preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
কাদের, খোকন ও থার্ড সিম্ফনি
গল্প

কাদের, খোকন ও থার্ড সিম্ফনি

ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে পুরোনো রেকর্ডের গন্ধ, কাদের ও খোকনের সংলাপ—বেঠোভেনের থার্ড সিম্ফনি যেন জীবনের মিছিল। অনিমেষ চট্টোপাধ্যায়ের সৌম্য কথন, স্মৃতি ও শহরের শ্রাবণে জাগে অসাধারণ অনুভূতি। পড়ুন এক নস্টালজিক, তীব্র ও হৃদয়স্পর্শী গল্প।

কাদেরের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে পর্যন্ত খোকন কখনও কুয়াশা জড়ানো চাঁদের আলো, হিমমাখা পাহাড়, সবুজ সমুদ্রের ঢেউ কিংবা রক্তাক্ত মানুষের মিছিল দেখেনি। এক শনিবারের পড়ন্ত বিকেলে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ফুটপাতে কাদেরকে খোকন দেখতে পেয়েছিল। পঁচিশ কি ত্রিশ বছর পর। খোকনের সন্ধেবেলায় সময় কাটে না। ফাঁকা একানে বাড়িতে ফিরতে মন টানে না। সে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। শহর দেখে। শ্যাম পোদ্দারের ধর্মতলার গদিতে ছুটি হয় ছ-টার সময়। দু-কামরার হাওড়ার শ্রীবাস দত্ত লেনের বাড়িতে ফিরতে ফিরতে সাড়ে দশটা এগারোটা বেজে যায়। শ্যামবাবুদের গদিতে খাতা লেখা, হিসেব রাখার কাজ। তা প্রায় ত্রিশ বছর হয়ে গেল।

সেদিন ছিল শীতকাল। কয়েকদিন হল বড়ো দিন, পয়লা জানুয়ারি পেরিয়েছে। ফ্রিস্কুল স্ট্রিট জমজমাট। একটা পুরোনো রেকর্ড ক্যাসেটের দোকানে ভেতর কাদের দাঁড়িয়েছিল। একঝলক দেখে চিনতে খোকনের সময় লেগেছিল পাঁচ সেকেন্ড কি একটু বেশি। ততক্ষণে কাদের ওর দিকে চেয়ে হাসছে।

‘আরে তুমি মানে আপনি। মানে আপনি তো আমতা ঝিংরের কাদের?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ। আমি কাদের। তুমি, আপনি তো ঘোষালবাড়ির খোকন?

হ্যাঁ হ্যাঁ মনে আছে দেখছি’

‘কিন্তু তোমার মানে আপনার ভালো নামটা ভুলে গেছি।’

‘আমার আসল নাম অনুপম। ঝিংরের কেউ আমায় ও নামে চেনেন না।’

খবর দেওয়া নেওয়া চলে।

অনুপমরা ঝিংরে ছেড়েছে অনেক আগে। ওর বাবা ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার জন্যে বাড়ি ভাড়া নিলেন, হাওড়া কদমতলায়। সেই থেকে ওখানেই। তা আজ পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল।

‘তোমার খবর কি? এখানে এই ফ্রিস্কুল স্ট্রিটে কবে থেকে? তোমাদের তো সেই হাটপুকুরের ধারে লেপ-তোশকের দোকান ছিল। তারপর তো ওখান থেকে উঠে গিয়ে, অন্য কোথায় চলে গিয়েছিলে। তোমাদের আর দেখতে পেতুম না। অবশ্য কলেজে ঢোকার পর আমারও ঝিংরে যাওয়া খুব কমে গিয়েছিল।’

ঝিংরেয় হাটপুকুরের উত্তরপাড়ে খোকনদের বাড়ির উলটোদিকে কাদেরের বাবা রফিক সেখের লেপ-তোশক-বালিশের দোকান ছিল। তারপর ওখান থেকে উঠে গিয়ে ঝিংরে বাজারের ওপারে পলসপাই যাবার বাস রাস্তায় কাদেরের বাবা কাকারা মিলে দোকান দিয়েছিল।

‘কী করে দেখবে। তোমাদের ওই বাউনপাড়া থেকে দোকান উঠে যাবার পর ওদিকে আমার যাওয়া কমে গেল। আমাদের বাড়ি তো মুচিঘাটার কাছে নতিবপুরে। এটা আমার বড়োচাচার করা দোকান। আমি এখানে পঁয়তিরিশ বছর আছি।

‘আমারও তাই। ত্রিশ বছর ধর্মতলায় এক পোদ্দারের কাপড়ের আড়তে।’

ছোটোবেলার ধোপাডাঙার মাঠে বাবলা গাছের ডাল কেটে উইকেট তৈরি। শীতের সকাল দুপুরের কলবাড়ির মাঠে ক্রিকেট। ... পুরোনো আয়নায় দু-জনেই মুখ দেখে।

বাড়ি ফেরার রাস্তায়, বাড়ি ফিরে, খোকনের মনে কাদের, চল্লিশ বছর আগের ধোপাডাঙার মাঠ, কলবাড়ির পিচের ক্রিকেট ভাসতে থাকল।

দু-দিন পরেই আবার দেখা হয়। কাদের খোকনকে ভেতরে ঢুকে বসতে বলে।

‘এসো এসো তোমার কথাই ভাবছিলুম। বিশ্বাস করো। ঝিংরের কেউ তো এদিকে আসে না।’

কাদেরদের আসল দোকানটা এখন রেকর্ড, ক্যাসেট, রেকর্ড প্লেয়ার ক্যাসেট প্লেয়ারে ভরতি। গুমটির মতো। দোকানের কাউন্টার, সামনে ফুটপাতে। পাশাপাশি তিনটে। কাদেরের ভাইপোরা বসে আছে। কাদের আলাপ করায়। তারা পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে আসে। কাদের মাঝের দোকানটায় বসে।

‘তোমরা সবরকম গানই রাখো?’

