preloader
বাংলা বইয়ের e-ভুবন
Menu Categories Search Cart 0
Menu
Cart

Total 0 Items

☹ Your cart is empty

Sub Total:

$0

₹0

বিভাগ
বাংলাভাষার সুখ-দুখ
প্রবন্ধ

বাংলাভাষার সুখ-দুখ

বাংলাভাষা কি সত্যিই বিপন্ন, না কি বদলে যাওয়া সময়ের সঙ্গে তার লড়াই চলছে? কর্পোরেট সংস্কৃতি, শিক্ষার অবনমন, পাঠাভ্যাসের রূপান্তর—সব কিছুর ভেতর দিয়েও ভাষার গভীর টান, গর্ব ও আবেগ অটুট। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বাস্তবতার আলোকে এই লেখায় উঠে আসে বাংলার সুখ-দুঃখ, আশঙ্কা ও অনিবার্য আশার কথা।

বাংলাভাষা কি থাকবে? বাংলাভাষা বিপণ্ণ, বাংলাভাষা আক্রান্ত—এই কথাগুলো পুরোপুরি মিথ্যাও নয়। বাংলা পড়া ছেলে-মেয়ে কই? বাংলাশিক্ষা একপ্রকার চুলোয় উঠেছে। স্কুলে স্কুলে নতুন পড়ুয়া কমছে। একের পর এক গেটে তালা পড়ছে। তাহলে আগামীতে কী হবে! বাংলাভাষাচর্চাকারী মানুষ যত কমবে ততই বাংলাভাষার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এই ভাষা আমাদের মাতৃভাষা। এই ভাষাকে নিয়ে গর্ব করার অনেক কিছু আছে। রবীন্দ্রনাথ এই ভাষাতেই লিখেছেন। নজরুল এই ভাষাতেই লিখেছেন। কিন্তু আজ কেন মানুষের অনীহা! একটা কর্পোরেট কালচার বাংলাকে শেষ করছে। রাজ্য যদি অপারগ হয় বা নিজে থেকে হাত তুলে কর্পোরেট পুঁজির আগ্রাসনের দিকে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঠেলে দেয়, সেখানে ভাষার দায়বদ্ধতা কমে যায়। ভাষা যেন রুটি-রুজিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ভিনরাজ্যে বা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বাংলাভাষার পাল্লা উঠছে না, অথচ ভিন রাজ্য থেকে অজস্র অবাঙালি দাপটের সঙ্গে নিজ মাতৃভাষায় কাজ করছেন আর আমরা নিজেদের মানিয়ে নিতে অপর ভাষাতে আত্তীকরণ করছি। একসময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন, “ভাষার আশ্চর্য রহস্য চিন্তা ক'রে বিস্মিত হই। আজ যে বাংলা ভাষা বহুলক্ষ মানুষের মন-চলাচলের হাজার হাজার রাস্তায় গলিতে আলো ফেলে সহজ করেছে পরস্পরের প্রতি মুহূর্তের বোঝাপড়া, আলাপ-পরিচয়, এর দীপ্তির পথরেখা অনুসরণ করে চললে কালের কোন্‌ দূরদুর্গম দিগন্তে গিয়ে পৌঁছব। তারা কোন্‌ যাযাবর মানুষ, যারা অজানা অভিজ্ঞতার তীর্থযাত্রায় দুঃসাধ্য অধ্যবসায়ের পথিক ছিল, যারা এই ভাষার প্রথম কম্পমান অস্পষ্ট শিখার প্রদীপ হাতে নিয়ে বেরিয়েছিল অখ্যাত জন্মভূমি থেকে সুদীর্ঘ বন্ধুর বাধাজটিল পথে। সেই আদিম দীপালোক এক যুগের থেকে আর-এক যুগের বাতির মুখে জ্বলতে জ্বলতে আজ আমার এই কলমের আগায় আপন আত্মীয়তার পরিচয় নিয়ে এল। ইতিহাসের যে বিপুল পরিবর্তনের শাখা-প্রশাখার মধ্য দিয়ে আদিযাত্রীরা চলে এসেছে তারই প্রভাবে সেই শ্বেতকায় পিঙ্গলকেশ বিপুলশক্তি আরণ্যকদের সঙ্গে এই শ্যামলবর্ণ ক্ষীণ-আয়ু শহরবাসী ইংরেজ রাজত্বের প্রজার সাদৃশ্য ধূসর হয়েছে কালের ধূলিক্ষেপে। কেবল মিল চলে এসেছে একটি নিরবচ্ছিন্ন ভাষার প্রাচীন সূত্রে। সে ভাষায় মাঝে মাঝে নতুন সূত্রের জোড় লেগেছে, কোথাও কোথাও ছিন্ন হয়ে তাতে বেঁধেছে পরবর্তী কালের গ্রন্থি, কোথাও কোথাও অনার্য হাতের ব্যবহারে তার সাদা রঙ মলিন হয়েছে, কিন্তু তার ধারায় ছেদ পড়ে নি। এই ভাষা আজও আপন অঙ্গুলি নির্দেশ করছে বহুদূর পশ্চিমের সেই এক আদিজন্মভূমির দিকে যার নিশ্চিত ঠিকানা কেউ জানে না।”

