মাতৃভাষা কেবল আবেগ নয়, মানুষের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। শিলচর থেকে সোয়েটো, মানভূম থেকে কুর্দিস্তান—ভাষার অধিকারের লড়াই প্রমাণ করে, ভাষাকে দমিয়ে রাখা মানে জাতিসত্তাকে আঘাত করা। আজও উচ্চশিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সেই সংগ্রাম অব্যাহত।
শুরুটা হোক এক ছোট্ট প্রশ্ন দিয়ে। যে ভাষায় আপনি স্বপ্ন দেখেন, যে ভাষায় আপনার প্রথম কান্না, প্রথম হাসি, প্রথম ভালোবাসা—সেই ভাষাকে যদি কেড়ে নেওয়া হয়, তখন কী হারাবেন আপনি? একটি শব্দভাণ্ডার? একটি ব্যাকরণ? না কি নিজেকেই হারাবেন? ভাষা কেবল মানুষের ভাব বিনিময়ের যান্ত্রিক বাহন নয়; এটি মানব মননের স্থপতি, সংস্কৃতির ধারক এবং একটি জাতির আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। মনোবিজ্ঞান ও ভাষাবিজ্ঞানের নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, মানুষের চিন্তন প্রক্রিয়া গভীরভাবে প্রভাবিত তার মাতৃভাষার ওপর। জটিল তত্ত্ব অনুধাবন, বিশ্লেষণমূলক চিন্তা এবং সৃজনশীলতার অবাধ বিকাশের জন্য মাতৃভাষায় দক্ষতা অপরিহার্য। যখন কোনো ব্যক্তিকে তার মাতৃভাষার বদলে অন্য কোনো বিদেশি ভাষায় চিন্তা করতে বা শিক্ষা গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়, তখন তার চিন্তার সাবলীলতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ভাষান্তর প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্ক যে পরিমাণ শক্তি ব্যয় করে, তাতে মৌলিক চিন্তার পরিসর সংকুচিত হয়ে আসে। তাই মাতৃভাষার গুরুত্ব কেবল আবেগিক বা রাজনৈতিক নয়, এটি মানুষের বৌদ্ধিক উৎকর্ষের প্রধান ও প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক শর্ত। এই লড়াই শুধু আমাদের নয়—বিশ্বজুড়ে মানুষ তাদের ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে, প্রাণ দিয়েছে। কেন? কারণ ভাষা কেড়ে নেওয়া মানে একটি জাতির আত্মাকে হত্যা করা।
মাতৃভাষার এই মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্বমূলক গুরুত্ব অনুধাবন করেই যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ নিজেদের ভাষার অধিকার রক্ষায় রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের কথা আমাদের সকলেরই জানা। কিন্তু মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের ইতিহাস কেবল সেখানেই থমকে থাকেনি। ১৯৬১ সালের ১৯শে মে ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকায়, শিলচরে মাতৃভাষা বাংলার অধিকার রক্ষায় পুলিশের গুলিতে এগারো জন শহিদ হন। সেদিন সকালে শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহ শুরু হয়েছিল শিলচর রেলস্টেশনে। প্রায় দশ থেকে বিশ হাজার বাংলাভাষী মানুষ জড়ো হয়েছিলেন আসাম সরকারের সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে, যেখানে বলা হয়েছিল বাংলাভাষী অধ্যুষিত অঞ্চলেও অসমিয়াকেই একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হবে। বিকেল আড়াইটা নাগাদ আসাম পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায় নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর। সেদিন শহিদ হন কানাইলাল নিয়োগী, চন্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কমলা ভট্টাচার্য, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর এবং সুকমল পুরকায়স্থ। এই আত্মত্যাগের ফলেই বাংলা ভাষা বরাক উপত্যকায় সরকারি স্বীকৃতি পায়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন বিহারের মানভূম জেলায় বাংলাভাষীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধে। প্রশাসনিক স্তরে হিন্দিকে প্রাধান্য দেওয়ার নীতির বিরুদ্ধে তারা সংগঠিত আন্দোলনে নামে। স্কুলশিক্ষা ও সরকারি কাজে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবিতে প্রতিবাদ, গণস্বাক্ষর, সভা সমাবেশ চলতে থাকে কয়েক বছর ধরে। এই ভাষা আন্দোলনের ফলেই ১৯৫৬ সালের States Reorganisation Act–এর ভিত্তিতে জেলা বিভক্ত হয়। ১৯৫৬ সালের রাজ্য পুনর্গঠনের সময় মানভূম জেলার বাংলাভাষী অংশ পশ্চিমবঙ্গে যুক্ত হয় এবং গড়ে ওঠে পুরুলিয়া জেলা। ভাষাগত পরিচয়ের প্রশ্নে এটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাফল্য।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