‘আমি বড়োচাচার পুরোনো ব্যাবসা দেখি, এই মাঝখানে। ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল। বাঁ-দিকে ইংরেজি পুরোনো গান। ডানদিকের ওইটা হালফিলের ইংরেজি গান। দাদারা মারা যাবার পর ভাইপোরাই দেখে। আমি সময় কাটাই।

খোকন দেখতে থাকে, মাঝের দোকানে খদ্দের খুব কম। কিন্তু লোকজন কাদেরের কাছ থেকে পুরোনো রেকর্ড মিউজিক নিয়ে পরামর্শ চাইতে আসছে। কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর।

‘তোমার তো দেখছি খুব নাম। সবাই দেখছি আসছে তোমারই কাছে।’

‘আরে না না। সেসব কিছু নয়। তোমাকে কেউ থানকাপড় নিয়ে জিজ্ঞেস করলে একইরকম উত্তর পাবে।’ এক ভাইপো, রিয়াজুল, ডাক নাম মন্টু হেসে বলে ‘ছোটো চাচার মতো এত নলেজ কলকাতায় কারুর নেই। টেলিভিশনের লোক ইন্টারভিউ নিয়ে গেছে।’।

কাদের লজ্জা পায়।

খোকন জিজ্ঞেস করে ‘কীরকম শুনি।’

‘দূর ছাড়ো না।’

‘আরে বলোই না।’

‘সে একটা কাণ্ড। কোথা থেকে খবর পেয়েছে, আমার মতো নাকি বিলিতি রেকর্ডের খবর খুব কম লোকের আছে। আমি তো শহুরে ভাষায় কথাও কইতে পারি না। বোধহয় ওদের বাজার ঠান্ডা ছিল। গরম খবর পাচ্ছিল না। তবে খুব সম্মান করেছিল’।

গল্প চলে। খোকন বলে, ‘জানো আমার বাবা সেন্ট পলসে পড়াশোনা করেছিলেন। ক্যালকাটা বি তে খুব মিউজিক শুনতেন। আমারও ভালো লাগে। বুঝি না কিছু অবশ্য।’

কাদের চুপ করে তাকিয়ে থাকে। ‘ঝিংরের কারুক্কে একথা বলতে শুনিনি, এই প্রথম। শোনো না যত ইচ্ছে। তোমাকে আমি ক্যাসেট দোব। রেকর্ডের দরকার নেই, আবার প্লেয়ার লাগবে।’ একটা পুরোনো ছোট্ট সন্তোষ ব্র্যান্ডের ক্যাসেট প্লেয়ার ও গছিয়ে দেয়।

‘এটার আবার পয়সা দিতে যেয়ো না। ভালো না লাগলে ফেরত দিয়ো। আমাদের বেশ কয়েকট রাখতেই হয়। এটা পুরোনো।’

সেই শুরু। খোকনের এখন রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়ে কোলকাতা দেখা, কী সপ্তায় একদিন দু-দিন পাড়ার পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারা কমে যাচ্ছে। বাড়ি ফিরে ওই ক্যাসেট শোনা তাকে টানতে থাকে। ঘুমোতে রাত হয়ে যায়। নিজে রান্না করা হয়ে ওঠে না। পাড়ার মেজদার হোটেলের টিফিন কেরিয়ারের ডাক পড়ে।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

সন্ধেবেলা কাদেরের দোকানে খোকন বসে আছে। এক চকচকে জামা পরা খদ্দের এল। দেখে বোঝা যায় এ্যাংলো ইন্ডিয়ান।

‘আসুন ক্লিভ সাহেব বলুন খবর কি?’ খোকনের সঙ্গে পরিচয় হয়। ক্লিভ পার্ক স্ট্রিটের বারে বাজায়। কিন্তু শখ ক্লাসিক্যাল বাজনা।

‘আচ্ছা কাদেরভাই বলুন তো মোজার্টের আর বাখের কোনো একসঙ্গে কম্পোজিশন আছে? ‘কী করে হবে বলুন তো? বাখ যখন মারা গেছে তখন মোজার্ট তো খুব ছোটো। তাই না?’

‘কেন, একথা আবার কে আপনাকে বলল?’

