preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
‘আ মরি বাংলা ভাষা’কে নতুন করে চেনাবে ‘জ্যাজ় সিটি’
রিভিউ

‘আ মরি বাংলা ভাষা’কে নতুন করে চেনাবে ‘জ্যাজ় সিটি’

‘জ্যাজ় সিটি’ বাংলা ভাষা, ইতিহাস ও পরিচয়ের এক বিস্তৃত ক্যানভাস—কলকাতা থেকে পূর্ব পাকিস্তান, রাজনীতি থেকে ব্যক্তিগত টানাপোড়েন। শক্তিশালী অভিনয় ও আবহে উজ্জ্বল হলেও দীর্ঘতা ও জটিলতায় কোথাও শিথিল হয়েছে গতি, তবু বাঙালির অদেখা অতীতকে নতুনভাবে চিনিয়ে দেয় সিরিজ়টি। লিখলেন স্বাতী চট্টোপাধ্যায় ভৌমিক।

‘বাংলা... আজানে, গানে, রক্তে, নিশ্বাসে, কেউ দাবায়া রাখতে পারবা না’। প্রথম এপিসোডের প্রথম সংলাপ। একটামাত্র বাক্যে পরবর্তী দশ এপিসোডের দীর্ঘ সিরিজের সুর বেঁধে দেয়। এ গল্প বাঙালির, বাংলার। পূর্ব বাংলা, যা একসময় ছিল পূর্ব পাকিস্তান। ওপার বাংলার সেই না বলা গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে পরিচালক সৌমিক সেনের প্রায় দশ ঘণ্টার ওয়েব সিরিজ় ‘জ্যাজ় সিটি’ (Jazz City)। অভিনয় করেছেন আরিফিন শুভ, সৌরসেনি মৈত্র, শতাফ ফিগার, শান্তনু ঘটক, অনিরুদ্ধ গুপ্ত, তানিকা বসু, শ্রেয়া ভট্টাচার্য।

গল্প কি শুধু ওপার বাংলার? এপারের নয়? সেদিনের পূর্ব পাকিস্তান আর আজকের বাংলাদেশ, এই দুই ভূখণ্ড এক হলেও চরিত্রে, মননে, কাঠিন্যে একরকম ছিল না। হয়তো একরকম ছিল না কলকাতাও। সেই কলকাতা থেকে শুরু হয় সিরিজ়ের কাহিনি।

১৯৬৯ সাল। পার্ক স্ট্রিটের ঝাঁ চকচকে হোটেল জ্যাজ় সিটি। বিশাল মাপের রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন সন্ধ্যায় বসে বিলিতি গানের মজলিশ। গান গায় প্যামেলা (আলেকজান্দ্রা টেলর), সঙ্গে বাজে পিয়ানো এবং অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র। আশেপাশের আসন ভরিয়ে রাখে কলকাতার ওপর মহলের স্বনামধন্য এবং সম্মাননীয় অতিথিরা। এই গোটা হোটেল রেস্তোরাঁর ভার মালিকপক্ষ একজনের হাতেই সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছে। তিনি ম্যানেজার জিমি রায় (আরিফিন শুভ)। আসল নাম যামিনী রায়। তবে কলকাতার অত্যাধুনিক ক্লাব কালচারে জিমি নামটাই পরিচিত। সকলেই জানে জিমি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য পারে না এমন কাজ নেই। তুখোড় স্মার্ট, বাংলা, ইংরেজি হিন্দিতে সমান স্বচ্ছন্দ, কথাবার্তায় চৌকশ, সুদর্শন ও বুদ্ধিমান জিমি এই হোটেলের মুখ এবং গর্বও। সেই জিমিকে বিপদে ফেলতে আচমকা ডিসেম্বর শেষের রাতে তার হোটেলের লিকার লাইসেন্স ক্যানসেল করে দেয় এক্সাইজ অফিসার সিনহা (শান্তনু)। পরে আবার নিজেই তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে সিনহা এমন এক শর্ত দেয় যা একমাত্র জিমির পক্ষেই করা সম্ভব। কলকাতার এক বিত্তবান বনেদি বাড়ির অধিকারে রয়েছে গঙ্গাপাড়ের এক বিশেষ জমি। সে-জমির মালিকানা চাই। জিমির আকর্ষণ শীলার (সৌরসেনী) প্রতি। সেই শীলা যে বাংলাদেশি উদ্‌বাস্তু হয়েও নিজের জোরে জায়গা করে নিয়েছে বাঙালি উচ্চকোটি সমাজে। এইভাবে ক্রমশ এগিয়ে চলে গল্প। কখনও গল্প পিছিয়ে যায় স্বাধীনতার সময়, উঠে আসে অতীতের কথা। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের আগের অস্থির সময় থেকে নিয়ে নির্বাচন উত্তর সময়ে পাকিস্তান সেনা কর্তৃক বাঙালিদের ওপর প্রবল অত্যাচার ও ধরপাকড়কে গল্পের আকারে তুলে ধরা হয়েছে সিরিজে। বলা বাহুল্য এত বিশদে এর আগে এই কাহিনি কোনো সিনেমা সিরিজে উঠে আসেনি। সেটা অবশ্যই এই সিরিজের প্রাপ্তি। এরই মধ্যে এগিয়ে চলে জিমি, শীলা, সিনহা, মাইকেল (অনিরুদ্ধ গুপ্ত), রাম বাহাদুরদের (সায়নদীপ সেনগুপ্ত) গল্প।