এই ভাষিক প্রতিরোধের আগুন শুধু ভারতীয় উপমহাদেশেই নয়, ছড়িয়ে পড়েছিল দূর আফ্রিকাতেও। ১৯৭৬ সালের ১৬ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার সোয়েটোতে হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গ স্কুলপড়ুয়া রাস্তায় নামে। তাদের ওপর ‘আফ্রিকান্স’ ভাষাকে বাধ্যতামূলক শিক্ষামাধ্যম হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ জানায়। ১৯৭৪ সালে জারি করা এক আইনে বলা হয়, কৃষ্ণাঙ্গ স্কুলগুলোতে অর্ধেক বিষয় আফ্রিকান্সে পড়াতে হবে। কিন্তু আফ্রিকান্স ছিল শ্বেতাঙ্গ শাসকগোষ্ঠীর ভাষা, ‘দমনকারীর ভাষা’। সেদিন শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ অশ্রুগ্যাস ও গুলি চালায়। প্রথম শহিদ হন মাত্র বারো (কিছু সূত্রে ১৩) বছরের হেক্টর পিটারসন। সরকারি হিসেবে ১৭৬ জন নিহত হলেও প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়। সোয়েটো বিদ্রোহ পরবর্তীকালে বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হয়ে ওঠে এবং ভাষা যে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হতে পারে, তা বিশ্ববাসী নতুন করে দেখল।
মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলেও একই ধরনের সংগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে চলছে। কুর্দি জনগোষ্ঠী, যারা তুরস্ক, ইরাক, সিরিয়া ও ইরানে ছড়িয়ে রয়েছে, নিজেদের মাতৃভাষায় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকারের দাবিতে বহু দশক ধরে আন্দোলন করে আসছে। Human Rights Watch-এর একটি রিপোর্টে দেখা গেছে যে তুরস্কে কুর্দি ভাষা-সংক্রান্ত কার্যক্রম, যেমন ভাষা শেখানো বা সাংস্কৃতিক কাজকর্ম, প্রায়ই ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর সঙ্গে সংযুক্ত করে দেখা হচ্ছে এবং এর ফলে কুর্দি ভাষার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কাজগুলোর ওপর আইনি ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি হচ্ছে। তবুও ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে কুর্দি ভাষা প্রশাসনিক মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু অন্যত্র ভাষা ব্যবহারে নানা বিধিনিষেধ ও সীমাবদ্ধতা এখনও রয়ে গেছে। ফলে মাতৃভাষায় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির দাবি তাদের রাজনৈতিক সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। মানভূম থেকে সোয়েটো, বাংলাদেশ কিংবা কুর্দিস্তান—ভৌগোলিক দূরত্ব যতই হোক, অভিজ্ঞতার সুর এক। ভাষাকে অস্বীকার করা মানে মানুষের আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করা। আর সেই অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে স্বাভাবিকভাবেই। আর সব ক্ষেত্রেই একটি সহজ সমীকরণ দেখতে পাওয়া যায়: শাসকের চাপিয়ে দেওয়া ভাষার বিরুদ্ধে সাধারণের প্রতিবাদ। আসলে মাতৃভাষা চিন্তা করার হাতিয়ার, তাই সম্ভবত শাসকের এই ভাষা নিয়ে এত ভয়। কারণ ভাষাকে কবজা করতে পারা মানে পুরো একটি জাতিকে হাতে নিয়ে আসা। তাই সব শাসকের সহজ লক্ষ্য ভাষা। তাই এত আক্রমণ, এত রক্তপাত।