‘কিশোরবাবু মানে কিশোর চ্যাটার্জি নাকি স্টেটসম্যানে লিখেছেন।’

‘ও বাবা তাহলে তো ভুল হবে না।’

পাঁচ সেকেন্ড চুপ করে থেকে কাদের বলে ‘হুঁ বুঝেছি। ঠিক লিখেছেন। একসঙ্গে কম্পোজিশন নয়। ডেডিকেশন আছে। ওটা বাখ মানে আমাদের হান সেবেস্তিয়ান বাখ নয়। ওর ছেলে, হান ক্রিশিয়ান বাখের সঙ্গে মোজার্টের খুব বন্ধুত্ব ছিল।’

খোকনের দিকে তাকিয়ে ক্লিভ হাসে। বলে, ‘এইজন্যেই সবাই কাদের সাহেবের কাছে আসে।’

কথার ফাঁকে ফাঁকে কাদের ভাইপোদের দোকানের দিকে নজর রেখে গল্প চালায়।

‘ওরে মুনির, দ্যাখ। ওই ভদ্রলোক ন্যাট কোল কিং চাইছেন। দেখা। ওনাকে নানা মাসকুরি, ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রাও দেখা।’

কিংবা, ‘মোহন বাবা পেছনে দেখ। উনি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন, জ্যাজ চাইছেন। গান মিউজিক দুই দেখাও। লুই আর্মস্ট্রং থেকে দেখাও।’

কিংবা অন্য একদিন। প্রথম সন্ধে। এক খাঁটি বাঙালি ড্রেস পরা খদ্দের। চেহারায়, আগে যাদের বলত বনেদি সম্ভ্রান্ত, ছাপ তেমন। কাদের উঠে দাঁড়ায়, ‘হ্যাঁ স্যর বলুন। কেমন আছেন।’

‘এই চলছে। আচ্ছা কাদের সাহেব বলুন তো হাইডেনের থার্ড ভায়োলিন কনসের্টো সত্যিই পাওয়া যায় না?’

‘তাই তো শুনেছি স্যর। ওটার নোটেশনটাই তো হারিয়ে গেছে, দু-শো বছর আগে। আমরা তো আপনাদের থেকেই শিখেছি।’

‘বাজে বোকো না। কাদের সেখ আমার থেকে শিখেছে! হুঁ। আচ্ছা আমাকে মোজার্টের হাইডেন কোয়াটের্ট দেখাও তো’।

‘কার দেখাব বলুন। আপনি তো পুরোনো কন্ডাকটর কারজান, বার্নস্টাইন বেশ কিছু নিয়েছেন।’

‘এই জন্যেই কাদের সাহেব তোমার কাছে মানুষ আসে। টিভিওলা আসে। এ চত্বরে যত দোকানদার আছে কোয়াটের্ট চাইলে বেশ কিছু রেকর্ড বার করে দেবে। বড়োজোর জিজ্ঞাসা করবে কোন কোয়াটের্ট? ভায়োলিন না পিয়ানো? কিন্তু কোন কন্ডাকটরের চাই, জিজ্ঞেস করতে বোধহয় তুমিই আছ।’

‘ভালো খদ্দেরের সংখ্যাও তো কমে যাচ্ছে, স্যর। দেখুন না ওই ওদিকে এনায়েতের দোকান। ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল বিক্রি করে। লোক এসে কি বলে, একটা মেঘমল্লার দাও কী একটা দরবারি কানাড়া দাও? বলে না। বলে বিলায়েতের দরবারি দাও। কি ফৈয়াজ খাঁয়ের মেঘমল্লার দেখাও। আর আমাদের কাস্টমার? বলে মুনলাইট সোনাটা দাও, নাইনথ সিমফনি দাও। অনেক খদ্দের আবার এসে বলে মোজার্ট দিন তো কিংবা বেঠোফেন দিন তো। কেউ বলে না অমুক কনডাক্টরের মুন লাইট সোনাটা দেখাও। আমাদের ভালো খদ্দের আর নেই স্যর।’

এইরকম এক বিকেল বেলায় দোকানে মোজার্টের একটা চেম্বার মিউজিক বাজছিল। খোকনের সেই ভিড় গিজগিজে গাড়ি-ভরতি ফ্রিস্কুল স্ট্রিটের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে পড়ে ফাঁকা মাঠে পপির খেত। বসন্তের হাওয়া চোখের সামনে ভেসে উঠছে দেখতে পাচ্ছিল। নিজেরই হাসি পেল। জিজ্ঞেস করল, ‘কাদের তুমি, এমন মারাত্মক আফিমের নেশার মতো মিউজিকে দখল আনলে কী করে’।