দেশভাগের দগদগে ঘা শুকানোর আগেই পশ্চিম পাকিস্তানের দাদাগিরি এবং বেড়ে চলা অত্যাচার ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠছিল ওপারের বাঙালিদের কাছে। শাসকদের পক্ষেও এই ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল। একে মূল পাকিস্তান থেকে দূরত্ব তার ওপর একটা সম্পূর্ণ আলাদা ভাষাভাষী, আলাদা সংস্কৃতির মানুষকে শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে একই আচার ব্যবহারে বাধ্য করা অসম্ভব ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ছেড়ে দেওয়ার বান্দা ছিলেন না। সিরিজের চরিত্র জেনারেল হানিফের (শতাফ) মতো মূর্তিমান দানব এবং তার অনুচর কুখ্যাত খানসেনা দিয়ে পায়ের তলায় পিষে মারতে চেয়েছিলেন গোটা দেশের অবাধ্য বাঙালিকে। এই বিস্তারিত ঘটনাক্রম নিয়ে রিসার্চ এবং এত দীর্ঘ সিরিজ় বহু মানুষের যন্ত্রণার স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে বাধ্য। পরিচালক সৌমিক সেনের সাহসের তারিফ করতে হয়, বাঙালির আত্মার অন্তস্তলে থেকে যাওয়া পুরোনো স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য। এর আগে সৌমিক পরিচালিত ‘জুবিলি’ ওয়েব সিরিজ়ে পুরোনো দিনের চিত্রপট উঠে এসেছিল চমৎকারভাবে। এখানেও তার অন্যথা হয়নি। ১৯৭০ এর আশেপাশের সময়ের কলকাতা ও পূর্ব পাকিস্তান যে চিত্রকল্পের মাধ্যমে সামনে এসেছে তা প্রশংসনীয়। আলোর ব্যবহার, সেটসজ্জা সবই সময়োপযোগী এবং নস্টালজিয়া তৈরি করতে সক্ষম। হোটেলের আবহ, সংগীত এবং বিভিন্ন চরিত্রে অভিনেতাদের দক্ষতাও মনে রাখার মতো। তবে এই সিরিজ়ের সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা এর দৈর্ঘ্য। কলকাতা ও ঢাকার মধ্যে ঘটে চলা কাহিনি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন বোঝাতে আর একটু কম সময় নেওয়া যেতে পারত। তাছাড়া জিমি ও শীলার কাহিনিতে শুধুমাত্র পারিপার্শ্বিক রাজনীতি যে এসেছে তেমন নয়। দেশের তৎকালীন পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখাতে গিয়ে গল্পের প্লট বেশ কিছু জায়গায় ঘেঁটে গিয়েছে। প্রায় দশঘণ্টা ধরে চলা একটা সিরিজ়ে প্লট টানটান না হলে ক্লান্তি আসতে বাধ্য। প্রচুর চরিত্রের আনাগোনাও কাহিনিকে কিছুটা শ্লথ ও জটিল করেছে। এ ছাড়াও তথ্যগত কিছু ভুল রয়েছে, যেমন গঙ্গার পাড়ের জমি থেকে সুড়ঙ্গ তৈরি করে কীভাবে খুলনায় গিয়ে ওঠা যেতে পারে, যেখানে খুলনা ও পশ্চিমবঙ্গকে আলাদা করেছে ইছামতি নদী। এই ভুলটা চোখে লাগার মতো।

