির্দেশক দেবাশিস দত্তের লেখা ‘চেতনকথা’, ‘মঞ্চনামা’ ইত্যাদি নাটকগুলি বর্তমান নাটকের নানা সমস্যা ও তার সমাধানের কথা বলে অন্য ধরনে। সন্দীপন দত্তের লেখা ‘দহন’, ‘ছুটকি’, ‘সহজ ডাকাত’, ‘স্বপ্নকালো’ ইত্যাদি নাটকগুলি মূলত তাঁর নিজস্ব দল ‘নাট্যতীর্থে’র জন্য লেখা। একটা গল্পের ভিতর দিয়ে একটা জীবনধারাকে ধরার চেষ্টাই তাঁর সব নাটকে দেখা যায়। আর এই জীবনধারার মধ্যে সমাজ থাকে নিঃশব্দে।
আহমদপুরের আর এক নাটককার উৎপল দাসের লেখা ‘তৃষ্ণা’, ‘একটু মানিয়ে নিন’, ‘রক্তের ফুলকি’ ইত্যাদি নাটকগুলি সম সময়কে প্রতিভাত করে। শুভব্রত রায়চৌধুরীর লেখা ‘অন্ধকার থেকে বলছি’, ‘ব্যাক গিয়ার’, ‘তিমির রাত্রি’, ‘মাস্টারমশাই’ ইত্যাদি নাটকগুলি এই সময়ের প্রেক্ষিতে নানা সমস্যাকে তীব্রভাবে আঘাত করে। উজ্জল মুখার্জীর লেখা ‘নজর’, ‘বোগলো বায়েন’, ‘উত্তেষ্ঠিত জাগ্রত’, ‘ধর্মমঙ্গল’, ‘নাগিন কন্যার কাহিনি’, ‘রসকলি’, ‘আখড়াইয়ের দীঘি’ ইত্যাদি নাটকগুলি সাফল্যের সঙ্গে মঞ্চে অভিনীত হয়েছে তাঁর নির্মাণে। তারাশঙ্কর, লোকসংস্কৃতি এবং মঙ্গলকাব্য—এই তিন ধারাতে পুষ্ট উজ্জলের নাট্যভাণ্ডার। এর মধ্যে ‘ধর্মমঙ্গল’ তাঁর আলোড়িত নাটক, অনুপম দত্তের পরে তিনিই ধর্মমঙ্গল নিয়ে এমন কাজ করে দেখালেন এ জেলায়।
সত্যজিৎ দাসের লেখা ‘হুকুম’, ‘আলোয় ফেরা’, ‘ফল’ ইত্যাদি নাটক সমাজসেচতনতাকে আশ্রয় করে লেখা। নাটকগুলির মঞ্চাভিনয় হয়েছে বেশ কিছু। নির্মল হাজরার লেখা ‘শিরস্ত্রাণ’, ‘এসো নির্মল করো’, ‘ভারী যন্ত্রণা’ ইত্যাদি নাটকগুলিও নানা সচেতনতাকে প্রকট করে অন্য এক মাত্রায়। অনির্বাণ ঘোষের লেখা ‘অনুভবে বিনোদিনী’, ‘কিংবদন্তী’, ‘বিবেক প্রণাম’ ইত্যাদি নাটক বিভিন্ন জায়গায় মঞ্চস্থ হয়েছে সার্থকতার সঙ্গে। সুব্রত ঘটকের লেখা ‘বোলান ফিরবে’, ‘দহন কাঁটা’, ‘শিকড়’, ‘জয়া’ ইত্যাদি নাটকগুলি তাঁর নির্দেশনায় অভিনীত হয়েছে রাজ্যের নানা স্থানে। মূলত গ্রামজীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত আর লোকসংস্কৃতির নানা বিষয়কে নাটকে তুলে আনার দিকে মনোনিবেশ করেছেন সুব্রত। গল্প বা সংলাপের চেয়ে বিশেষ কিছু বলতে চাওয়ার দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন সুব্রত। মৃনালজিৎ গোস্বামীর লেখা ‘রত্ন’, ‘ডাক্তারসাব’, ‘বাঙালিবাবু’, ‘আই এম বিজি’ ইত্যাদি নাটকগুলি সাম্প্রতিক নানা বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। পান্না বেগমের লেখা বেশ কিছু নাটক তাঁর দল চেতনা অভিনয় করেছে। ‘নাট্যাঞ্জনা’ নাট্যদলের প্রতিষ্ঠাতা অঞ্জনা পণ্ডিত বেশ কিছু নাটক লিখেছেন। ‘ফিরে চাওয়া’ এবং ‘ভালো-মন্দের দিশারী’ নামে তাঁর একটি নাট্যপুস্তকও প্রকাশিত হয়েছে ২০১৯ সালে। তার আগে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর আর একটি নাট্যপুস্তক ‘ডাইনি’। ২০১৮ সালে তারাশঙ্করের জন্মদিনে ‘চয়নিকা’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে দশজন নাটককারের লেখা তারাশঙ্করের রচনার নাট্যরূপ ‘দশদিগন্ত’। এই সংকলনে নতুন পুরোনো অনেক নাটককারের লেখা নাটক প্রকাশিত হয়েছে।
মুকুল সিদ্দিকীর উদ্যোগে ‘দুই বাংলার নাট্য সংকলন’ নামে একটি নাট্য সংকলন নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে বীরভূমের সিউড়ি থেকে। বীরভূমের অনেক নাটককারের নাটক প্রকাশিত হচ্ছে এ পত্রে।
বীরভূমের বেশ কিছু নাটককার তারাশঙ্করের পরে অনেকটা প্রায় তাঁরই মতো ভাবে ভঙ্গিমায় নাটক লিখে চলেছেন দলের প্রয়োজনে, অন্য দলের প্রয়োজনে বা আপন নেশায়। এই ধারা চলছে, চলবেও। হয়তো কারও কারও কথা এ লেখায় অনিচ্ছাকৃত অক্ষমতায় বাদ পড়ে যেতে পারে। তবে একথা সত্যি সার্থক নাটক লেখার ক্ষেত্রে সব সময়ই সাফল্য দেখা যাচ্ছে না। এখন তো আর আগুনে নাট্যাহুতি দেওয়ার পরিস্থিতি নেই, সে পরিবেশও নেই। নাটক লিখে বই প্রকাশ করা যায় আর্থিক সামর্থ্য থাকলেই, আবার একটু চেষ্টা করলেই জেলার নাট্যদল অভিনয়ও করে দেয় পাকা লোকের কাঁচা নাটক। অনেক নির্দেশকের হাতে যেহেতু নাট্যদল রয়েছে তাই তিনি ছাইপাশ লিখে ফেলেন সেই জোরে। তা অভিনীতও হয়। সহজে দ্রুত আলোড়ন সৃষ্টির জন্য অনেকেই নাটক-রচনার বিষয়ে তেমন না জেনেই নানা কৌশল অবলম্বন করছেন। তার মধ্যে একটি হল, মহাকাব্য থেকে কিছু তুলে এনে ছেড়ে দেওয়া, বা এমন কিছু লিখে ফেলা যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হবে...।
তাই মনে হয় অনেক নাটক শুধু লেখার জন্যই লেখা হচ্ছে এখন, নাটকের জন্য নাটক হয়ে উঠছে না। কিন্তু আমরা আশাবাদী নিশ্চয় এভাবেই ‘লেখার জন্য লেখা’ নাটক থেকেই ‘নাটকের জন্য নাটক’ উঠে আসবে একদিন। ‘শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে...’।
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।