‘আমাদের ব্যাবসার এটাই চাবিকাঠি গো। প্রথম যখন বড়ো চাচা এনে বসাল তখন আমি তো অন্য জগতে। আমতা কলেজে সেকেন্ড ইয়ার। উনসত্তর সাল। রাজনীতি করে না এমন ছাত্র কোনো কলেজে নেই। সদ্য খাদ্য আন্দোলন শেষ হয়েছে। আর হঠাৎ এই ফ্রি স্কুল স্ট্রিট। জেঠুর ভাড়া বাড়ি রয়েড স্ট্রিটে। সব নতুন। বড়ো চাচা বলেছিল। এখন এক বছর খালি রেকর্ড শোন। রোজ মন দিয়ে। আমাদের সেকেন্ড হ্যান্ড রেকর্ডের ব্যাবসা। এজেন্টরা সারা দেশের খবর রাখে। কোথায় পুরোনো রেকর্ড বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ওরা স্টক আনলে। রেকর্ড শুনে বুঝতে হয় সত্যি কার মিউজিক। কে কন্ডাক্ট করেছে। তার ওপর দাম ঠিক হবে। সেই অনুযায়ী খানদানি কাস্টমার তোমায় দাম দেবে। এ তো নতুন রেকর্ডের দোকান নয়। রেকর্ড কোম্পানি যা লিখেছে সেই মেনেই ব্যাবসা হবে। ধরো আমাদের দোকানে বেঠোফেনের থার্ড সিম্ফনি কেউ নিয়ে এল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগের বার্লিন সিম্ফনির বাজানো রেকর্ড যদি হয় তাহলে খুব দাম হবে। আর যদি ইসরায়েল ফিলহারমনিক অর্কেস্ট্রার হয়, হাল আমলের, তাহলে অনেক কম দাম হবে। রেকর্ডের কভার বেশিরভাগ সময়ই উলটোপালটা থাকে। এজেন্টরাও কিন্তু খুব হুঁশিয়ার হয়। অনেক খবর রাখে। ইচ্ছে করে হাতে লিখে কভার বানায়। বলবে, ‘স্যর একশো বছরের পুরোনো কভার ছিঁড়ে গেছে।’ তো চাচার কথা মেনে মন দিয়ে রেকর্ড শুনতে শুরু করলুম। রয়েড স্ট্রিটের বাড়িতেও একটা প্লেয়ার আছে। তাইতে শুনি। আস্তে আস্তে, জানো আমার কেমন সত্যিই আফিমের মৌতাত নেশার মতো হতে লাগল। দিন নেই রাত নেই মাথার মধ্যে এই খালি ঘুরতে লাগল’।

 

নিউ মার্কেটের দিকের চায়ের দোকানে চায়ে চুমুক দিতে দিতে কাদের বলে, ‘আমার গুরু ভাগ্য খুব ভালো। চাচা আমায় আলাপ করিয়ে দিত। কালো পাড় ধুতি আর পাঞ্জাবি পরা বিষ্ণু স্যর আসতেন। বিষ্ণু দে। চাচা বলেছিল খুব পণ্ডিত মানুষ। ওই ইসলামিয়া কলেজে ইংরেজির প্রফেসর। একদিন সবে দিন পনেরো দোকানে বসছি। বিষ্ণু স্যর এসেছেন। চাচা নেই। আমি একা। কিছু নতুন সাপ্লাই রেকর্ড বার করে বলেছিলুম, এগুলো দেখবেন। চপিনের। উনি হালকা হেসে আমায় বলেছিলেন, চপিন নয় সঁপ্যা। জেঠুর কাছে উচ্চারণ শিখে নাও, কেমন?

হে হে কী লজ্জা। উনি আমাকে পিরিয়ড আলাদা করে শিখিয়েছিলেন।’

নিউ মার্কেটের কাছে কেকের দোকান। উলটোদিকে কাগজের ফুল, টুপি বিক্রি হচ্ছে। সামনে দাঁড়িয়ে গল্প চলে, ‘আমার তখন বছর খানেক হয়ে গেছে এখানে। একদিন সকালবেলা। এক এজেন্ট এসেছে হাইডেনের দশখানা পিয়ানো সোনাটার সেট নিয়ে। নাকি ক্লারা স্যুম্যান বাজিয়েছে। এতদিনে নিশ্চয়ই বুঝতেই পারছ। ক্লারা স্যুম্যান মারাই গেছে প্রায় একশো বছর আগে। এসব রেকর্ডের অনেক দাম হবে। ভালো দামে বিক্রিও হবে। বড়ো চাচা একটার পর একটা রেকর্ড, প্লেয়ারে চাপিয়ে শুনছে। আমার হঠাৎ কানে ঠেকল। আমি আমতা আমতা করে বলে ফেলেছিলুম, চাচা এ অত পুরোনো নয়। আলফ্রেড ব্রেন্ডেল না কি য্যানো নাম, তার কন্ডাক্ট বোধহয়। চাচা চুপ করে আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে এজেন্টকে বলেছিল, না ভাই আমার ভাইপো ঠিকই বলেছে। এর দাম বেশি হবে না। তবে রেখে যাও। দেখছি। সেই শুরু। চাচা আমাকে জিজ্ঞেস না করে আর কিছু কিনত না’।

কথা বলতে বলতে মেঘ করে আসে। বউবাজারের দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস ভেসে এল। কাদের বলে, ‘চলো তোমায় বাসে তুলে দিয়ে আসি। তোমার তো ছাতা নেই।’ মনুমেন্টের কাছে হাওড়ার বাস স্ট্যান্ডে এসে বাসে তুলে দেবার সময়, কাদের ব্যাগ থেকে তিন-চারটে ক্যাসেট বার করে বলে, ‘রাতে শুনো। এ বৃষ্টি সহজে থামবে না’।

খোকনের বাড়ি ফিরতে সময় লাগে। রাস্তায় একহাঁটু জল। রান্নাঘরের টালির চালে বৃষ্টির শব্দ। খোকন ক্যাসেট লাগায়। বাখের আলেগ্রো। ভায়োলিন কনশের্টোর মধে ডুবতে থাকে। হাওড়া কদমতলার ঘিঞ্জি শ্রীবাস দত্ত সেকেন্ড বাই লেনের খোলা ড্রেনের পচা গন্ধ। তার মধ্যে থেকে নর্দমার ধারের অযত্নে বেড়ে ওঠা জুঁই ফুলের গন্ধ ভেসে আসে। বাখের ভায়োলিন, কাউন্টার পয়েন্টে ফিরে আসে। খোকনের তিনকামরার পুরোনো ছাদ থেকে জল পড়ে হাঁড়ির মধ্যে টপ টপ শব্দ তোলে।

অঝোরে বৃষ্টি থামে না। শ্যাম পোদ্দারের গদি যাওয়া হয় না। খোকন, মেজদার হোটেলের ভাত ডাল কুঁচো চিংড়ি ঘ্যাঁট খায়। বৃষ্টিমাখা মেঘছাওয়া দুপুরে হান স্ট্রাউসের ওয়ালজ অফ দ্য দানিউবের মায়ার নেশা ধরতে শুরু করে। এমন সময় বাইরের দরজায় আওয়াজ। দরজা খুলে দেখে, কাদের।

‘আরে তুমি?’