তবে দৈর্ঘ্য যেমনই হোক, তৎকালীন বাংলাদেশের ভিত তৈরির ইতিহাস ভারী সুন্দরভাবে উঠে এসেছে সিরিজ়ে। এর সঙ্গে যোগ্য সংগত করেছেন অভিনেতারা। আরিফিন শুভ এই সিরিজের প্রাণ। তাঁর হাঁটাচলা কথা বলা সব কিছুই দর্শককে আটকে রাখতে সক্ষম হবে। জিমির চরিত্রে প্রাণ ঢেলে অভিনয় করেছেন তিনি। যেন তাঁর জন্যই এই চরিত্র তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে শান্ত, দৃঢ় এবং ব্যক্তিত্বময়ী শীলা চরিত্রে সৌরসেনী যথাযথ। তাঁর সংযত অভিনয় এই সিরিজ়ের সম্পদ। বিশেষভাবে উল্লেখ্য শান্তনুর সাদামাঠা সিনহা চরিত্রটি। শরীরী ভাষায় প্রশংসার দাবি রাখেন তিনি। অত্যাচারী আর্মির ভূমিকায় শতাফ যেমন ভয়ংকর, তেমনই মানানসই। গৌরী চরিত্রে শ্রেয়া একটিমাত্র এপিসোডে নিজের জাত চিনিয়েছেন। এ ছাড়াও যাদের নাম করতেই হয় তাঁদের তালিকাও কম লম্বা নয়। কাবেরীরূপে তানিকা, পুলিশ ইন্সপেক্টর অমিত সাহা, অনিরুদ্ধ, শংকর দেবনাথ, আলেকজান্দ্রা, সায়নদীপ, শাহির রাজ প্রত্যেকেই চরিত্র হয়ে উঠেছেন অনায়াসে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য মুজিবর রহমানের ভূমিকায় কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়। চেহারাগত সাদৃশ্য না থাকলেও মেকআপের সাহায্যে এবং শরীরী ভাষায় হুবহু যেন বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছেন তিনি। তবে লোকনাথ দে-র মতো দক্ষ অভিনেতাকে আর একটু কাজে লাগানো যেতে পারত। এতজন দক্ষ অভিনেতার মিলিত প্রচেষ্টায় যথার্থভাবেই উপভোগ্য হয়ে উঠেছে সিরিজ়টি। তা ছাড়া Sony Liv এর মতো সুখ্যাত প্ল্যাটফর্মের তরফে একটা গোটা বাংলা সিরিজ় উপহার পাওয়াও উপরি পাওনাই বলা যায়।

লেখক

স্কুল জীবন থেকে শখের লেখালেখিতে হাতেখড়ি। ২০১৭ সাল থেকে বিনোদন সাংবাদিকতা এবং সিনে সমালোচনার সূচনা।নেশা উপন্যাস লেখা। থ্রিলার ছবি একটু বেশি পছন্দের। উত্তমকুমার আর শাহরুখ খানের অন্ধ ভক্ত। পাহাড় আর ঘুম সমান প্রিয়।

অন্যান্য লেখা