একটা সময় ছিল, পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি। স্কুল-কলেজ বা নিজের কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে পাড়ার লাইব্রেরিতে হাজির হত প্রচুর মানুষ। নানারকম বই নিয়ে পড়ত। নতুন বই আসলে কে আগে নেবে তার জোরাজুরি চলত। সেইসব এখন অতীত। লাইব্রেরি বন্ধ। বিনোদনেরও নানা মাধ্যম এসেছে।

তাহলে কি বাংলাভাষা বাঁচবে না? কিছুদিন আগে ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক কলকাতা পুস্তকমেলা শেষ হল। সেখানে দেখা গেল বইপড়ুয়াদের ভিড় নেহাত মন্দ নয়। তাহলে বাংলাভাষা নিয়ে আমরা চিন্তিত কেন? বিভিন্ন জেলা থেকে এত এত লোক ছুটে এসেছেন, শুধু বইয়ের জন্য৷ বাংলা বইয়ের জন্য। এই পড়ুয়াদের নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহল কিছুটা হলেও আশঙ্কিত। কারণ, এই পড়ুয়াদের একটা বিরাট অংশ সংগ্রাহক আবার কিছু অংশ ভূত-প্রেত-হরর-তন্ত্র এসবে মজে। এগুলো কি বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির অংশ নয়? সন্দেহ অন্য জায়গায়। এর অধিকাংশ নিম্ন সাহিত্য গুণাবলিসম্পন্ন। কিন্তু ভাষাবহনকারী মূল লেখার প্রতি তুলনামূলক পাঠক কম। যে লেখা ভাষার শৈলী ও আভিজাত্য বহন করে, তার প্রতি অনাগ্রহ শংকারই বটে...

তবুও বাংলাভাষা গর্বের। তার কী মহাত্ম্য তা বোঝানো কঠিন।বাংলাভাষার অনুভূতি বড়ো বেশি দৃঢ় ও প্রবল। কয়েকটা ঘটনা উল্লেখ করি—

ফেসবুকে একবার একটা ফ্রেণ্ড রিক্যুয়েস্ট আসে। লক প্রোফাইল। নাম Dabia Maris. অনেকসময় লক প্রোফাইলের রিক্যুয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করে দেখে নিই। তারপর আনফ্রেন্ড করি। অ্যাকসেপ্ট করতে না-করতেই মেসেজ আসে। তিনি ইউএসএ-র একজন কর্মরত সেনা। এমনিতেই অপূর্ব দেখতে। তারপর গায়ে আর্মির পোশাক। আমি বাংলাতে রিপ্লাই দিই। ইংরাজি লিখতে বলে। আমি ইংরাজি জানি না বলাতে হিন্দিতে লেখার জন্য বলে। বলি— সেটাও জানি না। কিন্তু আপনি কীভাবে হিন্দি শিখলেন? জানায়—কাবুলে দীর্ঘদিন থেকেছেন। মেসেজগুলো বোঝানোর জন্য মাঝে মাঝে ভাঙা ইংরাজিতে লিখছিলাম। কিছুটা বিরক্ত হয়ে তিনি নিজেই বাংলা লিখলেন— “এই বছর আপনার মতো একজন মহান ব্যক্তিকে পেয়ে আমি খুব গর্বিত, এবং আমি বিশ্বাস করি যে ভবিষ্যতে বলার মতো ভালো গল্প সহ আমাদের জীবনে অনেক ভালো এবং বিস্ময়কর অধ্যায় থাকবে।”
এরপর বলি— দাদা কী বলতে চান, একটু ঝেড়ে কাশবেন?
উত্তর দেন—“বো@$দা!”
তারপর ব্লক।
কী আশ্চর্যের না? একজন অপরাধীও নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলেন না। সুন্দর বাংলায় উত্তর দিলেন। আর শেষে ‘বো@$দা’ বলে ব্লক করাটা আরও সুইট ছিল!
আহা, মাতৃভাষা!