’চলে এলুম, বাড়ি খুঁজে কেমন বার করেছি দেখো।’

বাড়িতে ঢুকে বলে, ‘ছ্যা, দেখেই বোঝা যায়। মেয়েমানুষ ঘরে থাকে না। কী নোংরা। একদম ঘাঁটা কেস। বিয়ে করোনি কেন রে বাবা?’

‘আরে আমি কাঠ বেকার ছিলুম পাক্কা তিন বছর। টিউশনি করে চালিয়েছি। এই চাকরি পেতে পেতে বাবা মা চলে গেল। বিয়ে করিনি নয়। হয়নি। কিন্তু তুমি বউ মারা যাবার পর আবার করলে না কেন?’

‘হা ওটাই বাকি ছিল। চলো ঝিংরে যাব। এমন বৃষ্টি, রয়েড স্ট্রিটে ভালো লাগছে না।’

‘চলো। জল ঠেলে টিকেপাড়া স্টেশনে। শ্যামবাবুর গদির চাকরি থাক দু-দিন শিকেয় তোলা।’

বিকেলের মেঘ সন্ধেকে টেনে আনে। ট্রেনের জানলার বাইরে গুঁড়ি বৃষ্টিমাখা ধানখেত। দূরে আম-কাঁঠালের গ্রাম। নয়ানজুলিতে শালুক দুলছে। কালোকাঠের নৌকো বাঁধা ঘাটে। তার গায়ে চোখ আঁকা। টোকা মাথায় চাষিবউ চলেছে বীজধান নিয়ে। খোকন আনমনে বলে ‘ওয়ালজ অফ দানিউব শুনতে শুনতে আমার দামোদরের ঢেউ, তার মাঝে বনকলমি দুলছে, চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কারুক্কে বললে পাগল ভাববে।’

‘হুঁ। আমার বউ ফতিমা জানো বিয়ে পর পর ঘরে ক্যাসেট বাজলে কিছু বলত না। পরে খুব বিরক্ত হত। বলত, দিন নেই রাত নেই বাড়ি থাকলেই কোঁ কোঁ। দুচোখখে দেখতে পারিনা।

একদিন। সন্ধেবেলা। আমাদের রয়েড স্ট্রিটের বাড়িতে। ফতিমা তখন ওখানে। বাইরের রকের টিনের চালে বৃষ্টির টং টং আওয়াজ হচ্ছে। ফতিমা বঁটিতে পটল কুটছিল। আমি মোজার্টের টোয়েন্টি ফিফথ সিম্ফনি চালিয়েছি। বার্নস্টাইনের বার্লিন অর্কেস্ট্রা। ও হঠাৎ হেসে ফেলেছিল। বলেছিল, ইঃ। এটা আমি জানি। টাইটান ঘড়ির বিজ্ঞাপনে টিভিতে দেখায়। ওর পটল কোটা স্লো হয়ে গেল। এরপর ফতিমা কী করে দেখবার জন্যে ওই ওই তোমার স্ট্রাউস লাগিয়েছিলুম। ওয়ালজ অফ দ্য দানিউব। ফতিমা তখন পটলের তরকারি শেষ করে ঝিঙে-চিংড়িতে সরষেবাটা মেশাচ্ছে। রয়েড স্ট্রিটের বাড়িতে আলাদা রান্নাঘর নেই। ওই দাওয়া-রকেই রান্না হয়। ফতিমা চুপ করে খুন্তি হাতে বসে। কিছু পরে ঘাড় বেঁকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, এই মিউজিকটার নাম কী? আমার মাথায় কেমন পোকা নড়েছিল। বলেছিলুম, এটার নাম দামোদরের নেত্য। হেসে উঠেছিল, ধ্যাত। বড্ড বাজে বকো। খালি মজা করো। তারপর ঠোঁটে হাসি টেনে বলেছিল, আর ওই আগেরটার নাম কী হবে তাহলে? আমিও রহস্য করে বলেছিলাম, আগেরটা? আগেরটা…আগেরটা—ফতিমার বিয়ে।

মুখে কাপড় চাপা দিয়ে কী হাসি! আমি এখনও পষ্ট দেখতে পাই। তারপর ওকে একদিন আমি মোজার্টের ম্যারেজ অফ ফিগারো শুনিয়েছিলুম। বলেছিলুম, জানো এটা এক রাজার ছেলের বিয়েতে মোজার্ট সুর করেছিলেন। ফতিমা ঠোঁট টিপে বলেছিল, তাহলে এটার নাম হল—সেখ সাহেবের বিয়ে। আমার এখনও পষ্ট মনে আছে। সেদিন লোডশেডিং হয়েছিল। রাস্তার আলো জানলা দিয়ে ফতিমার মুখে এসে পড়েছে। ওর নাকের নাককড়াইটা জ্বলজ্বল করছে। ও মুখ টিপে হাসছে।’

