preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
তিস্তার হাওয়ায় ভেসে থাকা সুরও সংগ্রাম: ভাওয়াইয়ার আকাশে সুনীতি রায়ের মাটির গান
প্রবন্ধ

তিস্তার হাওয়ায় ভেসে থাকা সুরও সংগ্রাম: ভাওয়াইয়ার আকাশে সুনীতি রায়ের মাটির গান

এই মাস থেকে কেতাব-ই ব্লগজিনে শুরু হল ‘জেলার সাহিত‍্য’ নামের এক বিশেষ আয়োজন। যার মূল উদ্দেশ্য পাঠককে বিভিন্ন জেলার নতুন ও পুরনো লেখকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন জেলার ভিন্ন স্বরকে একত্রিত করে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক রূপনির্মাণ। আমাদের প্রথম নির্বাচিত জেলাগুলি হল দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, এবং কোচবিহার। গোটা এপ্রিল মাস জুড়ে আমরা প্রকাশ করব এই পাঁচ জেলার সাহিত্য। আজ প্রকাশিত হল আলিপুরদুয়ার জেলার গল্পকার ও প্রাবন্ধিক উৎপল সরকার-এর প্রবন্ধ।

স্মৃতির ভেলায় চেপে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর, তিস্তা-ধরলা-করতোয়ার স্রোত, আর গরুর গাড়ির ধীর লয়ে চলার শব্দ—এই সমগ্র জীবনচিত্রের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে ভাওয়াইয়া গান। সেই ভাওয়াইয়ার ধারাকে আজও সজীব ও শ্রুতিমধুর করে তুলেছেন যে ক-জন শিল্পী, তাঁদের মধ্যে অন্যতম সুনীতি রায়। তিনি কেবল একজন গায়িকা নন; উত্তরবঙ্গের লোকঐতিহ্যের এক নিবেদিতপ্রাণ সাধিকা। জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি মাটির এই সুরকে ধরে রেখেছেন গভীর নিষ্ঠা ও ভালোবাসা দিয়ে।

ভাওয়াইয়া মূলত রংপুর ও কোচবিহার অঞ্চলে বিকশিত এক বিশেষ লোকসংগীতধারা। এই গানের সুরে যেমন আছে দীর্ঘ টান, তেমনি কথায় মিশে থাকে বিরহ, প্রেম, অপেক্ষা ও গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখ। নদীতীরবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রাম, প্রবাসী স্বামীর প্রতীক্ষায় থাকা স্ত্রীর আকুলতা কিংবা গাড়িয়ালের একাকিত্ব—সবই ভাওয়াইয়ার প্রাণ। সুনীতি রায় এই ঐতিহ্যবাহী ধারাকেই নিজের কণ্ঠে নতুন প্রাণ দিয়েছেন।

কোচ-রাজবংশী জনপদের জীবনচিত্র তাঁর গানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি রংপুর ও কোচবিহার অঞ্চলের প্রচলিত ভাওয়াইয়া এবং চটকা—উভয় ধারাতেই সমান দক্ষ। চটকা তুলনামূলকভাবে চঞ্চল ও প্রাণবন্ত; অন্যদিকে ভাওয়াইয়া সুরের টানে আবেগঘন ও দীর্ঘস্থায়ী। এই দুই মেজাজকে সামঞ্জস্য রেখে পরিবেশন করার ক্ষমতা তাঁর কণ্ঠকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে।

ভাওয়াইয়ার ইতিহাসে কিংবদন্তি শিল্পী হিসেবে আব্বাসউদ্দিন আহমদ ও প্রতিমা বড়ুয়া-র নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধায়। তাঁদের গাওয়া গান উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতিকে সর্বভারতীয় পরিসরে পৌঁছে দিয়েছিল। সুনীতি রায় সেই ঐতিহ্যের উত্তরসূরি হিসেবে নিজস্ব ভঙ্গিতে একই ধারাকে বহন করে চলেছেন। তবে তিনি কেবল অনুকরণে সীমাবদ্ধ নন; বরং নিজস্ব স্বরভঙ্গি, আবেগপ্রকাশ ও উচ্চারণভঙ্গির মাধ্যমে গানে ব্যক্তিগত ছাপ রেখেছেন।

তাঁর পারিবারিক জীবনও ভাওয়াইয়া গানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। তিনি প্রখ্যাত ভাওয়াইয়া শিল্পী ও লোকনাট্য রচয়িতা নারায়ণচন্দ্র রায়-এর সহধর্মিণী। এই সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁর শিল্পীসত্তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। পারিবারিক পরিসরেই তিনি গানের সাধনা শুরু করেন এবং ক্রমে তা মঞ্চ ও সম্প্রচারের জগতে বিস্তৃত হয়।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

শৈশব থেকেই তাঁর জীবনে সংগীতের উপস্থিতি ছিল প্রবল। মাত্র নয় বছর বয়স থেকেই তিনি ভাওয়াইয়া গানের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে এই ধারার প্রতি গভীর অনুরাগ তৈরি হয়। দীর্ঘ সাধনার পথে তিনি নিজ কণ্ঠে তিন শতাধিক ভাওয়াইয়া গান পরিবেশন করেছেন। তাঁর গাওয়া বহু গান শ্রোতাদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে—যেমন “ও কি রে বাউদিয়া”, “দেওর ভাউদি”, “ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে” এবং “ও কি গাড়িয়াল ভাই” প্রভৃতি। এই গানগুলির মধ্য দিয়ে তিনি উত্তরবঙ্গের লোকজ আবেগকে নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে দিয়েছেন।

আকাশবাণীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁর নিয়মিত পরিবেশনা তাঁকে উত্তরবঙ্গের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি সংযত, অথচ গভীর আবেগপূর্ণ। সুরের দীর্ঘ টান ও স্পষ্ট উচ্চারণ শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে যায়। গানের মধ্যে যে বিরহবেদনা বা প্রেমের আকুতি থাকে, তা তিনি কণ্ঠে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলেন যে শ্রোতা যেন নিজেকেই সেই কাহিনির অংশ মনে করেন।

তবে শিল্পীর জীবন সবসময় সহজ ছিল না। জীবিকার তাগিদে তিনি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে হেল্পার হিসেবে কাজ করেন। সামান্য প্রায় আট হাজার টাকার মাসিক আয়ে সংসার চালিয়েও তিনি সংগীতসাধনা থেকে বিচ্যুত হননি। সীমিত সামর্থ্য ও নানা সংগ্রামের মধ্যেও তিনি ভাওয়াইয়া গানের ঐতিহ্যকে জীবন্ত রাখার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছেন। এই সংগ্রামই তাঁর শিল্পীজীবনকে আরও অর্থবহ ও অনুপ্রেরণাদায়ক করে তুলেছে।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভাওয়াইয়া গানও নতুন মাধ্যম পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষত ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে তাঁর গাওয়া গান ছড়িয়ে পড়েছে বিস্তৃত শ্রোতামহলে। “উত্তুরা সোত্” প্রভৃতি সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠায় তাঁর পরিবেশনা বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এর ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও ভাওয়াইয়া গানের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। লোকসংগীতকে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

তাঁর শিল্পীসাধনার স্বীকৃতি হিসেবেও তিনি বিভিন্ন সম্মান ও পুরস্কার লাভ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর হাত থেকেও তিনি সংগীত সম্মান গ্রহণ করেছেন। এই স্বীকৃতি তাঁর দীর্ঘ সাধনা ও অবদানেরই মূল্যায়ন।

ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি একজন সংগ্রামী মা। তাঁর তিন কন্যা ও এক পুত্র—দুর্গা রায়, শঙ্করী রায়, মিতালি রায় এবং সন্দীপ রায়—সকলেই ভাওয়াইয়া সংগীতের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের মধ্যে দুর্গা রায় বিশেষভাবে পরিচিত। এইভাবেই পারিবারিক পরিসরেই ভাওয়াইয়া গানের একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে সুনীতি রায় কোচবিহার জেলার ডোডেয়ার হাট অঞ্চলে বসবাস করেন। সেখান থেকেই তিনি সংগীতচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করছেন।

ভাওয়াইয়া গানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল প্রকৃতি ও মানুষের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। তিস্তার চর, কাশবন, বর্ষার মেঘ কিংবা শরতের নীল আকাশ—সবই এই গানের ভাষা। সুনীতি রায়ের কণ্ঠে এই প্রকৃতিচিত্র জীবন্ত হয়ে ওঠে। তাঁর গাওয়া বিচ্ছেদের গানগুলিতে যেমন গাড়িয়ালের দীর্ঘ পথযাত্রার কষ্ট ধরা পড়ে, তেমনি প্রেমের গানে থাকে কোমল সুরের মাধুর্য। তিনি জানেন কোথায় স্বর নিচু করতে হয়, কোথায় দীর্ঘ টান দিতে হয়—এই সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণই তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।

উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতি আজ নানা পরিবর্তনের মুখে। নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের অভাব ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের চাপে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সুনীতি রায়ের মতো শিল্পীরা ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁরা শুধু গান গাইছেন না; এক সমগ্র ইতিহাস, এক জনপদের ভাষা ও অনুভূতিকে বাঁচিয়ে রাখছেন।

সবশেষে বলা যায়, সুনীতি রায় উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া সংগীতধারায় এক উজ্জ্বল নাম। তাঁর কণ্ঠে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক সুন্দর সমন্বয় দেখা যায়। পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করেও তিনি নিজস্ব পরিচয় নির্মাণ করেছেন। ভাওয়াইয়া গানের দীর্ঘ সুরের মতোই তাঁর শিল্পীজীবনও ক্রমাগত প্রসারিত হোক—এই প্রত্যাশাই রইল। উত্তরবঙ্গের মাটির গন্ধমাখা এই কণ্ঠ ভবিষ্যতেও লোকসংস্কৃতির আকাশে অনুরণিত হবে, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

তথ্য সহায়তা: নন্দিতা বোস 


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

উৎপল সরকারের জন্ম আলিপুরদুয়ারে। কর্মসূত্রে বর্তমানে শিলিগুড়ির বাসিন্দা। ভালোবাসেন গল্প ও প্রবন্ধ লিখতে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

অন্যান্য লেখা