আমাদের পাড়ায় রসিদ পাগলা থাকে। অনেকগুলো বিয়ে। কোনো বউই টেকেনি। তার কারণ, ভীষণ অলস। কোনো কাজকর্ম করে না। খায় আর ঘুমায়। একপক্ষের ছেলে-মেয়েও আছে। লোকটা পড়াশোনা জানে না। বলা যায় নিরক্ষর। তবে তার নেশা খবরের কাগজ পড়া। বাংলা কাগজ। চোখের সামনে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে। সে সোজা হোক বা উলটো।

একবার টিউশন পড়িয়ে বাড়ি ফিরছিলাম, একটু বেশি জোর হিসু পেয়েছে... রাস্তার মোড়েই একটা জঙ্গল মতো আছে। লোকজন তেমন যাতায়াত করে না। আমি ওই রাস্তা দিয়ে একটু ভিতরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, মনে হল কিছু একটা নড়ছে। ভয় পেয়ে গেলাম। মোবাইলের টর্চটা জ্বালাতেই দেখি এই অন্ধকারের মধ্যে বসে রয়েছে রসিদ পাগলা। কাগজ পড়ছে।

আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি। কেন জানি না, এই দিনে রসিদকে মনে পড়ে। বাংলা অক্ষরের দিকে তাকিয়ে থাকা শান্ত চোখদুটিকে ইচ্ছে করে আলতোভাবে আঙুল বুলিয়ে বলি, হে রসিদ তুমি পেরেছ, আমরা কিছুই পারিনি।

কেতাব-ই’র ব্লগজিন বিভাগে লেখা পাঠাতে চান? মেল করুন blogzine.ketabe@gmail.com-এ। মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখুন ‘কেতাব-ই ব্লগজিনের জন্য লেখা’

তখন আমি চাকরি করি না। একদিন কলকাতা থেকে বাড়ি ফিরছি, পাড়ার একজন লোক জিজ্ঞাসা করছেন, কী রে এখন কী করিস? চাকরি-টাকরি করছিস? আমি কিছু বলার আগেই ওই মানুষটির পাশে থাকা আমার থেকে অনেকটাই জুনিয়র এক ছেলে বলে ওঠে, ও চাকরি করবে কেন? ও লেখে... কবিতা লেখে... চাকরি করে কত টাকা হবে?

কবিতা লেখা যে নেহাত তাচ্ছিল্যের নয় বা টাকাপয়সাও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়, পাড়ার একটা কমবয়সি ছেলেও বোঝে, যার সঙ্গে কবিতার দূরদূরান্তেরও সম্পর্ক নেই। বাংলা ভাষায় কবিতা লিখে এই সম্মানটুকুও-বা কম কী?

সর্বশেষে বলি, ভাষাকে আমাদের ধারণ করতে হবে। শুধু একটি ভাষাকে কেন্দ্র করে একটি বৃহৎ আন্দোলন আগে দেখা যায়নি। অনেক মানুষ শহিদ হয়েছেন। নিজের রক্তে রাঙিয়ে নিয়ে অর্জন করেছেন মাতৃভাষার অধিকার। সেই ভাষার বর্তমান ধারক ও বাহক আমরা। সেই ভাষার দিগন্তেও যেন সেরা ফুলটি ফোটে তা রোপন করার দায়িত্ব আমাদের। প্রতি ভাষার সুখ, দুখ দুই-ই আছে। দুখের ভার যেন সুখের পাল্লা ছিঁড়ে না বেরিয়ে যায়। আমাদের কোলের ছোট্ট শিশুটি যেন ‘মা’ ডাকেই জড়িয়ে নিতে পারে তাদের জন্মদাত্রীকে। শৈশবকে চুরমার করে পাশ্চাত্য ঔপনিবেশিকতাবাদ যেন তাকে বয়ে না বেড়াতে হয়।


কেতাব-ই’র মুদ্রিত বই,ই-বই এবং ব্লগজিন বিভাগের লেখালিখির নিয়মিত খোঁজখবর পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন


এই ব্লগজিনে প্রকাশিত সমস্ত লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।

লেখক

সেলিম মণ্ডল থাকেন নদিয়ার চাপড়ায়। ‘তবুও প্রয়াস’ ও ‘ফারেনহাইট' পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি কবিতা, গদ্য, গল্প লিখে থাকেন। গ্রাম-বাংলার আনাচে-কানাচে ঘুরতে ভালোবাসেন। লোকসংস্কৃতির প্রতি রয়েছে তাঁর বিশেষ আগ্রহ। লেখালেখি ও পত্রিকা সম্পাদনার জন্য কয়েকটি পত্রিকা থেকে পেয়েছেন বিশেষ সম্মাননা।

অন্যান্য লেখা