‘আহা বউয়ের কি নাককড়াই হয়? বেশর বলো।’

‘হা জোলা ধুনুরির বাড়ির বউয়ের নাকে বেশর! বেশ বলেছ। সেই থেকে জানো আমরা দু-জনে একা হলেই ফতিমার বিয়ে, সেখ সাহেবের বিয়ে আর দামোদরের নেত্য শুনতুম।’

ঝিংরে পৌঁছতে রাত হয়। খোকনের ফাঁকা বাড়ি। পুষ্পদি, কাজের লোক কাম কেয়ার টেকার। ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিছানা ঠিক করতে, রান্নার ব্যবস্থা করতে ছুটোছুটি করে। কাদের নিজের বাড়ি চলে গেছে। কাল সন্ধেবেলা আসবে বলেছে। সকালে ভাইয়েদের দোকানে, বাড়িতে থাকবে।

বৃষ্টি থেমে বুড়ো কয়েতবেল গাছের মাথা থেকে কুয়াশার চাদর মুড়ি দেওয়া আধখানা চাঁদ ওঠে। খোকন, মান্ধাতার আমলের রেডিয়োতে ব্যাটারি লাগিয়ে কোলকাতা ‘খ’ ধরতেই বুঝতে পারে চাইকোভোশকির অয়ালজ ওফ দ্য ফ্লাওয়ার হচ্ছে। এই একটা ওয়ালজ। চোখের সামনে ভুটান পাহাড়, জয়ন্তি নদীর ধারের গাছের গন্ধ আনে। রান্নাঘর থেকে ভাতের আর ডিমভাজার গন্ধ ভেসে আসছে। শ্রাবণের ঠান্ডা হাওয়ায় সদর বাড়ির সামনের স্বর্ণচাঁপা আর টগর গাছ দুটো মাথা দোলাচ্ছে। মাথায় জোনাকির মেলা। খোকনের হাসি পায়—কাল কাদেরকে বলতে হবে, এই ওয়ালজটার নাম হবে স্বর্ণচাঁপার নাচ। শুনলেই বোঝা যায় এশিয়ার মানুষ। আমাদের ঘরের লোক।

পরেরদিন শেষ বিকেলে কাদের এলো খোকনদের ঘোষালবাড়ি। হাতে একটা রামের বোতল। খোকন পুষ্পদিকে আলুভাজা করতে বলে। ঝিমঝিম করে বৃষ্টি। আমবাগানে ঘন কালো মেঘের ছায়া। ঘোড়ানিম গাছ থেকে নিমফুলের গন্ধ ভেসে আসছে।

কাদের বলে, ‘রাস্তায় প্রদীপ কোলের সঙ্গে দেখা হল। চেনো ওদের?’

‘কোন প্রদীপ? ওই ঘরদুবড়ো স্কুলের মাস্টারমশাই?’

‘হ্যাঁ অনেক পুরোনো কথা হচ্ছিল। স্কুলে একক্লাসে পড়তুম। একবার জানো ওকে অনেকদিন পর দেখতে পাই মিছিলে। জেলে বন্দি হত্যা, বন্দিমুক্তির দাবিতে মিছিল। এমারজেন্সি চলছে। বিশাল মিছিল। সাধারণত মিছিল ফ্রি স্কুল দিয়ে যায় না। ধর্মতলা স্ট্রিট দিয়ে যায়। সেদিন এদিক দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ সিদ্ধার্থ রায়ের পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমাদের দোকান ততক্ষণে বন্ধ করে দিয়েছি। প্রদীপকে দেখতে পাই মাথা ফাটা অবস্থায় পড়ে আছে। আমি আর আমার ভাইয়েরা ওকে তুলে হাসপাতাল নিয়ে যাই। সেদিন বেশ রাতে বাড়ি ফিরেছিলুম। আমার কী হয়েছিল জানি না বেঠোফেনের থার্ড সিম্ফনির ক্যাসেট লাগিয়ে বসেছিলুম। ওই যে গো হিরোয়িক বলে যেটাকে’।

‘হ্যাঁ ওই সিম্ফনিটা কেমন খুব রাগি। যেন রেগে গিয়ে একদল লোক মার্চ করছে।’

‘ঠিক বলেছ। ওর বেহালা কনশের্টোগুলোও। ভীষণ রাগি। তোমাকে রিল্যাক্স হতে দেবে না। তো আমি তো ক্যাসেট শুনছি। মাথায় আগুন জ্বলছে। হঠাৎ দেখি বড়ো চাচি উঠে এসেছে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। বড়ো চাচি তখন রয়েড স্ট্রিটে এসেছে। চাচা অনেকদিন মারা গেছে। চাচির তখন অনেক বয়েস। আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, এ রেকর্ড কোথায় ছিল? জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন? চাচি বলছিল, ওই যেদিন একশো চাষিকে পুলিশ গুলি করে মেরেছিল কলকাতায়। সেইদিন রাত্তিরে তোর চাচা এই বাজনা বাজাচ্ছিল।

—সে তো অনেকদিন আগের কথা। উনষাট সালের কথা!