এত রক্তপাত এবং আত্মবলিদানের পরেও অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, উচ্চশিক্ষার আঙিনায় মাতৃভাষা আজও চরম অবহেলিত। এই প্রসঙ্গ আসলেই মনে পড়ে আমার সেই ভাইটির কথা যে আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিল—“দাদা, আমাদের ইউনিভার্সিটিতে বাংলাতে নোট পাওয়া যাবে না?” সে আজ নেই। প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার কিছুটা স্বীকৃত হলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞান, কারিগরি শিক্ষা, আইন ও বিজ্ঞানের উচ্চতর গবেষণায় ইংরেজি ভাষার একচেটিয়া আধিপত্য আজও এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পরিভাষার নিয়মিত ও প্রমিত বাংলা রূপান্তরের অভাব এবং আন্তর্জাতিক মানের রেফারেন্স বইয়ের মাতৃভাষায় অনুবাদের দৈন্যদশা এর অন্যতম কারণ। তবে সবচেয়ে বড়ো বাধা হল আমাদের মজ্জাগত ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি। সামাজিকভাবে আজও এমন একটি ভ্রান্ত ধারণা আমাদের মনে প্রোথিত রয়েছে যে, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা মানেই তা মেধার চূড়ান্ত পরিচায়ক। ফলত আমরা ধরে নিয়েছি মাতৃভাষায় শিক্ষিতরা কর্মক্ষেত্রে ও বিশ্বমঞ্চে পিছিয়ে পড়বে। এই হীনম্মন্যতাবোধ উচ্চশিক্ষায় মাতৃভাষার প্রসারের পথে সবচেয়ে বড়ো মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রেখেছে।
এবারে আসি আরেক জটিল সমস্যাতে। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে বাংলাসহ একাধিক মাতৃভাষা আজ এক দ্বিমাত্রিক আগ্রাসনের শিকার। একদিকে রয়েছে বহিরাগত আগ্রাসন, যেখানে কর্পোরেট দুনিয়া ও প্রযুক্তিগত বাজারের ভাষা হিসেবে ইংরেজির আধিপত্য এবং রাষ্ট্রিক কাঠামো ও বলিউড-কেন্দ্রিক জনপ্রিয় সংস্কৃতির দাপটে হিন্দি ভাষার বিস্তৃতি বাংলার নিজস্ব পরিসরকে ক্রমাগত সংকুচিত করছে। বাজারের এই প্রবল চাপে পড়ে প্রান্তিক মানুষজন নিজেদের মাতৃভাষাকে অর্থনৈতিকভাবে ‘অপ্রয়োজনীয়’ ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে, এর চেয়েও ভয়াবহ হল ভাষার অভ্যন্তরীণ আগ্রাসন। ‘প্রমিত বাংলা’ বা তথাকথিত ‘ভদ্রলোকের ভাষা’-র দাপটে বাংলার নিজস্ব সমৃদ্ধ প্রান্তিক ভাষা ও উপভাষাগুলো—যেমন রাজবংশী, কামরূপী, ঝাড়খণ্ডী (মানভূমিয়া), বঙ্গালী—মারাত্মকভাবে অবহেলিত ও কোণঠাসা। সাহিত্য, গণমাধ্যম এবং সংবাদপত্রে এই উপভাষাগুলোকে অনেক ক্ষেত্রেই ‘গ্রাম্য’, ‘অশিক্ষিতের ভাষা’ বা স্রেফ হাস্যরস সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এর ফলে এই উপভাষাগোষ্ঠীর মানুষজন এক ধরনের ভাষিক হীনম্মন্যতায় ভোগেন। অথচ, সাহিত্যের শিকড় বিচার করলে এই উপভাষাগুলোই হল যে-কোনো ভাষার সজীবতা ও প্রাণশক্তির মূল উৎস। প্রমিত ভাষার এই নীরব আধিপত্যবাদ পরোক্ষভাবে মাতৃভাষার অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্যকেই তিলে তিলে ধ্বংস করছে। মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা যেমন অন্যের মাতৃভাষাকে অসম্মান করতে শেখায় না, তেমনি তা উপভাষার প্রতি তাচ্ছিল্য করতেও শেখায় না। যিনি ‘শ’ কে ‘শ’ বলেন তিনি যেমন বাঙালি, যিনি ‘শ’ কে ‘স’ বলেন তিনিও বাঙালি।
শাসক কিন্তু নীরবে, সুকৌশলে সাধারণের মনে ভাষার প্রতি দূরত্ব তৈরি করছে। ভাষা ও সংস্কৃতির এই বিবর্তনে শিল্পমাধ্যমের, বিশেষত সিনেমা ও নাটকের এক সুগভীর এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্ণায়ক প্রভাব রয়েছে। সিনেমা শুধু সংলাপ বা শব্দের ব্যবহার শেখায় না, এটি তার নিজস্ব দৃশ্যকল্প ও বয়ানের মধ্য দিয়ে একটি গোটা সমাজের মনস্তত্ত্বকে বিনির্মাণ করে। একটি উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হবে। নব্বইয়ের দশকের শেষ এবং শূন্য দশকের শুরুর দিকের মূলধারার ভারতীয় বা বাংলা সিনেমার সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ছাঁচ বা প্যাটার্ন লক্ষ করা যায়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় ‘MLA ফাটাকেষ্ট’ (২০০৬), ‘Minister ফাটাকেষ্ট’ (২০০৭), তুলকালাম(২০০৭)-এর মতো সিনেমার কথা। এই সময়ের সিনেমাগুলোতে প্রায় অবধারিতভাবে রাজনৈতিক নেতা চরিত্রটিকে চূড়ান্ত দুর্নীতিগ্রস্ত, স্বার্থপর এবং সমাজের মূল খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হতে থাকে। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সিনেমার মতো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও জনপ্রিয় গণমাধ্যমে রাজনীতির এই একপেশে, খল ও নেতিবাচক চিত্রায়ণ সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে তৎকালীন উঠতি প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক সুগভীর ছাপ ফেলে। সিনেমার এই নিরবচ্ছিন্ন বয়ান তরুণ সমাজের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল করে দেয় যে, রাজনীতি মানেই কেবল অপরাধ ও নোংরামির জায়গা। এই নেতিবাচক ভাবমূর্তির কারণে ছাত্র ও যুব সমাজ ধীরে ধীরে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লড়াই এবং সক্রিয় রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যার ফলশ্রুতি হল আজকের যুবসমাজের একটি বড়ো অংশের চরম রাজনীতি-বিমুখতা। আজকের সমাজ যে অনেক ক্ষেত্রে বৃহত্তর রাষ্ট্রিক স্বার্থের প্রতি উদাসীন, তার বীজ রোপণ করা হয়েছিল সেই দশকের গণমাধ্যম ও সিনেমার মগজধোলাইয়ের মাধ্যমেই (যদিও বিষয়টিকে এতটা সরল বলছি না—যা যা কারণ আছে তার মধ্যে এটি একটি। বাকি বিষয় নাহয় অন্যদিন লিখব)। একটি দৃশ্যমাধ্যম কীভাবে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক বোধকে পঙ্গু করে দিতে পারে, এটি তার এক অকাট্য উদাহরণ। ঠিক একইভাবে সংলাপে আজকাল “আমি egg খাব”, “কেন কি আমার কাছে টাকা নেই”—এসব বাক্যের ব্যবহার নেহাত কাকতালীয় মানতে সমস্যা আছে।
পরিশেষে একথা অনস্বীকার্য যে, ভাষা কোনো স্থির, প্রাণহীন বিষয় নয়; এটি নদীর মতোই প্রবহমান। কিন্তু প্রবাহের অর্থ আত্মসমর্পণ নয়। মাতৃভাষার অধিকার কেবল ক্যালেন্ডারের একটি দিনের উদ্যাপন বা আবেগের স্লোগান হতে পারে না; এটি মানুষের জ্ঞানগত বিকাশ, সামাজিক সাম্য এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় রক্ষার এক নিরন্তর লড়াই। ইংরেজি বা হিন্দির মতো ভাষার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর পাশাপাশি, আমাদের নিজেদের ভেতরে থাকা ‘প্রমিত ভাষার’ অহংকারও চূর্ণ করতে হবে এবং প্রান্তিক উপভাষাগুলোকে পরম মমতায় বুকে টেনে নিতে হবে। একইসঙ্গে, শিল্পের ‘সমঝদার’ হিসেবে আমাদের আরও বেশি সচেতন ও সমালোচনামুখর হতে হবে।
শিলচরের সেই এগারো শহিদ, সোয়েটোর সেই কিশোর হেক্টর পিটারসন, ঢাকার বরকত-সালাম-রফিক-জব্বার—এঁরা শুধু ইতিহাসের পাতায় নাম নন। এঁরা আমাদের প্রতিদিনের সংগ্রামের অনুপ্রেরণা। যখনই আমরা আমাদের মাতৃভাষায় চিন্তা করি, লিখি, স্বপ্ন দেখি—তখনই আমরা তাঁদের আত্মত্যাগকে সার্থক করি। মাতৃভাষার এই লড়াই শেষ হয়নি। প্রতিদিন, প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি বাক্যে—এই লড়াই চলছে… এবং চলবে। কারণ ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ভাষা হল আমাদের অস্তিত্ব। আমাদের পরিচয়। আমাদের প্রতিরোধ।
তথ্যসূত্র:
১. “Bengali Language Movement (Barak Valley).” Editorialge.com, 19 May 2025. Silchar Language Martyrs Day: A Tribute to Forgotten Heroes.
২. “Language Movement in India - THE FORGOTTEN MOVEMENT OF 19 MAY, 1961, SILCHAR.” Sylheti Youth Welfare Association, 12 Oct. 2013.
৩. “States Reorganisation Act, 1956.” Gazette of India, Ministry of Law and Justice, Government of India, 31 Aug. 1956.
৪. “Soweto Uprising.” Britannica, britannica.com/event/Soweto-uprising. Accessed 18 Feb. 2026.
৫. “The 16 June 1976 Soweto students' uprising – as it happened.” South Africa Gateway, 27 Dec. 2024.
৬. “Soweto uprising.” South African History Online, sahistory.org.za/article/june-16-soweto-youth-uprising. 21 May 2013.
৭. Human Rights Watch. “Turkey: End Prosecutions Targeting Kurdish Language Activities.” Human Rights Watch, 20 Dec. 2024, https://www.hrw.org/news/2024/12/20/end-prosecutions-targeting-kurdish-language-activities-turkiye.
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।