রাধাবল্লভ চক্রবর্তীর কবিতাগুচ্ছ মনুষ্যত্ব, স্মৃতি ও বিরতির কাব্য যেখানে ত্রুটি, শোক, সন্ন্যাস গাছের নীরব বিলাপ… মিলেমিশে যায়। সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি আর ভাষার সতেজতা নিয়ে গুচ্ছটি পাঠককে ঘুম, স্বপ্ন ও জীবনভাবনার অচেনা ধারে পৌঁছে দেয়।
ফ্রয়েড
ফ্রয়েড, একদিন আমি আর আপনি মিলে
মানুষের সম্ভাব্য বেঁচে থাকার উপায় বা
পথগুলি খুঁজে নেব; খুঁজে বের করব
ত্রুটি ও ত্রুটিমুক্তির উপায়। অবিশ্বাস কেন
এত অপার্থিব, কাছে যেতে গেলে কেউ
কেন ভাবে স্বেচ্ছাচারী? হয়তো রিপ্রেশন হবে—
যে-কথা চেয়েছি আমি বলতে, সসংকোচে নয়,
স্বাভাবিকভাবে, বলতে পারিনি—বেঁচে থাকা ব্যতিরেকে
ব্যক্তিগত পাপ নেই; (মনে করতে পারিনি)...
শোনো
জীবন আমার, একাত্ম হোয়ো না এমনভাবে—
সঙ্গী করে আমাকে যেতে চাও পূর্বজন্মের
স্মৃতি, বাস্তুভিটে ও বন্ধুদের ঘরবাড়ি।
অপলক আছি, তবু, সময় কীভাবে
বয়ে যায়, বয়ে গেল বুঝিনি—
পৃথিবীর মুখে আজ বিস্ময়; স্পষ্ট ছাপ
হয়ে ভেসে ওঠে বুকে—যেন-বা সমাধি,
সমাধির সুগন্ধী ফুল। অপরিণত হাত,
হাতের আঙুল দিয়ে গেঁথেছ যে মালা,
তা কোনো বরমাল্য নয়, বিজয়মাল্যও নয়;
শোকপালনের এক আদিম উপকরণ হিসেবে,
নিজের পুরোনো ছবি, অবয়ব ও সৌধে জড়িয়েছ।
কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’।
হারা
অন্যের আচরণ পাঠ করি আমরা এখন
অতর্কিত নয়, আবহমান জানে, দুর্লভ অধীত
বিদ্যাটি। সুমুখ উজ্জ্বল নয়; প্রোক্ত তোমার
ব্যর্থতা। সবই নীরবে হয়; নিস্তব্ধতা দেওয়াল
হয়ে দীর্ঘ, তোমাকে ঘিরে চারিদিকে দাঁড়িয়ে
রয়েছে। এখানে বাউল এসে শব্দের গভীরতা,
ঝংকার ছুঁয়ে দেখে। যেন, আয়ুর প্রান্তসীমায়
এসে তার স্মিতহাসি উপহারস্বরূপ ফিরিয়ে
দেওয়া ছাড়া আর কিছুই ছিল না!
ধস
মান্য করে চলো: পতন, নির্দেশিকা, দেহাত
বা শান্ত সজলতা। এ-ভাষা কঠিন লাগে?
বাংলা ভাষা—তোমার মুক্তির পথে, তোমার
শান্তির পথে, শান্তির পথে জননীর মুখ
হয়ে, মুখের হাসি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে—
ক্লান্তিহরা। জটিলতা দিয়ে নয়, সহজবোধ্য
ও আন্তরিক কথাগুলি, শিশুরা বলে দেয়
খেলাচ্ছলে। আমাকে মানুষ ভেবে বুকে টেনে
জড়িয়ে নিয়েছিলে তুমি। উপর্যুপরি ভাঙন, ধস
দেখে যাব আর কত? যেন আমি
একলা দানব হয়ে বেঁচে আছি, আর, চুম্বনে
বিগলিত হয় শরীর।—আত্মাও বিষে ভরে যায়...
সন্ন্যাস
সাংসারিক কথা ফুরিয়ে গিয়েছে আগেই—ফুরিয়ে
গিয়েছে সাংসারিক সুখ, প্রেমও; আজ তাই
দু-জনে ওরা, শুক ও সারির মতো পাশাপাশি
বসে, সন্ন্যাস নিয়ে আলোচনা করে। আমার
জীবদ্দশা আলংকারিক হয়ে কাটে। অসম্ভাব্যতার
হাজার অদেখা ও অচেনা সূত্রগুলি জোড়া
দিয়ে যাই। পবিত্র এই তিথি, জল—তুমি
তর্পণ সেরে দেশের দিকে এগিয়ে যাও—
এখনও ধর্ম শাশ্বত; এখনও ধর্ম জায়মান—
বৈপরীত্য আজ বৈচিত্র্য বয়ে এনেছে—ধ্বংসের
মাঝে তবু জন্মায় ঘাস, ফোটে ফুল।
এখনও অসহায় শিশুদের শব, ভূ-রাজনীতি
মনে করায়, এবং আমাদের নির্ভার, বিলাসী
অস্তিত্বের পাশে, কাঁটার মতন প্রশ্নচিহ্ন ফেলে রাখে।
গাছ
অসহনীয় এই প্রবণতা, পুণ্য, জীবনধারণ ও
দুগ্ধপোষ্য শিশুদের কান্না। আমার নিজস্ব,
আমার একান্ত শিশুটি কতদিন এভাবে—নিখোঁজ।
যতিচিহ্ন পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারেনি; বস্তুত, নির্বাক
সে; তবু, অব্যক্ত এখনও অধরা, অশ্রুত—
রয়ে গেছে আমাদেরই মাঝে। অচেতন নয়,
খুব সচেতনভাবে, সেসব, গোপন ঘরে আড়াল
করে লুকিয়ে রেখেছি। আমাদের অনুভবের কারণ,
আমাদের প্রতিকৃতির প্রতি অমলিন, নির্মল অনুভূতি
এখনও স্বচ্ছ, অক্ষত। তুমি নির্দয় হবে,
জানি—ছুড়ে ফেলে দেবে দূরে এসব কথা
ও কবিতা, জানি তা-ও। তবু জেনো, যে
অনেক অনিদ্রা পেরিয়ে স্বপ্নের দেখা পেয়েছে,
সে খুঁজে পাবেই পাবে, একদিন, সেই গাছ—
যে-গাছে স্পৃষ্টতা লেগে আছে আজও। যে-গাছ
ভস্মীভূত হয়েও, শিকড়ে ধারণ করে রেখেছে বিদ্যুৎ...
কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।