—হ্যাঁরে ওরা সবাই বলাবলি করছিল, বিধান রায়ের মতো অত বড়ো ডাক্তার, অত বড়ো নেতা একি করলেন? আমাদের আমরাগোড়, পলসপাইয়ের চাষিরাও ছিলরে। সারারাত কেউ হ্যাচাক, পেট্রোম্যাক জ্বালেনি। সেদিন তোর চাচা রাতে পায়চারি করছে আর আস্তিনে চোখের জল মুছছে।’

দু-জনে চুপ করে বসে। দুরে ধোপাডাঙার মাঠের ওপার দিয়ে দু-জন অন্ধকারে হেঁটে যাচ্ছে। হাতে লন্ঠন। শুধু দু-জোড়া পায়ের সিলুয়েট দেখা যাচ্ছে।

কাদের আপনমনে বলে, ‘যদি দু-শো বছর আগে জন্মাতুম। সামনে বসে বেঠোভেনকে পিয়ানো সোনাটা বাজাতে কি সিম্ফনি কন্ডাক্ট করতে শুনতুম।’

খোকন হাসতে হাসতে বলে, ‘মোটেই না, তুমি জোলার পো সেখের ব্যাটা তুলো ধুনতে আর আমি ঘোষাল বাড়ির ইজ্জত রাখতে নামাবলি গায়ে দিয়ে কায়েত বাড়ির বিধবাকে একাদশীতে লাউ খাওয়া যায় কি না তার নিদান দিয়ে যজমানি আদায় করতুম।’

‘হেঁ-হেঁ বেড়ে বলেছ’।

খোকন আস্তে করে বলে, ‘সত্যি বেঠোভেনের সিম্ফনি কনসের্টো কি কোয়াট্রেট যা-ই শুনি না কেন মনে হয় অনেক মানুষ চলেছে বাস্তিল দূর্গ ভাঙতে। কাদের, তুমি দেলাক্রয়ার ফরাসি বিপ্লবের পেইন্টিং দেখেছ? ওই যে বিপ্লবের নারী। একদিকের বুক বেরিয়ে গেছে। হাতে পতাকা? উফ্ কী মারাত্মক’।

কাদের সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে খোকনের দিকে দেখে। হাতের গেলাস থেকে রাম চলকে ওঠে— ‘তুমি ইউজিন দেলাক্রয়ার ছবিটা, ওই ছবিটা দেখেছ! কোথায় দেখলে? আর একটা, আর একটা ফ্রান্সিসকো গোয়ার? ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, ফ্রান্সের মজুর? দেখেছ?’

তারপর শান্ত গলায় আস্তে করে বলে, ‘তোমাকে বলেছি না। আমার ওস্তাদ ভাগ্য খুব ভালো। আমাকে বেঠোভেন শুনতে শিখিয়েছিলেন মানিকস্যর। মানে সত্যজিৎ রায়। একটু রাত করে দোকানে আসতেন। রাত্তিরবেলায়। যাতে ওনাকে দেখে ভিড় না হয়। উনি তখন কোলকাতা বি-তে ‘বেঠোভেন, দ্য রেবেল মিউজিশিয়ান’ বলে একটা ভাষ্য নাটক দিয়েছেন। একটা পাঞ্জাবি আর পাজামা পরে আসতেন। বেঠোভেনকে নিয়ে কত কথা। বেঠোভেন, হান সেবেস্তিয়ান বাখের মতো চার্চের বাঁধা মাইনের চাকরি করেননি। মোজার্টের মতো কোনো কাউন্টের রাজসভায় চাকরি করেননি। সিম্ফনি হলে টিকিট বিক্রি করে অর্কেস্ট্রা কন্ডাক্ট করে রোজগার শুরু করেছিলেন।’

খোকন বলে, ‘রাত হল। শেয়াল ডাকছে। বাড়ি যাও। তোমার বউমারা ভাত নিয়ে বসে থাকবে। এই ঝিংরে থেকে তোমাদের নতিবপুর অনেকটা। সাঁকো পেরুতে হবে। টর্চ এনেছ? না কি মালের বোতল আনতে আনতে সেটা ভুলে গেছ?’

‘হেঁ-হেঁ চলি, সত্যিই রাত হল।’

চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে কাদের বলে, ’রাজা মহারাজাকে কখনও পাত্তা দেননি। একটা কার্টুন ছবি আছে, জানো? কবি গ্যয়টের সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়েছেন। কাউন্ট আর কাউন্টেসকে দেখে গ্যয়টে টুপি খুলে নিচু হয়ে রেসপেক্ট জানাচ্ছেন। বেঠোভেন কিন্তু অগ্রাহ্য করে চলে যাচ্ছে। এই ছিল বেঠোভেন। ফরাসি বিপ্লবের মানুষ। দ্য গ্রেট আর্টিস্ট বলে পাতলা বই ফুটপাতে বিক্রি হত। মানিকস্যর সেই বই আমাদের দোকানের পাশে ফুটপাত থেকে তুলে এনে আমাকে দেখিয়েছিলেন, দেলাক্রয়া আর ফ্রান্সসিকো গোয়া।’

দূরে মানিক পিরের দরগায় কারা যেন গান গাইছে। বর্ষার রাত। ঝাপসা চাঁদ উঠেছে। পেছনের বাঁশবনের ভেতর দিয়ে খালে পাট ভেজানোর গন্ধ ভেসে আসছে।

‘খোকন তুমি কি জানো এই থার্ড সিম্ফনি যাকে হেরোইক না ইরোইকা বলে, ওটা উনি নেপোলিয়নকে ডেডিকেট করেছিলেন? তারপর আবার ফিরিয়ে নেন? এ গল্প আমি প্রথম শুনি মানিকস্যরের কাছ থেকে।’।

‘হ্যাঁ পড়েছি। তারপর নেপোলিয়ন ভোল পাল্টালেন। ক্যাথলিক ধর্ম ফিরিয়ে আনলেন। পোপ মাথায় জল ঢেলে নেপোলিয়নকে পাপমুক্ত করলো। শেষে নিজেকে সম্রাটও বানালেন’।

‘বেঠোভেন বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছিলেন-- সব পুরোনো আবর্জনা আবার ফিরিয়ে আনা হচ্চে, বিপ্লবকে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। তারপর সম্রাট হওয়া। এর পরেই বেঠোভেন ওই ডেডিকেশন ফিরিয়ে নেন। ডেডিকেশনটা কলম দিয়ে এত জোরে কেটে ছিলেন যে কলমের চাপে কাগজ ছিঁড়ে গিয়েছিল। শুনেছি মিউজিয়ামে সে কাগজ রাখা আছে।’

রাত বাড়ে পুষ্পদি খাবার বেড়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। কাদের টর্চ ফেলতে ফেলতে চলে যায়।

দিন যায় মাস যায়। কাদের শবেবরাতে আবার নতিবপুর যায়। জ্বর মামসে ভুগে গাঁয়ের বাড়ি আটকে যায়। খোকনের কাজের চাপ বাড়ে। টনসিলের জ্বরে শুয়ে থাকে। অনেকদিন পর শেষ হেমন্তে দু-জনের দেখা হয়। কেমন আছ, কী হয়েছিল, শালা বুড়ো হয়েছ, সাবধানে থাকো—এইসব চলে।

‘বলো, শবেবরাত কেমন হল?’

‘ওই একইরকম। ইচ্ছে হচ্ছিল, বাপ মা চাচা চাচি আর ফতিমার গোরে গিয়ে বাতি বা চেরাগ জ্বেলে দিয়ে আসি। ভাইপোরা যেতে দিল না। আমি বাইরের দাওয়ায় চুপ করে বসেছিলুম। একবার মনে হল, সপ্যাঁর নকটার সোনাটা আর ওই মুনলাইট সোনাটা বাজাই। তারপর মনে হল, থাক। খারাপ অভ্যেস। সবাই আমাকে ছিটগ্রস্ত ভাবে। অবশ্য বউমারা খুব যত্ন করে। তিন দিন পর থেকে তো মামসের জ্বর।’

একটা পয়সাওলা খদ্দের এল। ঘর সাজানোর জন্যে গ্রামাফোন কিনেছে অকশনে। রেকর্ড চায়। ভাইপোকে দিয়ে সুন্দর একটা সেট বানালো কাদের।

সন্ধে নামে।

কাদের বলে, ‘সেই রামটা শেষ হয়নি, খাবে?’ টেবিলের তলায় লুকিয়ে লুকিয়ে দু-জনে খায়।

কিচ্ছুক্ষণ বাদে খোকন ফিসফিস করে বলে ‘কাদের আমার ভীষণ নেশা হয়েছে। চোখের সামনে সব দুলছে। আমি সামনের ফুটপাতে বেঠোভেন দাঁড়িয়ে আছে, দেখতে পাচ্ছি। যাচ্ছেতাই অবস্থা।’

‘আমারও তাই। আমিও দেখতে পাচ্ছি।’

বেঠোভেন তাঁর উসকোখুসকো চুল নিয়ে হাসতে থাকেন, বলো তোমরা কী শুনবে?

—দাদা, থার্ড সিম্ফনি। ইরোইকা। ওটা আমাদের যে বন্ধুরা বুকে গুলি নিয়ে চলে গেছে, রক্ত মেখে এই ফুটপাতে পড়ে থেকেছে, তাদের মিউজিক। তুমি কনডাক্ট করবে?

বেঠোভেন, বেটন হাতে নিয়ে সেই বেশ্যা-দালাল পরিবৃত ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের দিকে দু-হাত ছড়িয়ে দেয়। চেঁচিয়ে বলে ওঠে, ভিয়েনা সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা, রেডি? আজ আমরা নতিবপুরের কাদের সেখ আর ঝিংরের খোকন ঘোষালের জন্যে থার্ড সিম্ফনি বাজাব।

***

খোকনকাকা ও খোকনকাকা ঘুমিয়ে পড়েছ? বাড়ি যাবে কী করে? ওরে রিয়াজুল ছোটোচাচাকে ডাক দু-জনেই একদম ঘুমিয়ে পড়েছে। সাড়া দিচ্ছে না। ডাক ডাক। রাত্তির হয়ে যাচ্ছে।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

গতশতকের সাতের দশকে লেখালেখির শুরু। মাঝখানে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। গত বিশ বছর নতুন করে শুরু। প্রবন্ধ আর ছোটো গল্পর দুনিয়ায় লেখালেখি। একটি প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, “বেকন সাহেবের ধূতি ও অন্যান্য”। গত পঁয়ত্রিশ বছর চেন্নাইয়ের বাসিন্দা।

অন্যান্য লেখা